ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বুধবার, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১০ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

খোলা কলম

গণঅভ্যুত্থান দেখতে কেমন?

এহ্সান মাহমুদ
১১ অক্টোবর ২০২৩, বুধবার
mzamin

গণঅভ্যুত্থান দেখতে কেমন; তাদের অন্তরে যে এই প্রশ্নটি জেগে উঠতে শুরু করেছে এটা কি রাজনীতির শুভলক্ষণ? রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়া তরুণদের একটি অংশ এখন গণঅভ্যুত্থান কেমন এটা দেখতে ও বুঝতে চাইছে এটুকুতেই কি আমাদের রাজনীতির নীতি নির্ধারকরা খুশি থাকবেন? এই তরুণরা গণঅভ্যুত্থানে নিজেদের শামিল করতে চাইবে কি? যদি চায়, তাহলে তাদের নিয়তি কেমন হবে- চিলেকোঠার সেপাই পাঠের অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা নিশ্চয়ই এর উত্তর পেয়ে যাবেন।


কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাস নিয়ে একটি পাঠচক্রে অংশ নিতে গিয়েছিলাম কুড়িগ্রামে। আমরা যারা রাজধানী ঢাকায় থাকি তাদের জন্য কুড়িগ্রাম আরেক দেশ! সেই উত্তরের দেশে পাঠচক্রে আলোচক হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়ার পরে প্রথমে বেশ দ্বিধায় পড়েছিলাম। যখন জানলাম পাঠচক্রের এবারের বই ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ তখন দ্বিধা দূরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করলাম। কুড়িগ্রামে ২০ জন তরুণ-তরুণীকে ২০টি বই পাঠের এবং এসব নিয়ে আলোচনার এক মহাযজ্ঞ নিয়ে মেতেছেন লেখক ও সংগঠক নাহিদ হাসান। তার আন্তরিক আমন্ত্রণ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। 
নির্ধারিত দিনে কুড়িগ্রাম পৌর মার্কেটের অনুষ্ঠান কক্ষে গিয়ে প্রথমে কিছুটা দমে গেলাম। হাতেগোনা ছয়-সাত জন। একটু পরেই বই হাতে, ব্যাগ কাঁধে কয়েকজন তরুণ-তরুণীর দেখা মিললো। ধীরে ধীরে তাদের কলরবে ছোট্ট কক্ষটির সবগুলো আসন ভর্তি হয়ে গেল। 

আয়োজনের শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও পাঠ প্রতিক্রিয়া পর্ব। এই অংশে আমার তেমন কোনো ভূমিকা নেই, সামনের চেয়ারে বেশ গাম্ভীর্য বজায় রেখে বসে থাকা ছাড়া। পাঠচক্রে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য দেয়ার পরে আমার পালা।

বিজ্ঞাপন
বেশ কয়েকজন তাদের পাঠ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। এরমধ্যে একজন তার অভিজ্ঞতা জানাতে শুরু করলেন। প্রথমে তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, এই উপন্যাসটি পড়ার পরে প্রথমে যেটি মনে হয়েছে- গণঅভ্যুত্থান দেখতে কেমন? ওই তরুণী বক্তব্য শেষ করলেন। তারপরে আরও কেউ কেউ বক্তব্য রাখলেন। সবশেষে আমার বক্তব্য দেয়ার পালা। কিন্তু আমি বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রথমেই যে প্রশ্নের মুখে পড়লাম, সেটি হলো- গণঅভ্যুত্থান দেখতে কেমন? 

সাম্প্রতিক সময়ে যারা রাজনীতির খবরের দিকে চোখ রাখেন তারা নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন, বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রায়ই সভা-সমাবেশে একটি কথা বলে আসছেন। সেটি হলো- বর্তমান সরকারকে তারা গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বিদায় করতে চান। আবার, এই কথার পাল্টা হিসেবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যও আমরা খেয়াল করতে পারি- দেশে আর কোনোদিন গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হবে না। বিএনপি ব্যর্থ হবে। 

কুড়িগ্রামের সেই তরুণীর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা আপাতত চিলেকোঠার সেপাইয়ের দিকে তাকাই।    
‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬) কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচিত প্রথম উপন্যাস। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসটিকে মহাকাব্যিক উপন্যাস হিসেবে অনেকেই চিহ্নিত করেছেন। ইলিয়াসের আরেকটি উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’র তুলনায় আয়তনে ছোট হয়েও এই উপন্যাসটি যেভাবে উচ্চারিত হয় আমাদের বিদগ্ধ সমাজে তা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। আমাদের ভূখ-ের অর্থাৎ, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা বৃহত্তর আন্দোলনের জোয়ারে চিলেকোঠায় বাস করা একজন সাধারণ মানুষের যোগ দিতে সক্ষম হওয়ার গল্পই হচ্ছে ‘চিলেকোঠার সেপাই’। 

১৯৬৯ সময়টা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছিল। সেই সময়টা ধরা আছে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে লেখক অবশ্য পূর্ববাংলা উল্লেখ করেছেন। উপন্যাসের ফ্ল্যাপ থেকে কিছুটা ধার করছি- “১৯৬৯ সালের পূর্ব বাঙলা। কী এক জীবনস্পর্ধী মন্ত্রের মুখে বিস্ফোরিত চারদিক। কেঁপে ওঠে নগর ঢাকা। কাঁপে শহর, বন্দর, গঞ্জ, নিভৃত গ্রাম, এমনকি যমুনার দুর্গম চর এলাকা। কখনো কঠিন বুলেটের আঘাতে, কখনো ঘুম ভেঙে-দেওয়া আঁধির ঝাপটায়। মিটিং, মিছিল, গুলিবর্ষণ আর কার্ফ্যু-ভাঙা আর গণআদালত- সব জায়গায় ফেটে পড়ে ক্ষোভ ও বিদ্রোহ। সব মানুষেরই হৃদয়ের অভিষেক ঘটে একটি অবিচল লক্ষ্যে- ‘মুক্তি’।” 

উপন্যাস পড়ার সময়ে যে আনন্দ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, একজন পাঠকের কাছে তার মূল্য অপরিসীম। উপন্যাস ইতিহাসের বই নয়। উপন্যাস পড়তে পড়তে ইতিহাসে আগ্রহ তৈরি হতে পারে। আবার উল্টোটাও হতে পারে। তবে একটি ধারণা আমার মনে বেশ শক্ত হয়ে আছে যে- ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পাঠের আগে এই ভূখ-ের রাজনৈতিক ইতিহাসটা অন্তত জেনে রাখা ভালো। তাই বলা যায় ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ সহজে বুঝতে হলে সহপাঠ হিসেবে এই ভূখ-ের ইতিহাসের পাঠ লাগবে। ঠিক একইভাবে আবার বলা যায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে ঠিকঠাক বুঝতে হলে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পাঠ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। ইতিহাস পাঠে কেবল ঘটনার বিবরণই জানা যায়। অপরদিকে ইতিহাসনির্ভর উপন্যাসে একইসঙ্গে ঘটনা এবং ওই সময়ের সমাজ-কাল-পাত্র-পাত্রীদের অন্দরমহলের আড়াল ও অন্ধকার থেকে রাজপথের খোলা গলার মিছিলের উত্তাপটাও টের পাওয়া যায়। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম ধাপের বিজয়ের স্মারক এই ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। তাই ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পাঠের পরে যে তরুণ-তরুণীর গণঅভ্যুত্থান কেমন তা জানার আগ্রহ তৈরি হবে তার জন্য এর ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

আমরা জানি যে, ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আইয়ুব খানের সরকার একটি মামলা করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছেন তারা। এই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিতি লাভ করে। মামলার আসামিরা ছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একই বছরের জুন থেকে শুরু হয় এই মামলার কার্যক্রম। সাজানো এ মামলার বিরুদ্ধে মাঠে নামে আপামর জনসাধারণ। রাজপথে তখন আরেক ত্রাতার ভূমিকায় দেখা যায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে। তার নেতৃত্বে মিছিল ও সমাবেশে জনসাধারণের অংশগ্রহণ দিনকে দিন বাড়তেই থাকে। রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসমাজ একতাবদ্ধ হতে শুরু করে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। আটষট্টি সালের ডিসেম্বর মাসেই গঠন করেছিল ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ। ঊনসত্তরের জানুয়ারিতে তারা ঘোষণা করে ১১ দফা। এরপর ছাত্র-জনতার মিলিত আন্দোলনে ক্ষমতাসীন আইয়ুবের মসনদ কেঁপে ওঠে। আন্দোলনের তীব্রতায় ভীতসন্ত্রস্ত আইয়ুব খান ২২শে ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিয়ে সকল অভিযুক্তকে মুক্তি দেন। এরপরে দ্রুতই পরিস্থিতি বদলাতে থাকে।  ২৫শে মার্চ তারিখে ইয়াহিয়া খানের হাতে পাকিস্তানের শাসনভার তুলে দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান আইয়ুব খান। 

‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসটি নিয়ে পাঠচক্রে অংশ নেয়া তরুণ-তরুণীদের বয়সের সীমারেখা ১৫-২৬ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এরা মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। তাই তাদের পাঠ অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যে গণঅভ্যুত্থানের কাহিনী তারা জানছে কিংবা আরও অধিকতর জানার জন্য প্রশ্ন তুলছে- গণঅভ্যুত্থান দেখতে কেমন; তাদের অন্তরে যে এই প্রশ্নটি জেগে উঠতে শুরু করেছে এটা কি রাজনীতির শুভলক্ষণ? রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়া তরুণদের একটি অংশ এখন গণঅভ্যুত্থান কেমন এটা দেখতে ও বুঝতে চাইছে এটুকুতেই কি আমাদের রাজনীতির নীতি নির্ধারকরা খুশি থাকবেন? এই তরুণরা গণঅভ্যুত্থানে নিজেদের শামিল করতে চাইবে কি? যদি চায়, তাহলে তাদের নিয়তি কেমন হবে- চিলেকোঠার সেপাই পাঠের অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা নিশ্চয়ই এর উত্তর পেয়ে যাবেন।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status