কতোদিন ধরে বাবাকে দেখি না। বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। আদর করতেন। দোকান থেকে খাবার কিনে দিতেন। ঈদের আগেই আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। ঈদে বাবার কাছ থেকে নতুন জামা নিবো। বাবার হাত ধরে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাবো। কথাগুলো বলছিল ২০১৪ সালে নিখোঁজ হওয়া চঞ্চলের ছেলে ১০ বছর বয়সী আহাদ। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মায়ের ডাক আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নিতে এসেছিল সে।
আহাদের কথা শুনে তার মা ও সঙ্গে আসা অন্যরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। কোনো কোনো পরিবারের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দাবি করেছে, তাদের যে স্বজন নিখোঁজ হয়েছেন তার সন্ধান যেন দেয়া হয়।
২৬শে জুন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নির্যাতন বিরোধী দিবসকে সামনে রেখে মায়ের ডাক মানববন্ধনের আয়োজন করে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের পরিবারের সদস্যরা কেউ গুম হয়েছেন ১০ বছর আগে। আবার কেউ গুম হয়েছেন ৫ বছর বা ৭ বছর আগে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে বা অন্যভাবে তাদের বাসা অথবা কর্মস্থল থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু, তারা তাদের আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
মায়ের ডাকের আফরোজা আক্তার বলেন, তার ভাই সুমনকে বাসা থেকে র্যাবের পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এলাকাবাসী সবাই দেখেছে র্যাবের গাড়ি। পরে র্যাবের কাছে যোগাযোগ করা হলে তারা তাকে আটকের কথা অস্বীকার করে।
মানববন্ধনে ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী নাসরিন জাহান জানান, আমার স্বামী গুম হয়েছে। আমরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু, তারা কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। আপনারা আমাদের কিছু একটা বলুন। আমরা আর কতো অপেক্ষা করবো। কতো মানুষের কাছে কান্নাকাটি করবো। আমরা
এর প্রতিকার চাই। আমার স্বামী জীবিত না মৃত তা জানতে চাই। গুম হওয়া মাহবুব হাসানের ভাই জাহিদ বলেন, ১১ বছর হয়ে যাচ্ছে তার ভাই গুম হয়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে আমাদের চোখে আর পানি আসে না। আমরা নিথর হয়ে গেছি। আমরা এর সমাধান চাই।
মানববন্ধনে নুর আলমের স্ত্রী রিনা আলম অভিযোগ করে বলেন, আমাদের পরিবার যখন নূর আলমের সন্ধানের জন্য হন্যে হয়ে ছোটাছুটি করছি তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা কয়েক দফায় গিয়ে জানতে চায় নূর আলম কোথায়? এই তামাসা আর কতো দেখতে হবে। কার কাছে আমরা এর বিচার চাইবো। তিনি বলেন, আমাদের প্রতি কেন এই অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন আমাদের বাড়িতে এসে বলে যে, তার স্বামী কী বিদেশে চলে গেছেন না সাগরে ডুবে মারা গেছেন। গুম হওয়া আনোয়ারের মেয়ে রাইসা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বাবার সঙ্গে ঈদ করবো।
মায়ের ডাক সংগঠনের সমন্বয়কারী সানজিদা আক্তার বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে গুম খুনের সঙ্গে যুক্তদের অন্তর্ভুক্ত না করার আহ্বান জানাই। তিনি আরও বলেন, আমরা আর কতো অপেক্ষা করবো। আমরা আর কতো কাঁদবো। যারা গুম হয়েছে ঈদের আগেই তাদের যাতে পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়।
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলেন, এক যুগের বেশি সময় ধরে আমরা বলে আসছি এই গুম হওয়া মানুষের পরিবারগুলো দুর্বিষহ যন্ত্রণায় অমানবিক জীবন যাপন করছে। এখন তাদের কাছেই গুমের তথ্য চেয়ে তাদের নিদারুণ উপহাস করা হচ্ছে। যেসব মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠন এসব পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছে তাদের নানাভাবে চাপের মধ্যে রাখা হচ্ছে। হয়রানি করা হচ্ছে। এই অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন মায়ের ডাকের সমন্বয়কারী আফরোজা আক্তার। সঞ্চালনা করেন মায়ের ডাকের অপর সমন্বয়কারী মঞ্জুর হোসেন ঈসা।
