রিসেট

জ্বলছে পাকিস্তান

প্রকাশিত: ১১ মে (বৃহস্পতিবার), ২০২৩ Archive 2022Source: মানবজমিন ডেস্ক

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। তাকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ফলে জ্বলছে পাকিস্তান। এরই মধ্যে পেশোয়ারে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪ জন। ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে পুরো দেশ। থানায় হামলা হয়েছে। জ্বলছে পুলিশের গাড়ি। করাচি, লাহোর, কোয়েটা, পেশোয়ারসহ সারা দেশে একই অবস্থা। লাহোরে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় এক সেনা কর্মকর্তার বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। টার্গেট করা হচ্ছে সেনা কর্মকর্তাদের। রাওয়ালপিন্ডিতে সামরিক বাহিনীর হেডকোয়ার্টারের গেটেও বিক্ষোভ করেছে পিটিআই। সেখানে তারা রাস্তা ঘিরে শুয়ে পড়েন। এ অবস্থায় পাঞ্জাব, খাইবার পখতুনখাওয়া, বেলুচিস্তান, ইসলামাবাদে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার, ফেসবুক ও ইউটিউব। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনেক স্থানে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ। বিরোধী দলের কয়েক শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাতেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না সরকার। লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন পিটিআই কর্মীরা। এমন অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। দেশ তিনটি পাকিস্তান সফরের বিষয়ে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে পুরো পাকিস্তান। তাকে আল কাদির ট্রাস্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গতকাল কড়া নিরাপত্তায় জাতীয় জবাবদিহিতা বিষয়ক ব্যুরোর এক আদালতে তোলা হয় ইমরান খানকে। এ সময় প্রসিকিউশন থেকে তার ১৪ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। যুক্তিতর্ক শেষে আদালত তাকে ৮ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে। তবে এদিন ইমরান খানকে তোষাখানা মামলায়ও অভিযুক্ত দেখানো হয়। 

ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের (পিটিআই) আহ্বানে সাড়া দিয়ে গোটা দেশে বিক্ষোভ শুরু করেছে মানুষ। এবারের ক্ষোভ সব সামরিক বাহিনীর ওপরে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক বাহিনীকেই টার্গেট করেছে ইমরান সমর্থকরা। এ ছাড়া রাজধানীর উচ্চ নিরাপত্তা জোনেও পুলিশের মুখোমুখি হয়েছে পিটিআই কর্মীরা। এরইমধ্যে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট জানিয়েছে, বৈধ প্রক্রিয়ায়ই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইমরান খানকে। গ্রেপ্তারের পর এর পক্ষে-বিপক্ষে পাল্টাপাল্টি দাবি তুলছে সরকার ও পিটিআই। সরকারের তরফ থেকে এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হলেও পিটিআই দেশব্যাপী এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। পিটিআই কর্মীদের থামাতে রাজধানী ইসলামাবাদসহ বেশ কিছু এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

করাচিভিত্তিক গণমাধ্যম ডন জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে টুইটারসহ সকল সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে আন্দোলনকারীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাদের প্রধান টার্গেট পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। ইমরান খান তাকে গ্রেপ্তার ও হত্যাচেষ্টার জন্য বরাবরই সামরিক বাহিনীকে দায়ী করেছেন। এবার তাকে গ্রেপ্তারের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক বাহিনীর অবস্থানে হামলা হয়েছে। করাচি এবং লাহোরে ইমরান খানের সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, পেশোয়ার, ফয়সালাবাদ, মুলতান, কোয়েটাসহ বড় শহরগুলোর রাস্তা অবরোধ করেন। ইন্সপেক্টর জেনারেল আকবর নাসির খান আদালতে অভিযোগ করেছেন, ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। অপরদিকে পিটিআই জানিয়েছে, ইমরান খানের সমর্থক ও আইনজীবীকে মারধর করে তাকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।

আরেক ভিডিওতে দেখা গেছে, পিটিআই সমর্থকরা সামরিক বাহিনীর গাড়িবহর থামিয়ে তাতে হামলা চালিয়েছে। বোতল ও পাথর ছুড়ে গাড়ি ভাঙার চেষ্টা করছে তারা। এ ছাড়া ফর্ট্রেস স্টেডিয়ামের বাইরে একটি পুলিশের গাড়িও আগুনে জ্বালিয়ে দেয় ইমরান সমর্থকরা। আগুন ধরানো হয় একাধিক নিরাপত্তা চৌকিতেও। 

লাহোরের পাশাপাশি তা-ব চলেছে করাচিতেও। সেখানে শত শত পিটিআই কর্মী রাস্তা দখল করে রেখেছে। সিন্ধু প্রদেশের প্রধান সড়কগুলোও বন্ধ হয়ে আছে। পুলিশ সেখানে গণগ্রেপ্তার চালাচ্ছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন বেশ কয়েক জন এমপি ও বহু কর্মী। ইমরানের গ্রেপ্তারের এক ঘণ্টার মধ্যেই সিন্ধুর শরিয়া ফয়সাল এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। পিটিআই’র করাচি অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট আফতাব সিদ্দিকী সমর্থকদের দ্রুত পার্টি হেডকোয়ার্টারে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। তবে পুলিশ তাদেরকে মাঝপথে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শরিয়া ফয়সালসহ আশেপাশের বেশ কিছু এলাকা।

ভ্রমণে সতর্কতা বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার 
পাকিস্তান ভ্রমণে নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করেছে বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ইমরানের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে তা আরও ভয়ানক রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিজ নিজ নাগরিকরা যাতে পাকিস্তান ভ্রমণ না করেন সেই আহ্বান জানিয়েছে দেশ তিনটি। বৃটেনের ‘ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস’ বা এফসিডিও বৃটিশদের পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমাবেশ ও জনসভা এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দিয়েছে। সতর্কতার অংশ হিসেবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে চোখ রাখতে বলা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ক্লিভারলি জোর দিয়ে বলেছেন, আমরা পাকিস্তানে শান্তিপূর্ণ গণতন্ত্র দেখতে চাই। আমরা চাই দেশটিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক। 

পাকিস্তান সফরের ‘ট্র্যাভেল এডভাইস’ পেজ আপডেট করেছে বৃটেন। ওই আপডেটটি বৃটিশ ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার অ্যান্ড্রু ডালগ্লিশ তার টুইটার অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন। এতে পাকিস্তানে অবস্থিত বৃটিশ নাগরিকদের বেশ কিছু অঞ্চলে যেতে পুরোপুরি নিষেধ করা হয়েছে। এগুলো হলো বাউজার, মহমান্দ, খাইবার, ওরাকজাই, কুররাম, উত্তর ওয়াজিরিস্তান, দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান, চরসাদ্দা, কোহাট, ট্যাঙ্ক, বান্নু, লাক্কি, ডেরা ইসমাইল খান, সোয়াত, বুনের এবং পেশোয়ার। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু হাইওয়ে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এদিকে পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘স্বাভাবিক না’ বলে বর্ণনা করেছে দেশটিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। ফলে যেসব মার্কিন নাগরিক পাকিস্তান ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন তাদের সার্বিক দিক ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।
মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসলামাবাদে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে দূতাবাস। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ১০ই মের একটি শিডিউল বাতিল করা হয়েছে। পাকিস্তানে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি জনসমাগম স্থান এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শান্তিপূর্ণভাবে চলতে দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিরোধীদের যেমন দায়িত্ব আছে, সরকারেরও তেমনি দায়িত্ব আছে। 

দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক পিটিআই’র
দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। বুধবার সকালে দলটির নেতারা এ ডাক দেন। ডন জানিয়েছে, পাকিস্তানের সকল নাগরিককে রাস্তায় নেমে আসতে বলেছে পিটিআই। এদিকে পিটিআই দলের সিনিয়র নেতারা আরও ঘোষণা করেছেন, গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগে ইমরান খানের ঘোষিত সারা দেশে জনসভার সময়সূচি অপরিবর্তিত থাকবে। ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা পর পিটিআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মেহমুদ কুরেশি, সিনেটর সাইফুল্লাহ খান, আজম স্বাতী ও এজাজ চৌধুরী, পিটিআই’র জ্যেষ্ঠ নেতা মুরাদ সাঈদ, আলী আমিন খান গান্দাপুর এবং হাসান নিয়াজির সমন্বয়ে গঠিত ‘জরুরি কমিটি’ বৈঠক ডাকে।

পিটিআই’র কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল আসাদ উমর জানিয়েছেন, কুরেশির নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের কমিটি পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তারের পর দলের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করার কথা। তিনি বলেন, সারা বিশ্বকে দেখানো হচ্ছে পাকিস্তানে কোনো আইন আর অবশিষ্ট নেই। ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে করাচি বিমানবন্দরে কুরেশি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের লন্ডন সফরের সঙ্গে এই গ্রেপ্তারের সম্পর্ক আছে। এটি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ওপর সরকারের ‘পূর্বপরিকল্পিত হামলা’।

সামরিক কর্মকর্তাদের বাড়িতে হামলা নিয়ে উদ্বেগ 
সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের টার্গেট করা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী শেরি রেহমান। এক টুইট বার্তায় তিনি এ ঘটনাকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং নিন্দনীয়’ বলে বর্ণনা করেছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে দেশব্যাপী টানা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন ইমরান খান সমর্থকরা। আর্মি সদর দপ্তর থেকে শুরু করে সামরিক কর্মকর্তাদের বাসভবনেও হামলা চালাচ্ছেন তারা। লাহোরে এমন এক সেনা কর্মকর্তার বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এরই ভিত্তিতে শেরি রেহমান বলেন, এনএবি’র হাতে ইমরান খানের গ্রেপ্তারের পর পিটিআই সমর্থকরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং নিন্দনীয়। বৈধ গ্রেপ্তারের পর এ ধরনের দাঙ্গা এর আগে কখনোই দেখা যায়নি।

কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেবে না সেনাবাহিনী: পাকিস্তান আইএসপিআর: ইমরান খান গ্রেপ্তার এবং তাকে কেন্দ্র করে চলমান সহিংসতায় বিবৃতি দিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন্স (আইএসপিআর)। তারা বলেছে, ৯ই মে ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর ‘সেনাবাহিনীর প্রপার্টি এবং স্থাপনাকে টার্গেট করে’ প্রতিবাদ বিক্ষোভ বা ভাংচুরের দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা বলেছে আইএসপিআর। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন। ওই বিবৃতিতে আইএসপিআর আরও বলেছে, কাউকেই আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেবো না। এতে আরও বলা হয়, জাতীয় জবাবদিহিতা বিষয়ক ব্যুরোর অভিযোগের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট থেকে। ‘তাকে গ্রেপ্তারের পরপরই সেনাবাহিনীর প্রপার্টি এবং স্থাপনাকে টার্গেট করে হামলা হয়েছে। এ সময় সেনাবিরোধী স্লোগান দেয়া হয়েছে’। 

ও-এ লেভেল পরীক্ষা বাতিল: ওদিকে আজ ১১ই মে, বৃহস্পতিবার চলমান ও এবং এ লেভেলের সব পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করেছে বৃটিশ কাউন্সিল। বুধবার এ বিষয়ে তারা একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ও-এ লেভেলসহ কেমব্রিজ, পিয়ারসন, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, এসিসিএ এবং আইইএলটিএসের সব পরীক্ষা, যা বৃহস্পতিবার হওয়ার কথা পাকিস্তানে, তার সবটাই বাতিল করা হয়েছে।