সপ্তাহের অন্য দিনের মতো গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসে ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস। ট্রেনে যাত্রীও ছিল ভরপুর। ট্রেনটি রাত সাড়ে ১১টার দিকে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশের আগে আউটারে দাঁড়িয়ে সিগন্যালের জন্য অপেক্ষা করছিল। এ সময় আচমকা ১০ থেকে ১২ জন ডাকাত ট্রেনে উঠে যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। তারা যাত্রীদের মারধর করে লুটপাট শুরু করে। যাত্রীরা ডাকাতদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এতে ডাকাতদের দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে কয়েকজন আহত হন। যাত্রীরা একত্রে ডাকাতদের প্রতিহত করায় তারা ট্রেন থেকে নেমে যায়। এ সময় যাত্রীরা ট্রেনের দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডাকাতরা যাত্রীদের উদ্দেশ্য করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ইটপাটকেলের আঘাত থেকে বাঁচতে ও ডাকাতদের আক্রমণে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় ট্রেনে থাকা যাত্রীরা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে পুলিশের সহযোগিতা চায়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালে ডাকাতদল পালিয়ে যায়।
এদিকে, টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ ও জিআরপি পুলিশের সহযোগিতায় ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টঙ্গীর আশেপাশ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় ডাকাত দলের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- টঙ্গী পূর্ব শিলমুনের মো. হাশেমের ছেলে মেহেদী হাসান জয় (২৬), আমতলী কেরানিরটেক এলাকার মৃত বাবুল খাঁ’র ছেলে মো. রনি (৩৫), শিলমুন পশ্চিমপাড়ার মো. নুর আলমের ছেলে রবিউল হাসান (৪০), মরকুন পশ্চিমপাড়ার জাহিদুল ইসলামের ছেলে মো. স্বাধীন (৩০), মরকুন পশ্চিমপাড়ার আব্দুল হাকিমের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম জাকির (২৫), মরকুন তিস্তার গেট এলাকার মৃত আব্দুল মজিদের ছেলে মো. মাসুম (২৭), মধ্য আরিচপুর, নতুন বাজার এলাকার মো. মোতালেবের ছেলে মো. নাসির (২০), আমতলী কেরানীলটেক এলাকার আবুল কাশেমের পুত্র মো. নয়ন হাসান (২৮), ব্যাংকের মাঠ বস্তির সোহরাব হোসেনের ছেলে মো. আশিক (২২)। পুলিশ জানায়- আটককৃতদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি, মাদক, চুরির মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে ১টি চাইনিজ কুড়াল, ১টি চাপাতি, ১টি ছুরি, ২টি সুইচ গিয়ার ও ১টি গুলতি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়াও তাদের কাছ থেকে লুট করা নগদ ১১ হাজার ৫শ’ টাকা ও ৫টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। আটককৃতদের টঙ্গী রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে হস্তান্তর করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে সূত্র জানায়, টঙ্গী রেলওয়ে জংশনের আউটার সিগন্যালে আকিজ বেকারসের পেছনে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনটি এসে থামে। সে সময় ডাকাতরা ট্রেনে প্রবেশ করে অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে ডাকাতি শুরু করে। কিন্তু যাত্রীরা তাদেরকে বাধা দিয়ে নিচে নামিয়ে দেন। কিন্তু এর পর পরই হঠাৎ ট্রেনটিকে লক্ষ্য করে ডাকাতরা ঢিল ছুড়তে থাকে। এ সময় ভয়ে যাত্রীরা দরজা জানালা বন্ধ করে ছুটাছুটি শুরু করে। কেউ কেউ ট্রেনের মেঝেতে শুয়ে পড়েন। ডাকাতদের প্রতিহত করতে গিয়ে কয়েকজন যাত্রী আহত হন। ট্রেনের এক টিটিই জানালা বন্ধ করতে গেলে তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে ডাকাতরা।
টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ডাকাতরা প্রথমে কয়েকটি বগিতে ঢুকে যাত্রীদের ওপর হামলা চালিয়ে আহত করে জিনিসপত্র নিয়ে যায়। কিছু বগিতে বাধা পেয়ে ঢুকতে না পেরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা শুরু করে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার অপরাধ (দক্ষিণ) মাহাবুব-উজ-জামান মানবজমিনকে বলেন, টঙ্গী এলাকার সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী, চোর ও চোরাই মালামাল ক্রয়-বিক্রয়কারী, কিশোর গ্যাং এবং যেকোনো দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে টঙ্গী পূর্ব, পশ্চিম থানা এলাকায় অভিযান অব্যাহত আছে।
রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন মানবজমিনকে বলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভয়ভীতি দেখিয়ে ছিনতাই করা। কিন্তু বগিতে উঠতে গেলে যাত্রীরা তাদের বাধা দেয়। যাত্রীরা দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর এতেই তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা শুরু করে। বাধা দিতে গেলে একজনকে তারা ছুরিকাঘাতও করেছে। তিনি বলেন, যাত্রীদের দুটি মোবাইল তারা নিয়েছিল। সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আরও কতজন ছিল সে বিষয়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. দিদার আহম্মদ বলেন, ছিনতাইকারীদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
