রিসেট

নাটকীয়তা

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর (শুক্রবার), ২০২৩ Archive 2022Source: স্টাফ রিপোর্টার

আদালত অবমাননার দায়ে কুমিল্লার সাবেক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানাকে সকাল সাড়ে ১১টায় এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি এসএম মাসুদ হোসেন দোলনের হাইকোর্ট বেঞ্চ। আদেশের পর তিন ঘণ্টা যেতে না যেতেই দুপুর আড়াইটায় আপিলের শর্তে একই বেঞ্চ তার জামিন মঞ্জুর করেন। এ ঘটনায় আদালত পাড়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। এই চাঞ্চল্যকর খবরের রেশ শেষ হতে না হতেই অবিশ্বাস্য দ্রুততম সময়ে বিকাল সাড়ে ৫টায় হাইকোর্টের দেয়া সেই কারাদণ্ড স্থগিত করে বিকাল সাড়ে ৫টায় আদেশ দেন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। একইসঙ্গে রায়ের বিরুদ্ধে সোহেল রানার করা আবেদনটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে আগামী ২০শে নভেম্বর শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সোহেল রানা বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদায় সংযুক্ত থাকা বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা। 

এ বিষয়ে বিচারকের আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক মানবজমিনকে বলেন, আদালত অবমাননার দায়ে কুমিল্লার সাবেক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানাকে সকালে হাইকোর্ট এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। দুপুরে আপিলের শর্তে হাইকোর্টের ওই একই বেঞ্চ তার জামিন মঞ্জুর করেন। পরে বিকালে সাজা স্থগিতের জন্য তিনি চেম্বার আদালতে আবেদন করেন। এ বিষয়ে  তিনি বলেন, হাইকোর্টের আদেশ পাওয়ার পর ৫টা ২০ মিনিটের দিকে সাজা স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন করি। আদালত সাড়ে ৫টার দিকে ২০শে নভেম্বর পর্যন্ত সাজা স্থগিত করে আদেশ দেন। বিচারকের জামিন ও সাজা স্থগিত দ্রুত গতিতে হওয়ার পেছনে জাজেজ এসোসিয়েশনের কোনো চাপ ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামিন ও সাজা স্থগিত সুপারসনিক গতিতে হয়নি। এমনকি কোনো পক্ষের চাপও ছিল না। আমার জীবনে এটিই প্রথম ঘটনা নয়। এমন বহু ঘটনা আগেও ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, সকালে বিচারক সোহেল রানা ক্ষমা চেয়েছিলেন। একজন বিচারক উচ্চ আদালতের কাছে ক্ষমা চাইলে, তখন তিনি ক্ষমা পেতে পারেন। এ সংক্রান্ত তিনটি জাজমেন্টও আমি হাইকোর্টে রেফার করেছিলাম। কিন্তু হাইকোর্ট বিষয়টি আমলে নেননি। 

সকালে কারাদণ্ড: 
আদালত অবমাননার কারণে কুমিল্লার সাবেক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানাকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ওই বিচারককে ৫  হাজার টাকা জরিমানা ও সাতদিনের মধ্যে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেন। আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী প্রণয় কান্তি রায়। অপরদিকে সোহেল রানার পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। পরে আইনজীবী প্রণয় কান্তি রায় সাংবাদিকদের বলেন, সোহেল রানা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু হাইকোর্ট তার নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা গ্রহণ না করে তাকে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। সোহেল রানা বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে সংযুক্ত আছেন। সোহেল রানার আইনজীবী এডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক সাংবাদিকদের  জানান, রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর তারা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করবেন। 

দুপুরে জামিন: ওদিকে বিচারক সোহেল রানাকে কারাদণ্ড দেয়ার ৩ ঘণ্টার মধ্যেই বেলা আড়াইটার দিকে আপিলের শর্তে ১ মাসের জামিন দেন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। জামিন পাওয়ায় তাকে আর আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে না। বিষয়টি জানিয়ে সোহেল রানার আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক বলেন, হাইকোর্টের দেয়া দণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন। এজন্য জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। ৩০ দিনের জন্য জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে সোহেল রানাকে আর বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে না। তারা আগামী রোববার আপিল বিভাগে আবেদন দাখিল করবেন।

বিকালে সাজাও স্থগিত: কুমিল্লার সাবেক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানার জামিনের পর সাজার রায়ও স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত। একইসঙ্গে জরিমানাও স্থগিত করে দেন। আগামী ২০শে নভেম্বর পর্যন্ত এ সাজা স্থগিত রাখার আদেশ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সাড়ে ৫টায় সাজা স্থগিত করে এ আদেশ দেন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। আবেদনের পক্ষে ছিলেন শাহ মঞ্জুরুল হক। তিনি মানবজমিনকে বলেন, হাইকোর্টের আদেশ পাওয়ার পর ৫টা ২০ মিনিটের দিকে সাজা স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন করি। আদালত সাড়ে ৫টার দিকে ২০শে নভেম্বর পর্যন্ত সাজা স্থগিত করে আদেশ দেন।

যে অভিযোগ ছিল বিচারকের বিরুদ্ধে: আইনজীবীরা জানান, ২০১৭ সালের ২৭শে মার্চ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনে মামুন চৌধুরী ও রিয়া আক্তার দম্পতির বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা হয়। ২০১৮ সালের ৪ঠা নভেম্বর মামলাটির কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে মামুন-রিয়া দম্পতির এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল দেন। একই সঙ্গে মামলাটির কার্যক্রম চার মাসের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। ২০১৯ সালের ৬ই মার্চ হাইকোর্ট রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত করেন। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও কুমিল্লার তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা ওই মামলায় অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ গঠনকালে আদালতে মামুন উপস্থিত ছিলেন। রিয়া অনুপস্থিত থাকায় তাকে পলাতক ঘোষণা করেন আদালত। এ অবস্থায় হাইকোর্টে আবেদন করে মামুন উচ্চ আদালতের আদেশ উপেক্ষার বিষয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সোহেল রানাকে হাজির হওয়ার নির্দেশনা চান। হাইকোর্ট এক আদেশে সোহেল রানাকে তলব করেন। তিনি হাইকোর্টে হাজির হন এবং পরবর্তী সময়ে জবাব দাখিল করেন। তবে জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গত ২৮শে আগস্ট সোহেল রানার প্রতি স্বতঃপ্রণোদিত আদালত অবমাননার রুল দেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি ৯ই অক্টোবর তাকে হাইকোর্টে হাজির হতে নির্দেশ দেয়া হয়। হাইকোর্টের ধার্য তারিখে সোহেল রানা সময়ের আরজি জানান। হাইকোর্ট ১২ই অক্টোবর পরবর্তী তারিখ রাখেন। গতকাল সোহেল রানা আদালত অবমাননার রুলের পরিপ্রেক্ষিতে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু হাইকোর্ট তার ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহণ না করে জেল-জরিমানা করে রায় দেন।