ঢাকা, ২ জুলাই ২০২২, শনিবার, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২ জিলহজ্জ ১৪৪৩ হিঃ

বাংলারজমিন

পদ্মা সেতুতে বদলে যাবে জীবন

চরাঞ্চল রূপ নেবে আধুনিক নগরীতে

হায়দার আলী, শিবচর (মাদারীপুর) থেকে
২৪ জুন ২০২২, শুক্রবার

৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৭২ ফুটের চারলেনের সড়ক নিয়ে পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে পদ্ম সেতু। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের এই সেতুকে ঘিরে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলের মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। পদ্মা সেতুর জন্য জমি হারাতে হয়েছে এই চরের মানুষের। হারাতে হয়েছে দীর্ঘদিনের বসতভিটা এমনকি কবরস্থানও। তবে অধিগ্রহণকৃত জমির জন্য সরকার প্রচুর অর্থ দিয়েছে। তারপরও এই পদ্মা সেতুকে ঘিরে বিশেষ করে এই অঞ্চলের মানুষের মনে ভিন্ন এক আবেগ কাজ করে। পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবাসহ পদ্মার চরাঞ্চল রূপ  নেবে আধুনিক নগরীতে। এমন প্রত্যাশা চরের মানুষের। এছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গেই চরাঞ্চলে নির্মাণ হচ্ছে যোগাযোগের জন্য সড়ক, নদী বা খালের ওপর তৈরি হচ্ছে সেতু। সরকারি-বেসরকারিভাবে নির্মিত হচ্ছে নানা স্থাপনাও।

বিজ্ঞাপন
আর তাই চোখের সামনে সেতুটি দেখে বয়স্করা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। পদ্মা সেতুর সঙ্গে চরাঞ্চলের উন্নয়ন দেখে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি দেখতে পান পিছিয়ে পড়া চরাঞ্চলের তরুণেরা!  পদ্মা সেতু নিয়ে শিবচরের চরজানাজাত, কাঁঠালবাড়ী, মাদবরেরচর ও সেতু সংলগ্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে আলাপ করলে এই ধারণা পাওয়া যায়। পদ্মা সেতু সংলগ্ন শিবচরের কাঁঠালবাড়ী, চরজানাজাত ও শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, শিবচরের চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এই পদ্মা সেতুকে ঘিরে। এই প্রত্যাশা এ এলাকার খেটে খাওয়া মানুষের। 

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে শহরায়ণে রূপ নেবে এই এলাকা। তৈরি হবে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার ফলে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে বৃদ্ধি পাবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। ‘খেটে খাওয়া মানুষ’ এই কথাটার আমুল পরিবর্তন হবে চরাঞ্চলে।  জানা গেছে, চরাঞ্চলের শিক্ষা ও অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়া মানুষ এখনো জীবিকার জন্য পদ্মার ওপর নির্ভর করে। অনেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আবার লঞ্চ, ফেরিতে ও ঘাট এলাকায় ‘হকারি’ করে জীবন ধারণ করে। তাছাড়া শিশুদের একটা অংশকে দেখা যায় কাঁঠালবাড়ী ঘাট এলাকায় ‘কুলিগিরী’ করতে। যাদের বাবা-মা ঘাটকেন্দ্রিক নানা পেশায় জড়িয়ে জীবনধারণ করছে। এ ধরনের বেশ কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ‘পদ্মা সেতুর সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকায় নানা উন্নয়নের কাজ হচ্ছে। এই চর আর চর থাকবে না। শহরের রূপ নেবে। আমাদেরও আয়-রোজগার বাড়বে। আমরা এই সুবিধা ভোগ করতে না পারলেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমাদের সন্তানেরা পদ্মা সেতুর সুবিধা ভোগ করবে। তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে।’ কাঁঠালবাড়ী ঘাট সংলগ্ন এলাকা, কাঁঠালবাড়ী ও চরজানাজাত এলাকার অধিকাংশ প্রবীণ ব্যক্তিই জানান, তাদের বড় স্বপ্ন ছিল পদ্মায় একটা সেতু! সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আর এই সেতুকে ঘিরেই এ এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হবে এমনটা ধারণা অনেকেরই। পদ্মার পাড়সহ আশেপাশের এলাকায় শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে এ এলাকার সাধারণ মানুষের একটা বড় ধরনের কর্মসংস্থান হবে। জীবনযাত্রার মান বাড়বে-এমন ধারণা এখন স্থানীয়দের মাঝে। আর সেই স্বপ্ন নিয়েই তৃপ্তির সঙ্গে সকাল-বিকাল পদ্মা সেতুর বিশাল আয়োজন দেখছেন এ এলাকার সাধারণ মানুষ। পদ্মায় স্পিডবোট চালিয়ে জীবন ধারণ করেন প্রায় তিন শতাধিক পরিবার। 

পদ্মা সেতু হয়ে গেলে আর এই রুটে থাকছে না স্পিডবোট। বেকার হয়ে পড়বে চালকেরা। তখন কী করবেন? এই প্রশ্ন করলে তারা বলেন, ‘আমরা পদ্মা সেতুকে জন্মাতে দেখেছি। প্রতিনিয়ত দেখছি চোখের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। পদ্মা সেতু আমাদের  গর্ব। হয়তো আর এই পেশায় থাকবো না। তবে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয়ে গেলে এই চরাঞ্চলে অসংখ্য শিল্প-প্রতিষ্ঠান হবে। আমরা বেকার থাকবো না কেউই।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতুকে ঘিরে মাদারীপুরের শিবচরের পদ্মার পাড় জুড়ে উন্নয়নের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পদ্মার মাঝে জেগে ওঠা প্রাচীন জনপদ ঘিরে রয়েছে নানা পরিকল্পনা। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের ধারণা নিয়েই কর্তৃপক্ষের কর্তা ব্যক্তিরা পরিদর্শন করে যাচ্ছেন এসব এলাকা। পদ্মার  চরাঞ্চলে অলিম্পিক ভিলেজ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি, হাইটেক পার্ক, বিমানবন্দরসহ নানা উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা ইতিপূর্বে মাদারীপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য নূর-ই আলম চৌধুরী ও বিভিন্ন সময়ে শিবচরে আসা মন্ত্রীরা বলে গেছেন। পদ্মা সেতু সংলগ্ন শিবচরের কুতুবপুর জাজিরার নাওডোবা এলাকায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তাঁতপল্লী গড়ে তোলা হবে। এ তাঁতপল্লীতে আধুনিক আবাসন, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা রাখা হবে।

 যার জন্য জমি অধিগ্রহণসহ বেশকিছু কাজ এগিয়েছে। এ তাঁতপল্লীর জায়গায় অবৈধ স্থাপনাও সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়াও পদ্মার পাড় কেন্দিীক আধুনিক শহর, ব্যবসাকেন্দ্র, পর্যটনকেন্দ্র, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মাণ হয়েছে যা পদ্মা সেতুর সঙ্গে জুড়ে আছে। সবকিছুই পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করেই। আর এতে করেই সাজ সাজ রব এ এলাকাজুড়ে। তাদের স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে এ এলাকার উন্নয়ন, মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি, এ সবকিছুই এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। স্বপ্নের দৃশ্যমান দেখে এ এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ বুনে যাচ্ছেন আরও স্বপ্ন, যার হাতছানি পদ্মার ঢেউতোলা জলে! বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলে জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ ভাগ বেড়ে যাবে। আর প্রতি বছর ০.৮৪ ভাগ দারিদ্র্য নিরসনের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার প্রায় ৫ কোটি মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দিন গুনছে শিবচরবাসী। ২৫শে জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন শেষে ২৬শে জুন সকাল থেকেই সেতুর ওপর দিয়ে পদ্মা পার হবেন তারা। থাকছে না আর ঘাটের দুর্ভোগ। বাড়ির সামনে থেকে গাড়িতে উঠে ঢাকা গিয়ে নামবেন, এমন প্রত্যাশা শিবচরবাসীর।

বাংলারজমিন থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

বাংলারজমিন থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com