ঢাকা, ২ জুলাই ২০২২, শনিবার, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২ জিলহজ্জ ১৪৪৩ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

সাফ কথা

দখলের তালিকায় শ্মশান নিরাপত্তা ইস্যুটি কী কেবলই টোপ

কাজল ঘোষ
৫ জুন ২০২২, রবিবার

প্রশ্ন হচ্ছে, সবকিছু দখলের পর এখন শ্মশানের দিকে হাত কেন? শ্মশানের জমি দখল করলে মৃতদের আত্মা কিছু বলতে পারবে না তাই। শ্মশান সংখ্যালঘুদের। সুতরাং, সরকার আমার, দল আমার, উপজেলা আমার- সবকিছু ভক্ষণের অধিকারও আমার। চেয়ারম্যান পদে অভিষিক্ত হয়ে তিনি শপথ নিয়েছেন এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তার। কিন্তু আদতে কি তিনি তা পেরেছেন তার শপথের মর্যাদা রাখতে? তাহলে নৈতিকতার স্খলনেও তার চেয়ারম্যান পদ থাকে কি করে?

রক্ষক যখন ভক্ষক। কথাটি জানেন না এমন মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এর নানা রকম ব্যবহার আমরা দেখে থাকি বিভিন্ন ক্ষেত্রে। একজন জনপ্রতিনিধি যিনি মানুষের ভোটে নির্বাচিত তিনি প্রকল্পের টাকা লুট করছেন, এলাকার মানুষের জন্য বরাদ্দ চাল-গম লুটে নিচ্ছেন, এলাকার মানুষের জন্য আসা উপহারের খেজুর একাই খাচ্ছেন, বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকারের টাকা নিজের পেট ভরাটে কাজে লাগাচ্ছেন, ব্যাংক ঋণ নিয়ে হজম করে দিচ্ছেন এমন উদাহরণও ভূরি ভূরি। 

এর বাইরে জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি গ্রাস করার ঘটনাও আছে। কিন্তু শত শত বছরের পুরনো শ্মশান দখলের চেষ্টা, কৌশলে দেবোত্তর সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার একটি প্রবণতা জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। সেই জনপ্রতিনিধি যদি হন সরকারি দলের তাহলে কষ্ট আরও বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন
নিজ এলাকায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া পরপর দুটি ঘটনা সংখ্যালঘু নিরাপত্তার নানা সমীকরণকে ভাবিয়ে তুলছে। 

আমার জন্মভূমি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ার চর। গ্রামের নাম পূর্ব গাইলকাটা, ঘোষপাড়া বলেই সমধিক পরিচিত। শৈশব কৈশোরের দুরন্তপনায় কেটে যাওয়া মুগ্ধতার স্বাদ ফিরে পেতে ফি বছর ছুটে যাই গ্রামের বাড়িতে। ছোট একটি থাকার ঠাঁই আছে গ্রামে। এ পাড়ায় একটি শ্মশান রয়েছে প্রায় চারশত বছরের পুরনো। দশ দিন আগে মধ্যরাতে শ্মশানটি একদল দুর্বৃত্ত ভাঙচুর করে। পরদিন আবারো মাটি ভরাটের নামে শ্মশান দখলের চেষ্টা চালায়। ঘোষপাড়ার মানুষ সেই দখল কর্মে বাধা দিলে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকজন। মনে পড়ে জন্মের পর থেকেই এখানে শ্মশান দেখেছি। এই শ্মশানে আমার পিতা শেষ শয্যায় শায়িত হয়েছেন। শুধু আমার পিতা কেন? আমার পিতা, তার পিতা, তার পিতা এভাবে এ গ্রামের কূল পিতা-মাতারা এখানেই বাতাসে মিশে আছেন। ছোটবেলায় চারপাশে কোনো অবকাঠামো বা বাড়িঘর ছিল না। দিনের বেলাতেও আমরা ভয় পেতাম শ্মশানের সামনে দিয়ে যেতে। একটা গা ছমছমে ভাব বিরাজ করতো এই এলাকায়। কালে কালে মানুষ বেড়েছে। এর কাছাকাছি প্রয়োজনের তাগিদে লোকবসতি বাড়ছে। হয়তো এটাই স্বভাবিক। কিন্তু তাই বলে কি শ্মশান উচ্ছেদ করে সেই জমি ভাগিয়ে নিতে হবে?

 

 

খতিয়ে দেখতে হবে কি এমন ঘটলো যে শ্মশানের জায়গা গ্রাস করতে হবে? এর পাশেই রয়েছে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের আবাসিক ভবন। যার লোকজন শ্মশানে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। শ্মশানের পাশে গড়ে ওঠা আবাসিক ভবন থেকে সেখানে ময়লা ফেলে ভাগাড়ে পরিণত করছে। আর এর সবই করা হচ্ছে পরিকল্পিত। প্রথম কথা হচ্ছে, শ্মশান জেনেও উপজেলা চেয়ারম্যান কেন এই জায়গাটি কিনলেন? আর কিনলেনই যখন শ্মশানের পাশে বসতি গড়ে এখন শ্মশানকে একঘরে করার পাঁয়তারা শুরু করলেন কেন? উত্তর খুব সহজ, শ্মশান উচ্ছেদ করা। শ্মশানের জমিটি ভাগিয়ে নেয়া। শ্মশানে ভাঙচুর আর হামলার ঘটনার খবরে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। তার লোকজন মাটি ভরাটের নামে শ্মশান গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছে এমন কিছুই জানেন না বলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। চেয়ারম্যানের এই দ্বিচারিতায় এটা বুঝতে বাকি নেই কী ঘটতে যাচ্ছিল সেখানে। 

প্রশ্ন হচ্ছে, সবকিছু দখলের পর এখন শ্মশানের দিকে হাত কেন? শ্মশানের জমি দখল করলে মৃতদের আত্মা কিছু বলতে পারবে না তাই। শ্মশান সংখ্যালঘুদের। সুতরাং, সরকার আমার, দল আমার, উপজেলা আমার- সবকিছু ভক্ষণের অধিকারও আমার। চেয়ারম্যান পদে অভিষিক্ত হয়ে তিনি শপথ নিয়েছেন এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তার। কিন্তু আদতে কি তিনি তা পেরেছেন তার শপথের মর্যাদা রাখতে? তাহলে নৈতিকতার স্খলনেও তার চেয়ারম্যান পদ থাকে কি করে? সংখ্যালঘু বলেই কি একজন জনপ্রতিনিধি যা খুশি করতে পারেন- এই প্রশ্নটি সচেতন মানুষ মাত্রেই আসা স্বাভাবিক নয় কি?

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা চিত্র 
২০১৮ সালে করা বিবিএসের জরিপ বলছে, বাংলাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৮৮ দশমিক ৪ ভাগ হিন্দু এবং অন্য ধর্মাবলম্বী ১১ দশমিক ৬ ভাগ। ২০১১ সালের আদমশুমারির হিসাবে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬  কোটি ৪৬ লাখের হিসাবে তাদের সংখ্যা ১  কোটি ৭৪ লাখ। ভারত ভাগের পর ১৯৫১ সালে ৯৭ লাখ ৬ হাজার থেকে ২০১১ সালে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১  কোটি ৩৮ লাখে। কিন্তু সংখ্যাগুরু মুসলিমদের তুলনায় এই হার কমেছে। আর এই কমে যাওয়ার প্রবণতা বর্তমান সময় পর্যন্ত অব্যাহতই রয়েছে। তা পাকিস্তান আমলে যেমনটি কমেছে পরে ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হলেও তা আর বাড়েনি।  জাতীয় নির্বাচনের আগে পরে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আমাদের এখানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখতে পাওয়া যায়। আর এতে করে সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। এর সঙ্গে সংখ্যালঘুদের  ঝরে পড়াও বেড়ে চলেছে। সবশেষ প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে তথ্য রয়েছে। 

নির্বাচন এলেই কেন আলোচনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়?
ফের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর এ সময়টা সামনে রেখে নানা অঙ্ক চলবে সংখ্যালঘুদের নিয়েও। দাবার ঘুঁটির মতো এই চালে সংখ্যালঘুরা কেবলই ব্যবহার হয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। একটি কথা স্বাভাবিকভাবে প্রচলিত আছে, যে সংখ্যালঘুরা নির্দিষ্ট একটি প্রতীকে ভোট দিয়ে থাকে। যুক্তি কি এই যে, সেই প্রতীকের প্রার্থীরা জয়ী হলে সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকেন? তাদের সম্পত্তি বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়? আদতে কি তাই? এই হিসাবটি কি আমরা মিলিয়ে দেখেছি কখনো? ক্ষমতার রদবদলের আগে ও পরে যে ধরনের নির্বাচনী সহিংসতা ঘটে তার কতগুলোর বিচার নিষ্পন্ন হয়েছে তা খতিয়ে দেখলেও বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া যাবে। সবশেষ দুর্গাপুজায় কুমিল্লায় মন্দিরে কোরআন পাওয়ার ঘটনা নিয়ে সারা দেশে যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে এর বিচার কি হয়েছে এখনো। কতজন গ্রেপ্তার হয়েছিল সেসব ঘটনায়? দেশের বিভিন্নস্থানে নীরবে প্রতিনিয়ত যে ধরনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তার পেছনে দেখা যাবে সরাসরি সম্পৃত্ততা ও পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে সরকারি দলের লোকজনের, প্রচ্ছন্ন ভূমিকা থাকে প্রশাসনেরও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশির ভাগ ঘটনা আমলে নিতে চায় না, থানায় অভিযোগ দিতে চাইলে মীমাংসার নামে এড়িয়ে যায়। এমন এন্তার উদাহরণ দেয়া যাবে। কিন্তু এসবের সমাধান কোথায়? সরকারি সদিচ্ছা, দেশের সর্বত্র এধরনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সরব ভূমিকা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে এমপি, মেয়র, চেয়ারম্যানদের ভয়ে গণমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারে বিরত না থাকা, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের যথাযথ বিচারের মুখোমুখি করা, ঐক্যবদ্ধভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দলমত ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সংখ্যালঘুদের নিজস্ব অধিকার আদায়ে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফরম গড়ে তোলা। যারা কোনো দল বা মতের পতাকাতলে না থেকে তার অধিকার প্রশ্নে লড়াই করবে। সদা জাগ্রত থাকবে দুষ্টের দমনে। 

 

সবশেষ
শুরু করেছিলাম নিজ এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধির শ্মশান দখলের ঘটনা দিয়ে। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। আসামিরা আগাম জামিন নিয়ে আইনের ফাঁক ফোকরে দিব্যি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন রকমের ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। পরিস্থিতি সরজমিন দেখতে ঢাকা থেকে ছুটে গেছেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ। তারা দশদিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন পরিস্থিতির উত্তরণে। কিন্তু এই লেখাটি যখন লিখছি ঠিক তখন খবর এসেছে এডভোকেট রানা দাসগুপ্তের নেতৃত্বে যেদিন সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে সেই রাতেই একই উপজেলার টিয়াকাটার পৈলানপুরে আরেকটি শ্মশানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শ্মশান যেখানে নিরাপদ নেই সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা’ ইস্যুটি কি কেবলই নির্বাচনী টোপ, ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার? হ

 

 

পাঠকের মতামত

এটা একেবারেই কাম‍্যনয়। নিন্দনীয়। আপানারা নিজেদেরকে সংখালগু ভাবেন। একটি বিশেষ দলকে ত্রাতা ভাবেন এবং বিশেষ মতাদর্শ লালন করেন।সকলের সমঅধিকার ভিত্তিক নাগরিক হওয়াই সমাধান।

মো হেদায়েত উল্লাহ
৬ জুন ২০২২, সোমবার, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন

আপনার সাথে একমত হতে পারলাম না। আপনি শুধু আপনার ধর্ম দেখেছেন ভারতে মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির করা হয়েছে সেগুলো দেখেননি

রফিক
৪ জুন ২০২২, শনিবার, ৭:৩১ অপরাহ্ন

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

নির্বাচিত কলাম থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com