ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বুধবার, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১০ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

সাম্প্রতিক

প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত!

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ
১০ অক্টোবর ২০২৩, মঙ্গলবার
mzamin

দলমত নির্বিশেষে একটি সর্বজনীন ঐক্যের কেন্দ্রে এই বিভক্ত জাতিকে কীভাবে আনা যায় সেটির সর্বজনগ্রাহ্য একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা সমাধান জরুরি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংস্কার বা পুনর্গঠন উভয়ক্ষেত্রেই এ ব্যাপারে সকল ধর্মের অনুসারী ও রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য প্রকাশকে পূর্বশর্ত বলে মনে করি। দেশের প্রতিটি আইনকানুন, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত তিন মূলনীতি আমাদের রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করার গুরুত্বপূর্ণ সনদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেজন্য প্রয়োজনে অংশীজনদের নিয়ে মতামত যাচাই, ব্যাপকভিত্তিক বিতর্ক আর পর্যালোচনাপূর্বক গণভোটের আয়োজন করে সংবিধানের পুনর্লিখনই কার্যকর উপায় হতে পারে।

 


স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংকট হচ্ছে সকলের কাছে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য কোনো রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে না পারা। দুঃখজনক হলেও সত্য, নানা সময়ে বিভিন্ন চটুল রাজনৈতিক রেটোরিকের চর্চা দেখা গেলেও কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী বৃহৎ পরিসরে এমন কোনো বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক বয়ান এখনো তৈরি করতে পারেনি। যা সর্বজনীনভাবে পুরো জাতির চিন্তায়, মননে ও কর্মে একক অখণ্ড রাজনৈতিক গণসত্তা নির্মাণে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে, যদিও ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজস্ব কর্মসূচির আলোকে তাদের রাজনীতি করবে। ১৯৬৬ সালে ঘোষিত ‘৬ দফা’ ছিল এই ভূখণ্ডের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার অন্যতম দলিল, যার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনমানসে (পূর্ব পাকিস্তান) আওয়ামী লীগের উত্থান ঘটে।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র না থাকলেও অস্থায়ী সরকার ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল স্বাধীনতাযুদ্ধের লিখিত ঘোষণাপত্র পাঠ করে। যাদের চিন্তার ফসল ছিল সেই ঘোষণাপত্র, তারা যে পরিষ্কারভাবেই ফরাসি বিপ্লব ও বলশেভিক বিপ্লব দ্বারা ব্যাপক মাত্রায় প্রভাবিত ছিলেন, সেটা সহজেই অনুমেয়। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও কম্যুনিস্ট ইশতেহারের বিভিন্ন দিকও সেখানে প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে আসে। মদিনায় হিজরতের পরে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে স্বাক্ষর করা ‘মদীনা সনদ’-এ উল্লিখিত ইনসাফ, ধর্মপালন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করার যে ন্যায্যতা ছিল, তাও সেখানে সমান্তরালে উঠে এসেছে; নয় মাসের রক্তাক্ত জনযুদ্ধকে বৈষম্যের বিপক্ষে ‘জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের শুরুর অংশে পাকিস্তানের সঙ্গে তালাকনামার কারণ বর্ণনা করে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামক নতুন রাষ্ট্র ঘোষণার প্রেক্ষাপট ও চরিত্র তুলে ধরা হয়।

বিজ্ঞাপন
এটা যে রাজ্য না বা কোনো ভিনদেশি ব্যক্তি/পরিবারের উপনিবেশ নয় সেটা পরিষ্কার করা হয়েছিল ‘গণপ্রজাতন্ত্র’ শব্দযুগল দিয়ে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কিসের ভিত্তিতে এই রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে, যা আগের পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে আলাদা হবে, বৈষম্যহীন হবে, সেটা উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার।

১৯৭২ সালের নভেম্বরে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে চার দফা মূলনীতির উল্লেখ করা হয়েছে: ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। এই মূলনীতিগুলো শুধু সংবিধানেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, বরং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের দলীয় সংবিধানেও স্থান পায়। এই সাংবিধানিক কাঠামোতে তৃতীয় ও চতুর্থ সংশোধনীর মধ্যদিয়ে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। এর ফলে ‘গণতন্ত্র’ নামক সাংবিধানিক মূলনীতির কবর রচিত হয়। তাজউদ্দীন আহমদের মতো মুক্তিযুদ্ধের মূল সংগঠককে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী ও ব্যারিস্টার মঈনুলের মতো গুণীজনদের পদত্যাগ করতে হয় একদলীয় শাসনের প্রতিবাদে।

১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সংবিধানের চার মূলনীতিতে আবারো পরিবর্তন আসে। ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ভূখণ্ডভিত্তিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে রূপান্তর করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়। সমাজতন্ত্রকে পুঁজি ও ব্যবসাবান্ধব করে ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার’ অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এই পরিবর্তন আওয়ামী লীগ ও বাম ঘরানার সমর্থকগোষ্ঠী কখনো মেনে নিতে পারেন নি। 
ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকেই ইসলাম সংক্রান্ত বিষয়ে যথেষ্ট নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যোগ ও অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করায় এই অস্বস্তি আরও বৃদ্ধি পায়। প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাম ও জাসদের অব্যাহত সামরিক ক্যু ও প্রতিবিপ্লব দেশকে অনিবার্য বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। পরপর দেশের দুই জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতিকে প্রাণ দিতে হয় ছয় বছরের ব্যবধানে। বিএনপি-আওয়ামী লীগের ক্ষমতার পালাবদলে সংবিধানের শাসনতান্ত্রিক মূলনীতিরও বারবার পরিবর্তন ঘটেছে। প্রশ্ন হলো আর কতোদিন এভাবে চলবে?

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, যখন স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয় তখন দেশ পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সেই তিন ঐতিহাসিক মূলনীতি উল্লেখ করা হয়নি এবং এখনো নেই। বরং সংবিধানের প্রারম্ভিক অংশে এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাষ্ট্র ও সংবিধানের এমন চারটি মূলনীতির কথা বলা হয়েছে যা মূলনীতি হওয়ার মতো নয়, বরং অনেকাংশে পরস্পরবিরোধী। সেগুলো আবার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও উল্লেখ ছিল না। ঠিক কিসের ভিত্তিতে এই চারটিকে মূলনীতি করা হলো, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এতটুকু বলা যেতে পারে যে, তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তবতা হয়তো বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। এভাবেই ১৯৭২ সালের নভেম্বরে গৃহীত সংবিধান আমাদের জাতীয় মুক্তির লড়াইকে প্রথমেই কুঠারাঘাত করে। 

যে ঘোষণাপত্র হতে পারতো আমাদের রাষ্ট্র বিনির্মাণের ‘ম্যাগনাকার্টা’, সেটি জাতির স্মৃতি থেকেই বিলোপ করে দেয়া হয়েছে। জাতির মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রচারের খণ্ডিত ইতিহাস চর্চা আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে বিভক্ত করে চলেছে। অথচ দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে সর্বজনীন হিসেবে মেনে নেয়ার অপূর্ব সুযোগ ছিল।
দেশে যারা মতাদর্শিক রাজনীতি করেন, তাদের মধ্যে প্রধানত বামপন্থি ও ইসলামপন্থি দল এবং তাদের সমর্থকগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য। যেহেতু স্বাধীনতার তিন মূলনীতি: সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচারকে সমাজতন্ত্রীরা প্রগতিশীল ধারণা হিসেবে বিবেচনা করেন, তাই সেগুলো নিয়ে তাদের আপত্তি থাকার কথা না। আবার যারা ইসলামপন্থি রাজনীতি করেন, তাদের কাছেও এই তিনটি মূলনীতি নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ ছিল না। কারণ কোরআন-হাদিসে এই তিনটি মূলনীতি নিয়ে শত শত বক্তব্য আছে; প্রতি জুমার খুতবায় ইনসাফ ও সুবিচারের কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়া হয় মুসল্লিদের। মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা বলা হয়েছে; এর থেকে বড় মর্যাদার কথা আর কী হতে পারে! মানুষকে তার কাজের (আমল/সৎ কর্ম) ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়ার কথা বলা হয়েছে যেটি নারী-পুরুষ, জাত-জাতীয়তা, গোত্র ও বর্ণপরিচয়ের ঊর্ধ্বে; আরব এবং অনারবের সম্মান শুধুমাত্র তার কর্ম- এই তো ইসলামের সাম্যের কথা।

এই জনপদে ইসলাম ছাড়াও অন্যান্য যে সকল ধর্ম ও ধর্মীয় গোষ্ঠী আছে, তাদের কেউই কখনো এই তিন মূলনীতি নিয়ে তাদের কোনো সংকোচের কথা বলেননি। এমনকি কোনো কোনো ইসলামী দল এই তিন মূলনীতিকে তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রে পর্যন্ত জায়গা দিয়েছেন। মতাদর্শের বাইরে বড় যে দলগুলো রয়েছে, তাদের কোনো নেতাকর্মীকে কখনো এই তিন মূলনীতি নিয়ে আপত্তি তুলতে দেখা যায়নি। যুগের পর যুগ ধরে চলা বিভাজন আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রকে শুধু দুর্বলই করে দেয়নি, বরং তাকে ঠিকমতো গঠিত হতেই দেয়নি। জাতীয় শত্রু-মিত্র না খুঁজে বিরোধী দল ও আদর্শ/মতাদর্শের লোকদের প্রতিনিয়ত শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে দেয়ার প্রয়াস আমাদেরকে রাজনৈতিক সম্প্রদায় (ঢ়ড়ষরঃু) হিসেবে গড়ে উঠতে দেয়নি।

দলমত নির্বিশেষে একটি সর্বজনীন ঐক্যের কেন্দ্রে এই বিভক্ত জাতিকে কীভাবে আনা যায় সেটির সর্বজনগ্রাহ্য একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা সমাধান জরুরি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংস্কার বা পুনর্গঠন উভয়ক্ষেত্রেই এ ব্যাপারে সকল ধর্মের অনুসারী ও রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য প্রকাশকে পূর্বশর্ত বলে মনে করি। দেশের প্রতিটি আইনকানুন, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত তিন মূলনীতি আমাদের রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করার গুরুত্বপূর্ণ সনদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেজন্য প্রয়োজনে অংশীজনদের নিয়ে মতামত যাচাই, ব্যাপকভিত্তিক বিতর্ক আর পর্যালোচনাপূর্বক গণভোটের আয়োজন করে সংবিধানের পুনর্লিখনই কার্যকর উপায় হতে পারে। এভাবেই সম্ভব ভঙ্গুর জাতিসত্তাকে পুনরায় চিন্তায়, কর্মে ও মননে একত্রিত করা, নতুন রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে বিনির্মাণ করা। তবে শুরুটা হোক একটি সর্বজনীন জাতীয় রাজনৈতিক বয়ান তৈরির মধ্যদিয়ে, যা আমাদের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অগ্রযাত্রাকে মসৃণ করবে।

লেখক: যুগ্ম সদস্য সচিব, এবি পার্টি।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status