ঢাকায় আয়োজিত সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের অনুষ্ঠানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার রক্ষা ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বক্তারা। অনুষ্ঠানে চারজন রাষ্ট্রদূতসহ বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখেন। সিজিএস আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অফ বেঙ্গল কনভারসেশন’ এর প্রথমদিন ছিল গতকাল। সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক এবং কনভারসেশনের চেয়ার জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় প্লেনারি সেশনে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস, বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন, জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি এবং অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জেরেমি ব্রুয়ার বক্তব্য রাখেন।
পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন। ‘যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার’ উল্লেখ করে তিনি আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যাপারে যুক্তরাজ্য খুব আগ্রহী বলেও জানান তিনি।
মার্কিন দূত পিটার হাস তার বক্তব্যে বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিকে যা কিছুই হয় সেটা সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলে। এ অঞ্চলকে তিনি সবচেয়ে গতিময় অঞ্চল উল্লেখ করে বলেন, এখানে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর উত্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তন।
যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের দেশগুলোকে কোনো পক্ষ নিতে জোর করছে না বলেও স্মরণ করিয়ে দিয়ে পিটার হাস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশে এবং সারা বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করে যাবে। গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন হতে চাই এটা বলতে আমাদের কোনো লজ্জা নেই। বাংলাদেশের অনেক মানুষের করোনার সম্পূর্ণ টিকা নেয়ার প্রশংসা করেন তিনি।
ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয় বলে স্মরণ করিয়ে দেন মার্কিন দূত। সারা বিশ্বের উন্নতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের এজেন্ডা সেট করে পিটার হাস জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল দেখা। এই লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি মূল উদ্দেশ্য অনুসরণ করে- প্রথমত: ইন্দো-প্যাসিফিক দেশগুলোর সঙ্গে মার্কিন সামরিক সম্পর্ক জোরদার করা, দ্বিতীয়ত: গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, বহুত্ববাদ, সহনশীলতা, সুশাসন এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানানো। এ ছাড়াও তিনি গণতন্ত্র, রোহিঙ্গা ইস্যু, জলবায়ু পরিবর্তনসহ আরও অনেক বিষয়ে আলোচনা করেন। অবাধ, মুক্ত, নিরাপদ, ইনক্লুসিভ ইন্দো-প্যাসিফিকের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বক্তব্যকে অন্য রাষ্ট্রদূতরাও সমর্থন করেন।
জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি নিজ বক্তব্যে তার দেশের তিনটি গুরুত্বারোপের জায়গার কথা স্মরণ করেন। সেগুলো হলো- গণতন্ত্র, অর্থনীতি, শান্তি ও স্থিতিশীলতা। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন জাপান সফরে অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলোচনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জেরেমি ব্রুয়ার তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সফলতার সঙ্গে করোনাকালীন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে। এ ছাড়াও তিনি বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং অঞ্চলগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেন।
পরিবেশ বিষয়ক ‘ফরেস্ট ফর দ্য ট্রিস’ শীর্ষক আলোচনা:
বে অফ বেঙ্গল কনভারসেশন এর প্রথম দিন পরিবেশ বিষয়ক ‘ফরেস্ট ফর দ্য ট্রিস’ শীর্ষক আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়। দেশ ও বিদেশের রাজনীতিবিদ, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন পেশার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, এবং লেখকরা বৈঠকে যোগদান করেন। এ পর্বের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাস্টিন গ্রিন, ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রামস, ইউএস ফরেস্ট সার্ভিস এবং এডওয়ার্ড এল ভারগো, প্রফেসর, আরবান অ্যান্ড স্ট্রাকচারাল এনটোমোলোজি, টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি। সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন সিজিএস’র চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী।
ভারত এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখছে: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের’ ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সেই ১৯৪৭ থেকেই পাকিস্তানিরা এ অঞ্চলের নানা ইস্যুতে ভারতবিরোধী কার্ড ব্যবহার করে আসলেও এখন বিষয়টি ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের নীতি নির্ধারণ করে না, নীতি নির্ধারণ করে দিল্লি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য তিনি ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের নির্বাচনে দেশটির প্রভাব বিস্তারের কথা উল্লেখ করেন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের কথা ভুলা যাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাছাড়া, ২০০৮ সালের পর থেকে ভারত ‘এক ঝুড়িতে সব ডিম’ রাখছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর আগের অধিবেশনে ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর সাংবাদিকতা করা দিন দিন কতোটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আলোচনা করে বলেন, বিগত দুটি নির্বাচনে কেউ ভোট দিতে পারেনি।
চীন না থাকলে এত ফোরাম হতো না: প্লেনারি সেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ‘নেপাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অ্যান্ড এনগেজমেন্ট’ এর গবেষণা পরিচালক ড. প্রমোদ জাশওয়াল বলেন, চীন এ অঞ্চলের ছোট দেশগুলোর জন্য বিকল্প সুযোগ নিয়ে আসছে। তাই ছোট দেশগুলোর অনেকেই চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। চীন না থাকলে কোয়াড, অকাস, ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক কিছুই হতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতের বিখ্যাত দ্য হিন্দু পত্রিকার জাতীয় এবং কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ইউক্রেনের পক্ষে ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
