রিসেট

দেশে গত ১৫ বছরে ভোগ বৈষম্য বেড়েছে

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার), ২০২৩ Archive 2022Source: অর্থনৈতিক রিপোর্টার

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বিগত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও পরিসংখ্যানে এটা প্রকাশ্য সত্য বাংলাদেশে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈষম্য শুধু সম্পদ কিংবা অর্থের নয়, ভোগেরও বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভোগের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হতে পারেনি। উন্নয়নে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া দেশের মধ্যবিত্ত সমাজ দুর্বল হওয়ার ফলেই অলিগার্কদের উত্থান হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি দেশে অনেক উন্নয়ন হলেও তা অন্তর্ভুক্তিমূলক না হওয়ায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও ন্যায্যতার লক্ষ্যে নাগরিক এজেন্ডা: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামাজিক সুরক্ষা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম আলোচনায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মিডিয়া ব্রিফিং সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু কেন্দ্রিক বিষয়ক তিনটি পৃথক উপস্থাপনা প্রকাশ করা হয়।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ দুর্বল হয়ে গেছে। ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে। এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সাংস্কৃতিক মান, রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও অর্থনৈতিক সঞ্চালনের সব জায়গায় আমাদের বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবসময় বড় ভূমিকায় ছিল। কিন্তু এখন তাদের ভূমিকা নির্জীব হয়ে গেছে। যার কারণে আমরা পিছিয়ে গেছি। আর মধ্যবিত্তদের নির্জীব হওয়ার ফলে অলিগার্কদের উত্থান হয়েছে। এই অলিগার্করা অত্যন্ত বিত্তবান, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে যুক্ত।

তিনি বলেন, বিপন্ন মানুষের কণ্ঠস্বর সক্ষমভাবে উচ্চ জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। তাই অনেকের জীবনমান পরিবর্তন হয়নি। উন্নয়নের মধ্যে ন্যায্যতা আনতে হবে, এটা ফিরিয়ে আনাই পরবর্তী প্রজন্মের মূল চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া মানুষের হিস্যা যদি জোরদার করতে না পারি তাহলে ওই উন্নয়ন প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। সেটা মানবিক সমাজ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমাজ হয় না।

তিনি বলেন, পিছিয়ে পড়া মানুষের কণ্ঠস্বর কার্যকর করতে হলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি আনতে হবে। না আনতে পারলে আমাদের ওই ঘাটতি কখনোই পূরণ করতে পারবো না। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি পিছিয়ে পড়া মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করার জায়গা দেয়। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নাগরিকদের অধিকার প্রকাশ করার সবচেয়ে বড় ক্রীড়াক্ষেত্র নির্বাচন। এজন্য জাতীয় নির্বাচনে এই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বরকে প্রতিফলিত করতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের প্রাক-নির্বাচনের সময় পরিস্থিতির কারণে উৎসাহবোধ করিনি। কিন্তু এবারে নির্বাচনের প্রাক্কালে গত দেড় দশকের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা আমরা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি। এটা করতে গিয়ে আমাদের মনে হয়েছে, জাতীয় উন্নয়নের যে আখ্যান বা বয়ান আমরা সর্বদা শুনি, সেটা কতোখানি সত্যি ও মজবুত সেটা বোঝা প্রয়োজন। সেটা বুঝতে গিয়ে বাংলাদেশের ৭টি জায়গায় বিপন্ন ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫০০ জন মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশে দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা এগিয়েছি সন্দেহ নেই। যে মানুষগুলো বিপন্ন অবস্থায় আছে, তাদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারিনি। উন্নয়নের মধ্যে ন্যায্যতা আনতে হবে। পিছিয়ে পড়া মানুষের হিস্যাকে সামনে আনতে হবে। উন্নয়নের ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনাই হলো আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ। গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাই পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে জায়গা দেয়। সবচেয়ে বড় ক্রীড়াক্ষেত্র হলো নির্বাচন। নির্বাচনের অঙ্গীকারগুলো সামনে নিয়ে আসতে হবে। পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর উন্নয়নকে বার বার উপস্থাপন করতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে হলে, কাউকে পিছিয়ে রাখা যাবে না। এজন্য নৈতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

অনুষ্ঠানে মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুণগত মান বৃদ্ধির ব্যক্তি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ এর উপদেষ্টা ডা. ইয়াসমিন এইচ. আহমেদ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট স্থানীয় ঝুঁকি মোকাবিলা নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ইশতিয়াক বারী। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ।