রিসেট

পদ্মা সেতু দেখতে যাবেন চীনা ভাইস মিনিস্টার

প্রকাশিত: ২৭ মে (শনিবার), ২০২৩ Archive 2022Source: মিজানুর রহমান

তাৎপর্যপূর্ণ এক সফরে এখন ঢাকার পথে চীনের ভাইস মিনিস্টার সান ওয়েইডং। শনিবার থেকে তার দু’দিনের সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে। রোববার পর্যন্ত ঢাকায় সিরিজ কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় কাটাবেন তিনি। সফরকালে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হবে। তার সফরে রাজনৈতিক বোঝাপড়াই মুখ্য বলে ধারণা দিয়েছে সেগুনবাগিচা। দায়িত্বশীলরা বলছেন, আজ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক ফরেন অফিস কনসালটেশন-এফওসিতে চীনা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ওয়েইডং। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মাসুদ বিন মোমেন।

বৈঠক শেষে তার পদ্মা সেতু দেখতে যাওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে কাল ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ তথা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করবেন বলে সন্ধ্যায় সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল সূত্র মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন। সূত্র জানায়, চীনের ভাইস মিনিস্টার ঢাকার পথে রয়েছেন, শুক্রবার মধ্যরাতে তিনি বাংলাদেশে পৌঁছাচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইস্ট এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক হাসানসহ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি এবং চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন। চলতি বছরের চীনের উচ্চ পর্যায়ের কোনো প্রতিনিধির এটা তৃতীয় সফর। গত জানুয়ারিতে আফ্রিকা যাওয়ার পথে (রুট পাল্টে) ঢাকায় নজিরবিহীন যাত্রাবিরতি করেন চীনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিন গ্যাংয়। 

গত মাসে নিঃশব্দে বাংলাদেশ ঘুরে যান চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ দূত দেং শি জুন। সেগুনবাগিচা বলছে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শি জিন পিংয়ের বিশেষ দূতের সফরদ্বয় ছিল নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভাইস মিনিস্টার সান ওয়েইডংয়ের সফরটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। ভাইস মিনিস্টারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেয়ার পর এবারই তিনি প্রথম বাংলাদেশ সফরে আসছেন। ওই পদে আসার আগে তিনি ভারত ও পাকিস্তানে চীনের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে ছিলেন। বিশেষ করে ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে তখন সান ওয়েইডং ছিলেন দিল্লিতে চীনের রাষ্ট্রদূত। সেই সময় ঠাণ্ডা মাথায় তিনি দিল্লির সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কের অবনতি ঠেকিয়েছেন। ওয়াকিবহাল সূত্র বলছে, সাউথ এশিয়া এক্সপার্ট খ্যাত সান ওয়েইডং এমন এক সময় ঢাকা আসছেন যখন মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে চাপে রেখেছে। 

২০১৪ এবং ’১৮-র প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য করার তাগিদ দিয়ে এরইমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য স্বতন্ত্র ভিসা নীতি গ্রহণ করেছে। যার কারণে দেশের রাজনীতি এবং কূটনৈতিক তোলপাড় শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় থাকা প্রভাবশালী রাষ্ট্রদূতদের পুলিশ এসকর্ট সুবিধা আচমকা প্রত্যাহার নিয়েও এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। বিশেষত ওই ঘটনার পর থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস পতাকা নামিয়ে সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন! তাছাড়া দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগীরা জোটবদ্ধভাবে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত চীনের ভাইস মিনিস্টারের ঢাকা সফরের সঙ্গে উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর কোনো সম্পর্ক বা যোগসূত্র আছে কি-না? তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 

তাছাড়া ক্রমেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভরকেন্দ্রে পরিণত হওয়া ঢাকাকে কাছে পেতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও চীনের সামপ্রতিক তৎপরতার অংশ কি-না? সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে কূটনীতিক মহলে। অবশ্য সেগুনবাগিচা বলছে, রাজনীতির টালমাটাল ওই অবস্থা বিবেচনায় সফরটি নিয়ে বিশ্লেষণ হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত ভাইস মিনিস্টারের সফরে এফওসি-ই মুখ্য। বৃহৎ ওই আমব্রেলার আওতায় ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রাজনীতি, রোহিঙ্গা সংকটসহ সম্পর্কে সব বিষয় নিয়েই কথা হবে। এজেন্ডায় সামরিক সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকছে বলে নিশ্চিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে বেইজিং প্রস্তাবিত গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে আলোচনা চলছে। এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের সর্বশেষ সংশোধিত খসড়া এখন ঢাকার বিবেচনায়। শনিবারের এফওসিতে এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা এবং সমঝোতাটি চূড়ান্ত হতে পারে বলে আভাস মিলেছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)’র পর জিডিআইকে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর ফ্ল্যাগশিপ ডেভেলপমেন্ট রেসিপি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যার অধীনে বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের চীনহিতৈষী দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি নিতে চায় বেইজিং। সেইসঙ্গে দেশগুলোর কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নেয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে শি জিন পিং সরকারের।

নির্বাচনের আগে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সফর বিনিময় নিয়ে আলোচনা: এদিকে রোববার  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন চীনের ভাইস মিনিস্টার সান ওয়েইডেং। এবারের সফরে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সফর নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা আছে। সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান ও ওয়াশিংটন সফর, ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের আউটলুক ঘোষণা এবং আপাত দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্বস্তিকর সম্পর্কের মধ্যে চীনের ভাইস মিনিস্টার কিছুটা তড়িঘড়ি করে ঢাকায় আসছেন। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফায়েজ আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, বেইজিং আমাদের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। 

ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে নিয়মিত ও বিশেষ বৈঠকের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় তারা অব্যাহতভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে ও যাবে। প্রধানমন্ত্রীর সমপ্রতি তিন দেশ সফরের বিষয়ে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সফর হলে সম্পর্কের গভীরতা আরও বেশি হবে। সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, চীনের ভাইস মিনিস্টারের সফরে উভয়ের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেখানে নির্বাচনের আগে উচ্চ পর্যায়ের একটি রাজনৈতিক সফর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে তা ঢাকা বা বেইজিং নাকি সফর বিনিময়- তা এখনও নিশ্চিত হয়নি। 

ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরব যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের বক্তব্যকে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে অনেকে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আউটলুক ঘোষণা ও জাপান সফরের সময়ে সাউথ চায়না সমুদ্র নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের বিষয়টিও বুঝতে চায় চীন। সামপ্রতিক সময়ে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো বিবেচনা করা হলে দেখা যাবে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের কিছু বোঝাপড়ার বিষয় রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এটি কোনো গোপন বিষয় নয় যে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্বস্তিকর সম্পর্ক থাকলে চীন সেটির সুযোগ নেবে। আবার অন্যদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক ঘোষণা ও সাউথ চায়না সি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কোন প্রেক্ষাপটে নেয়া, সেটিও বুঝতে চাইবে চীন। অর্থাৎ মোটাদাগে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছে বেইজিং, যার জন্যই ভাইস মিনিস্টারের তড়িঘড়ি ওই সফর।