ঢাকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, মঙ্গলবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১৬ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

শরীর ও মন

সবারই জানা উচিত

ভেরিকোজ ভেইন

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল হাই
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, শনিবার
mzamin

মানুষ বা প্রাণীর শরীরের রক্তের প্রবাহ কিছু জটিল নিয়ম অনুসরণ করে। হৃৎপিণ্ড পাম্প করে অক্সিজেনবাহী রক্ত মুহূর্তের মধ্যেই ধমনি উপ-ধমন দিয়ে সর্বাঙ্গে নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেয়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বা টিস্যু এ রক্ত থেকে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করে। যে নালী দিয়ে রক্ত আমাদের শরীরের আনাচে-কানাচে পৌঁছায়, একই পথ দিয়ে সে কিন্তু ফিরে আসে না। ফিরে আসে অন্য পথে, শিরা-উপশিরা হয়ে।  এ রোগের লক্ষণ মানুষের পায়েই বেশি হয়। সাধারণত পায়ের রক্তনালীগুলোর ভেতরের রক্ত মাধ্যাকর্ষণজনিত কারণে উপরের দিকে প্রবাহিত হতে বাধা পায়। পায়ের মাংস পেশিগুলো সংকোচন প্রসারণের মাধ্যমে রক্ত উপরের দিকে পাম্প করে নিয়ে যায়। পায়ের শিরা দিয়ে ফিরে আসার পথে রক্ত শিরার ভেতরে থাকা অনেকগুলা কপাট বা দরজার সম্মুখীন হয়। রক্তের ধাক্কায় এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায় এবং রক্ত প্রবাহিত হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ ও হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন
ফলে গ্রেভিটি বা মাধ্যাকর্ষণীয় ভারজনিত কারণে পার হয়ে যাওয়ার রক্ত নিচে নেমে যায় না। যখন এই ভালভগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা বিনষ্ট হয়ে যায়, তখন রক্ত হৃৎপিণ্ডে না গিয়ে শিরায় ফিরে আসে। যার ফলে শিরাগুলোর মধ্যে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রক্ত সঞ্চারিত হয়। ফলে শিরা ফুলে উঠে। এ অবস্থাকেই মূলত ভেরিকোজ ভেইন ডিজিজ বলা হয়। এই রোগের প্রকোপ ভয়ানক ভাবে অনেক বেশি। আমাদের দেশে ৫ থেকে ১০% মানুষের এ রোগ হলেও পাশ্চাত্যে এ রোগের প্রকোপ প্রায় ২৫%। সৌদি আরবে প্রায় অর্ধেক মানুষেরই এ রোগের উপসর্গ দেখা যায়। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, গবেষণায় দেখা গেছে, এ রোগের প্রকোপ এত উচ্চ মাত্রায় থাকলেও তুলনামূলকভাবে এ রোগ বিষয়ে সচেতনতা অনেক কম। খুব অল্প লোকেরই এ রোগের বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান রয়েছে।  

উপসর্গ: ভেরিকোস ভেইন পায়ের শিরাগুলোতে বেশি হয় এবং ত্বকের উপর থেকেই শিরাগুলো সহজেই দৃশ্যমান হয়। পুরুষের তুলনায় মহিলারা এই রোগে বেশি ভোগেন। রোগীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পায়ের উরু থেকে হাঁটুর পিছন দিকের শিরাগুলো অস্বাভাবিক ভাবে ফুলে যাওয়ার উপসর্গ নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে আসেন। শিরাগুলো পেঁচানো এবং গাঢ় বেগুনি বা নীল রঙের হয়ে থাকে। বেশির ভাগেরই পায়ে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। আবার কারো কারো অনেক উপসর্গ থাকে। যেমন:  সারাদিন পায়ে একটা অস্বস্তি বা জ্বালা থাকা, পা কামড়ানো, অসাড় বোধ হওয়া ও ব্যথাও পাওয়া, পা ভারী-ভারী মনে হওয়া। অনেকেরই রাতে পায়ে টান ধরে। যারা বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বেশিক্ষণ বসে কাজ করেন তাদের ক্ষেত্রেই এই সমস্যাগুলো বেশি হয়।  পায়ের ত্বকে জটিলতা প্রায়ই দৃশ্যমান হয়। প্রথমেই আক্রান্ত শিরার উপরিস্থ ত্বকে চুলকানি বোধ হতে পারে, ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে, এ স্থানে একজিমা হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে ত্বকের সংক্রমণ সহজেই ঘটে। ত্বকের আরেকটি মারাত্মক জটিলতা হলো ত্বকে আলসার বা ঘায়ের সৃষ্টি হওয়া। স্ফীত রক্তনালী থেকে অনেকের রক্তপাতও ঘটে। বিরল হলেও কিছু কিছু রোগীর থ্রম্বোসিস হতে পারে, যেখানে শিরায় ‘ব্লাড ক্লট’ হয়ে জীবন বিপন্ন হতে পারে। 

কারণ: প্রকৃত কারণ অনেকটাই অজানা। তবে যারা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করেন, তাদের শিরায় (ঠবরহ) বেশি রক্ত জমা হয়ে যায় ও টান পড়ে। আবার শরীরের কিছু কিছু রোগ আছে যেখানে শরীরের রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায়, যেমন প্রেগন্যান্সি। এ সময়ে অনেকের শরীরে ভেরিকোস ব্রেইনের সৃষ্টি হয়। মাসিকের সময় এবং হরমোনের অস্বাভাবিকতার কারণেও এ রোগ হতে পারে। মোটা মানুষদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাস থাকে।  

মেডিক্যাল চিকিৎসা: যাদের ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বেশি।  *ফোম স্কেলেরোথেরাপি রোগের পরিসর সীমিত হলে ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরাতে স্‌ক্েলরোসিং সলিউশন দেওয়া হয়।  *লেজার বা রেডিওফ্রিকুয়েন্সি ট্রিটমেন্টু এই পদ্ধতিতে শিরাগুলোকে রেডিওফ্রিকুয়েন্সি বা লেজারের মাধ্যমে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। * সার্জারি মাধ্যমে স্ফীত রক্তনালী বন্ধ করে দেওয়া।  

রোগীদের জন্য কিছু টিপস: * জীবনাচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। রোগ জটিল হয়ে গেলে চিকিৎসা কখনোই সহজ নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসায় সফলতার হার অনেক কম।  * উঁচু হিলের জুতা পরবেন না। * বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করবেন না, ঘন ঘন পজিশন চেঞ্জ করবেন। * কম লবণযুক্ত খাবার খাবেন। * ধূমপান অবশ্যই ত্যাগ করবেন।  * নিয়মিত ব্যায়াম করবেন। * শোবার সময় বা বসার সময় পায়ের নিচে কিছু রেখে পা উঁচু রাখবেন। 

লেখক: (চর্ম, যৌন ও এলার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ) জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।  চেম্বার: ১২, স্টেডিয়াম মার্কেট, সিলেট। ফোন-০১৭১২-২৯১৮৮৭

শরীর ও মন থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status