ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৩ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

বিষাদময় কালো অন্ধকার পেরিয়ে সূর্যের দেখা

শামীমুল হক
২৫ জুন ২০২২, শনিবার

ডানা মেলে আকাশে উড়ার দিন আজ। ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক ছুঁবে বাংলাদেশ। একদিন যা ছিল অকল্পনীয়। অভাবনীয়। সেই অভাবনীয় কাজকে ভাবনায় এনে বাংলাদেশকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার কারিগর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেমন কথা, তেমন কাজ। আমরাই পারি। আমরাই পারবো। গোটা বিশ্ব আজ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। এ এক মাহেন্দ্রক্ষণ।

বিজ্ঞাপন
দেশ ভাসছে আনন্দে। ভাসছে উচ্ছ্বাসে। দেশে বন্যার মাঝেও উল্লাসের কমতি নেই। গোটা দেশের সব ক’টি পথ আজ মিশে যাবে পদ্মা পাড়ে। লাখো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হবে পদ্মার দুই পাড়। একুশটি জেলার সঙ্গে রাজধানীর সেতুবন্ধন করে দেয়া পদ্মা সেতু একটি ইতিহাস। একটি কবিতা। একটি গল্প। যে গল্প যুগ যুগ ধরে থাকবে মানুষের হৃদয়ে। মানুষের মুখে মুখে। কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আলোর মুখ দেখা পদ্মা গাইবে বাংলার জয়গান। গাইবে পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, জারি, সারি আর পালা গান। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। 

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ঘুচতে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ। নানা দুর্যোগ, দুর্বিপাকে আর তাদের মুখে পড়বে না চিন্তার ভাঁজ। তাই তো সেসব এলাকায় এখন বইছে কঠিনকে জয় করার আনন্দ। কি সেই কঠিন? দেশবাসী সবই জানেন। পদ্মা সেতু নিয়ে যখন দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতে থাকে তখনই বাংলাদেশকে আকাশ থেকে ফেলে দেয় বিশ্বব্যাংক। পদ্মা সেতুতে দেয়া অর্থ তারা ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয়। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে এক কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয় বাংলাদেশকে। দেশ-বিদেশে এ নিয়ে শুরু হয় হইচই।

 মন্ত্রিত্ব হারান তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন। দেশের মানুষ যখন স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার বেদনায় নীল, ঠিক তখনই সামনে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘোষণা দেন- পদ্মা সেতু হবে। আর তা হবে বাংলাদেশের নিজের অর্থে। বেদনায় নীল হওয়া মুখগুলোতে আনন্দের রেখা ফুঁটে ওঠে। কিন্তু একটি মহল তখনো বলে যাচ্ছিল ওসব কথার কথা। পদ্মা সেতু হওয়া অসম্ভব। যখন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়, তখনো আরও বেশি করে নেতিবাচক কথা ভাসতে থাকে দেশে। নানা অপবাদ তো আছেই। সেসব সহ্য করে এগিয়ে যেতে থাকে সেতুর কাজ। আজ শুধু সেতুই নয়, সেখানে রেল পথও তৈরি হয়েছে। সেতুর নিচে দিয়ে চলবে রেল। ওপরে বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য গাড়ি। অপরূপ এক দৃশ্য সৃষ্টি হবে সেখানে। সেতু শুধু সেতুই নয়। এ সেতু এখন দেশের পর্যটনের একটি পয়েন্টও হয়ে উঠেছে। সারা দেশ থেকে মানুষ সেতু দেখতে ছুটে যাবেন সেখানে। পর্যটনকে ঘিরে তৈরি হবে অর্থনৈতিক এক জোন।

ওদিকে সরকার পদ্মা সেতুর উদ্বোধনে রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া এ আমন্ত্রণকে দেশবাসী সাধুবাদ জানিয়েছে। দেশের ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মৃতিময় করে রাখতে সরকারের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ।

 ২১শে জুন আমন্ত্রণ জানানো হয় আওয়ামী লীগকে। ২২শে জুন সেতু বিভাগের উপ-সচিব দুলাল চন্দ্র সূত্রধর বিএনপির নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন। বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেন। সাত নেতার নামে দেয়া হয় আমন্ত্রণপত্র। তারা হলেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, আমন্ত্রণ পাচ্ছেন সাড়ে ৩ হাজার সুধীজন। সুধী সমাবেশের এ আমন্ত্রণপত্র ২০শে জুন সোমবার থেকে বিতরণ করা শুরু করেছে সেতু বিভাগ। জানা গেছে, সুধীজনদের এ তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, নির্মাণ সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, দেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ অন্য কর্মকর্তারা।

এবার প্রশ্ন হলো- এই অনুষ্ঠানে বিএনপি যাবে কিনা? আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার পর বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা এসেছিল। আমরা আমন্ত্রণপত্র রেখে দিয়েছি। আর বিএনপি মহাসচিব সরাসরি বলেছেন, তারা যাবেন না। কেন যাবেন না এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। কিন্তু দেশের ঐতিহাসিক এ মুহূর্তে বিএনপি উদ্বোধন মঞ্চে হাজির হয়ে দেখিয়ে দিতে পারতো তাদের উদারতার প্রমাণ। সাক্ষীও হতে পারতো এক ইতিহাসের। অথচ ইতিহাসের সাক্ষী হতে পদ্মাপাড়ে জমায়েত হবে কম করে হলেও ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পদ্মাপাড়ে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ইতিমধ্যে দুই পাড়ে পদ্মা সেতু উত্তর ও পদ্মা সেতু দক্ষিণ নামে নতুন দু’টি থানার উদ্বোধন করা হয়েছে। 

আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সরাসরি দেখতে জেলায় জেলায় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সব জেলার লোকজন বড় পর্দায় দেখবে পদ্মা পাড়ের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বন্যাকবলিত সিলেটেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বড় পর্দায় দেখানো হবে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সফলভাবে উদযাপনের প্রস্তুতিমূলক সভায় এ কথা জানান সিলেট জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান। আজ শনিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষজন বলছেন, পদ্মা সেতু হলো আমাদের জন্য জেলজীবন থেকে মুক্ত হওয়ার মতো আনন্দের। তাইতো উদ্বোধনকে ঘিরে দক্ষিণে উৎসবের আমেজ। অন্যদিকে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাবাজার ঘাটে জনসভাস্থলে ৬ দিনব্যাপী মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ও ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ৬ দিনব্যাপী চলবে। মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন জানান, পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে থাকছে সংগীত পরিবেশন, মনোমুগ্ধকর লেজার শো, আতশবাজি ও সমবেত নৃত্য। 

 

 

থাকছে ব্যান্ডদল স্পন্দন ও জলের গান। আরও থাকছে যাত্রা, নাটক, বাউল দলের পরিবেশনা। রয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের পরিবেশনা ও বিশেষ অ্যাক্রোব্যাটিক পরিবেশনা। এতে সংগীত পরিবেশন করবেন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম, খুরশীদ আলম, প্রতীক হাসান, খাইরুল আনাম শাকিল, প্রিয়াঙ্কা গোপ, কণা, ইমরান, শফি মণ্ডল, রাজিব, ঐশী, মেহেরীন, সজীবসহ অন্যরা। সমবেত নৃত্য পরিচালনা করবেন শামীম আরা নিপা ও শিবলী মুহাম্মদ।
বিষাদময় কালো অন্ধকার পেরিয়ে আজ সূর্যের দেখা পাবে দেশবাসী। পদ্মা সেতুকে ঘিরে ষড়যন্ত্র, বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে শুরু করে নেতিবাচক প্রচারণার যোগ্য জবাব দেয়া হবে আজ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। এ দিনটি দেখার অপেক্ষায় ছিল দেশবাসী। পদ্মা সেতু নিয়ে দেশবাসীর আকাক্সক্ষার কারণেই সেতু নির্মাণের প্রতিটি ক্ষণ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দেশবাসীকে জানান দিয়েছে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। 

সত্যিই আজ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ স্বমহিমায় উদাহরণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ অর্জন দেশবাসীর। সবার চোখে আজ আনন্দ অশ্রু। জয় করার আনন্দ। জয়ী হওয়ার আনন্দ। ভালোবাসার আনন্দ। কষ্টকে দূরে ঠেলে দেয়ার আনন্দ। দক্ষিণকে রাজধানীর কাছে টেনে নেয়ার আনন্দ। এখন আর কোনো রোগী ফেরির জন্য অপেক্ষা করে অ্যাম্বুলেন্সেই অকালে প্রাণ হারাবেন না। এখন আর কাউকে অনিশ্চিত যাত্রায় ফেরি ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না। কিংবা কোনো ভিআইপির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরি আটকে থাকবে না। ছয় কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্য পদ্মা সেতু মাত্র নয় মিনিটে পার হবে মানুষ। যেখানে আগে এপার থেকে কখন ফেরিতে ওপারে যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না। তাই তো পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য আশীর্বাদ। দেশের জন্য গৌরবের। ২৫শে জুন ২০২২ বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা থাকবে লাল অক্ষরে।

পাঠকের মতামত

অবশ্যই পদ্দা সেতু আনন্দের। সেই সাথে যদি দুর্নীতির হিসেব খানাও লিখতেন তা হলে দেশের মানুষ আরো উপকৃত হতো।

Sirajul
২৪ জুন ২০২২, শুক্রবার, ১২:৫৭ অপরাহ্ন

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

নির্বাচিত কলাম থেকে সর্বাধিক পঠিত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট / আমরা এখানে কীভাবে এলাম?

বেহুদা প্যাঁচাল: মমতাজের ফেরি করে বিদ্যুৎ বিক্রি, রাব্বানীর দৃষ্টিতে সেরা কৌতুক / কি হয়েছে সিইসি কাজী হাবিবের?

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status