রিসেট

চিনির দাম কেজিতে ১৬ টাকা বাড়লো

প্রকাশিত: ১১ মে (বৃহস্পতিবার), ২০২৩ Archive 2022Source: অর্থনৈতিক রিপোর্টার

চিনির দাম কেজিতে ১৬ টাকা বাড়ালো সরকার। চিনি পরিশোধনকারীরা এখন থেকে নতুন এই দামে চিনি বিক্রি করতে পারবে। ৩ কারণে চিনির দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি হওয়া, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া ও দেশে বাড়তি পরিবহন খরচ। বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের চিনির দাম বাড়ানোর কথা জানান তিনি। সর্বশেষ গত এপ্রিলে চিনির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন প্রতি কেজি খোলা চিনি ১০৪ টাকা এবং প্যাকেট চিনি ১০৯ টাকা করার ঘোষণা এসেছিল। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পরিশোধিত খোলা চিনির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১২০ টাকা, যা আগে ছিল ১০৪ টাকা। আর প্যাকেটজাত পরিশোধিত চিনির দাম কেজি প্রতি ১০৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২৫ টাকা করা হয়েছে। তবে বাজারে এই বাড়তি দরেও চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। আর প্যাকেটজাত চিনি পাওয়াই যাচ্ছিল না। বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স এসোসিয়েশনকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে চিনি পরিশোধনকারীরা নতুন এই দামে চিনি বিক্রি করার অনুমতি পেলো। এদিকে দাম বাড়ানোর পরে সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, তারচেয়ে অন্তত ২০ টাকা বেশি দামে বাজারে ইতিমধ্যেই চিনি বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে বেশ কিছুদিন ধরেই চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে। রাজধানীর কাওরান বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১৩০ টাকায় পাওয়া গেলেও রাজধানীর অন্যান্য বাজার ও মুদির দোকানে ১৪০ টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ সরকার নির্ধারিত খোলা চিনির দাম ছিল ১০৪ টাকা ও প্যাকেটজাত ছিল ১০৯ টাকা।
বাণিজ্য সচিব বলেন, চিনির জন্য শুল্কহার এখনো বলবৎ রয়েছে। এটা ৩১শে মে শেষ হবে। চিনির জন্য শুল্কহার অব্যাহত রাখার জন্য আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে চিঠি পাঠাবো। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির মূল্য এবং ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চিনি আমদানিতে শুল্কছাড়ের মেয়াদ বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে চিঠি দেয়া হবে।

এদিকে বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে কোথাও কোথাও এর চেয়ে কিছুটা বেশি দামেও চিনি বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এখন প্যাকেটজাত চিনি একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। সুপারশপে কিছু প্যাকেটজাত চিনি পাওয়া গেলেও তা সীমিত। 
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের বাজারদরের হিসাবে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়। 
ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে, তাতে বলা হয়, এক কেজি পরিশোধিত খোলা চিনির প্রস্তাবিত মিলগেট মূল্য ১১৫ টাকা এবং পরিবেশক মূল্য হবে ১১৭ টাকা। পরিশোধিত প্যাকেটজাত চিনির মিলগেট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১১৯ টাকা আর পরিবেশক পর্যায়ে যার দাম হবে কেজিতে ১২১ টাকা। কমিশন এ দাম প্রস্তাব করেছে ডলারের বিনিময়মূল্য ১১১ টাকা হিসাব করে।

আন্তর্জাতিক বাজারদরের বিষয় উল্লেখ করে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন বলছে, ২০২২ সালের মে মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত চিনি বেচাকেনা হয়েছে ৪২০ ডলারে। চলতি মাসের শুরুতে অপরিশোধিত সেই চিনির দাম হয়েছে ৫৮০ ডলার, যা গত বছরের চেয়ে টনপ্রতি ১৬০ ডলারের মতো বেশি। গত বছর ডলারের বিনিময়মূল্য ছিল ৯০ টাকা। এবার সেটা ১১০ থেকে ১১১ টাকা। তবে এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন ব্যয় বাড়েনি বলে জানিয়েছে কমিশন।
বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স এসোসিয়েশনের মহাসচিব ও দেশবন্ধু গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম রহমান বলেন, ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের নতুন দামের প্রস্তাবের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারেননি তিনি। 

ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেড়েছে এবং দেশে ডলারের বিনিময়মূল্য ১১৫ টাকা উল্লেখ করে চিনির দাম বাড়ানোর জন্য গত ১৭ই এপ্রিল কমিশনে চিঠি দেয় বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স এসোসিয়েশন। সেখানে প্রতি কেজি পরিশোধিত খোলা চিনির দাম ১২৫ টাকা ও প্যাকেটজাত চিনির দাম ১৩৫ টাকা প্রস্তাব করে মিল মালিকদের এই সংগঠন।
জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সরকার বাজারে চিনির দাম নির্ধারণ করে দিতে শুরু করে। এর মধ্যে পাঁচ দফায় চিনির দাম বেঁধে দেয়া হলেও একবারও চিনির সরকারি মূল্য কার্যকর হয়নি। সবশেষে সরকার গত ৬ই এপ্রিল প্রতি কেজি চিনির দাম তিন টাকা কমায়। এতে সরকার ঘোষিত পরিশোধিত খোলা চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল কেজিতে ১০৪ টাকা আর পরিশোধিত প্যাকেটজাত চিনির দাম প্রতি কেজি ১০৯ টাকা। এখন উভয় পদের চিনিতে একলাফে সরকার নির্ধারিত দাম ১৬ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলো।
সচিব বলেন, চিনির জন্য শুল্ক কমানো হয়েছে। কমানোর পরও দাম অতটা কমানো যাচ্ছে না। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে ডলারের দামও। এ ছাড়া দেশের মধ্যে পরিবহন খরচও কিছু বেড়ে গেছে। এর কারণেই দামে প্রভাব পড়ছে। নতুন এ দাম কার্যকরে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান সচিব। 

জানা গেছে, গত মাসে পরিশোধিত প্রতি কেজি খোলা চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১০৪ টাকা এবং পরিশোধিত প্যাকেটজাত চিনির খুচরা মূল্য ১০৯ টাকা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। কিন্তু রাজধানীর খুচরা বাজারে চিনির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রতি কেজি চিনিতে ভোক্তার পকেট থেকে কেটে নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ৩১ টাকা। অতিরিক্ত এ টাকার পুরোটাই গেছে ব্যবসায়ীদের পকেটে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) হিসাবে, বছরে দেশে চিনির চাহিদা ২০ লাখ টন। অর্থাৎ প্রতিদিন ৫ হাজার ৪৭৯ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। প্রতি কেজি চিনি ৩১ টাকা বেশি দামে বিক্রি হলে দৈনিক ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ৬২ হাজার ৯৫০ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন ব্যবসায়ীরা।

মালিবাগ বাজারের মুদি দোকানি সোলেয়মান বলেন, একদিকে দাম বাড়ছে, অপরদিকে চিনির সংকট। ফলে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তাই বিক্রি বন্ধ রেখেছি। কারণ চিনি কেনার সময় পাকা রসিদ দেয়া হয় না। মোবাইল কোর্ট এলে ঝামেলায় পড়তে হয়। 
মৌলভীবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী গোলাম মাওলা বলেন, বিশ্ববাজারে দাম কতো, সরকার কতো দাম বেঁধে দিয়েছে, তার কোনো প্রভাব বাজারে পড়ে না। মিল থেকে যে দামে চিনি বিক্রি করা হয়, সে দামেই আমাদের কিনতে হয়। এর সঙ্গে সামান্য খরচ যুক্ত করে বিক্রি করি। অন্যদিকে হুটহাট সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়। এতে সংকট আরও তীব্র হয়। 
কনজ্যুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, তেল ও চিনির মতো প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে হবে আগে। প্রয়োজনে নজরদারি বাড়াতে হবে।