ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, বুধবার, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

অনলাইন

ফ্রাইডে জার্নাল

সাফজয়ী মহিলা ফুটবল দল সমাচার

ড. মাহফুজ পারভেজ

(৪ দিন আগে) ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার, ১১:০০ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৬:৩৫ অপরাহ্ন

১. যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৭তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে দেশে ফিরে সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সকল ফুটবলারকে পুরস্কারের অর্থ প্রদান করবেন। নারী ফুটবল দলের যেসব ফুটবলারদের ঘর দরকার, তাদের ঘর দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কার বাড়ির প্রয়োজন সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এসব প্রশংসনীয় বিষয় ও আশাবাদী সংবাদ। কিন্তু তার আগেই সাফজয়ী মহিলা ফুটবল দল ও দলের সদস্যদের ঘিরে যেসব কাণ্ড ঘটলো তার ব্যাখ্যা কি? এসবের দায়-দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা কার?

২. সারাদেশ যখন সাফজয়ীদের নিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছে ঠিক তখন দুঃসংবাদ শুনতে হয়েছে চ্যাম্পিয়ন দলের নারী ফুটবলার আঁখি খাতুনকে। সরকার থেকে পাওয়া জমি নিয়ে আদালতের সমন বুঝে নিতে তার বাবাকে শাসিয়ে গেছে শাহজাদপুর থানা পুলিশ। এমন অভিযোগ করেছেন আঁখি ও তার বাবা। আদালতের সেই কাগজে সই করতে রাজি না হওয়ায় আঁখির বাবাকে থানায় উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকিও দেন এসআই মামুন নামের এক পুলিশ অফিসার- এমনটাই অভিযোগ আঁখির।

৩. ইতিহাস গড়ে নারী ফুটবলাররা দেশে ফিরেছেন। সাফ শিরোপা জেতায় পেয়েছেন ছাদখোলা বাসের সংবর্ধনা। গোটা দিন শিরোপা উদযাপনে মেতে থাকেন সাবিনা-সানজিদারা।

বিজ্ঞাপন
তবে দিনশেষে দুঃসংবাদ পেতে হয় তাদেরও। ট্রফি হাতে দেশে আসা সাফ জয়ী দলের সদস্য কৃষ্ণা রানীর ব্যাগ থেকে আড়াই লাখ টাকা চুরি হয়েছে। সাফজয়ী ফুটবলার কৃষ্ণা রানী সরকার ও শামুসন্নাহারের লাগেজ থেকে ডলার, কাপড়চোপড় ও অন্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ঘটনা ঘটেছে।

৪. বিমানবন্দর কি বিশুদ্ধ চোরদের লালন করে? আমাদের প্রবাসী শ্রমিক ভাইদের লাগেজের মালামাল  চুরি করতে করতে খাসিয়ত এত খারাপ হয়েছে যে, সাফ ফুটবল বিজয়ী নারীদের লাগেজেও হাত দিয়েছে। এটা মোটেও বাইরের কারো দ্বারা সংঘটিত সাধারণ অপকর্ম নয়। এর জন্য বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের কেউ না কেউ অবশ্যই দায়ী। সেদিন যারা কর্মরত ছিলেন, তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীকে শনাক্ত ও বিচারের সম্মুখীন করে আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা খুবই জরুরি।

৫. সাবিনার নেতৃত্ব গুণ, কৃষ্ণার ড্রিবলিংয়ের রহস্য, সানজিদার দক্ষতা, রূপনার গোল আটকানোর টেকনিকে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। পেয়েছি চূড়ান্ত বিজয় ও ট্রফি। কিন্তু ট্রফি হাতে ফিরে আসার পর তাদেরকে আর সামনে দেখি না। দেখি, পেছনে সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। বাফুফে সভাপতি, প্রতিমন্ত্রী, আমলা, কেরানি, নেতা-হাতারাই সামনের সারি দখল করলেন। বিমানবন্দরে তাদেরকে একদল লোক যেন বরণের নামে পিষে ফেলেছে। সংবাদ সম্মেলনের একই বিশৃঙ্খলা আর নিজেকে জাহির করার প্রতিযোগিতা।  অধিনায়ক ও কোচ বসার জায়গা না পেয়ে উঁকি দিচ্ছিলেন পেছন থেকে। পদাধিকারগণ যদি সামনের সারিতে বসে চেহারা দেখাবেন ও নিজেরা সম্মানিত বোধ করে পুলকিত হবেন, তাহলে সাফজয়ী মহিলা ফুটবল দলকে সম্মান জানানোর নামে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখার হেতু কি?

৬. সাফজয়ী মহিলা ফুটবল দলের সঙ্গে যা যা করা হলো, তাতে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সর্বস্তরে। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট ও প্রকাশিত ছবি নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে। মূলধারার মিডিয়াতেই এসব ন্যক্কারজনক তৎপরতার এন্তার সমালোচনা হয়েছে। লজ্জা দেওয়া হচ্ছে গদীনশীন ও পদাধিকারী সাহেবদের। অবশ্য লজ্জা নামের বিষয়টি আমাদের জাতীয় জীবন থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ফলে, যাদের লজ্জা পাওয়া উচিত, তারা আদপে লজ্জিত হলো কিনা, সেটাই গবেষণার বিষয়। তদুপরি, হালআমলে একজনের কৃতিত্ব আরেকজন কব্জা করবে, এটাই চলমান রেওয়াজ। অতএব, সংবর্ধনা নয়, বরং ক্ষমতা, পদ, নদী, বন, ভূমি দখলের মতো 'সম্মান' দখল করার দস্তুরমতো একটি প্রদর্শনী হলো সাফজয়ী দলকে সামনে রেখে।

৭. প্রকৃত প্রস্তাবে, ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে যে, যারা দেশের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে এলো শত প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে, সেই মেয়েদের অবস্থা আগে যেমন ছিল, এখনও যেন তেমনই আছে। আনন্দ-উল্লাসের জৌলুস তাদের পশ্চাৎপদ অবস্থাকে আড়াল করতে পারে নি। আজ যারা চ্যাম্পিয়ন, সেই নারী খেলোয়াড়দের সাথে বৈষম্য অতি পুরনো বিষয়। ৫/৭ বছর আগে মারিয়া মান্দা, সানজিদা আক্তাররা তখন কিশোর বয়স পেরোচ্ছে। বড় বড় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দানা বাধঁছে চোখে। ২০১৫ সাল থেকে সাউথ এশিয়া ও এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন পর্বে শুরু হয় তাদের বিজয়রথ। এই যুদ্ধে ময়মনসিংহের এক কলসিন্দুর গ্রামেরই ছিলেন অধিকাংশ। কিন্তু, এই মেয়েরা শিরোপা সম্মান আনতে থাকলেও আমাদের ফেডারেশনগুলোর আচরণ সবসময় ছিল বিমাতাসুলভ। বিশেষ করে আজকের চ্যাম্পিয়নরা একটা সময় লোকাল বাসে-ট্রেনে মানুষের টিটকারি শুনতে শুনতে রাস্তায় চলেছে। এখন পরিস্থিতি কি আদৌ বদলেছে?

৮. ফুটবলার সানজিদা আক্তার কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। কষ্টের সেই দিনের ছবি দেখতে পাওয়া যায় সামাজিক মাধ্যমে। কর্তারা তখন বলেছিলেন, সাংবাদিকরা নাকি তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। নারী ফুটবলারদের ডেকে, শাসিয়ে মিডিয়ায় কথা বলাও বন্ধ করে দেয়া হয়। আজ ওদের কারণে আমাদের গর্বের শেষ নেই। কিন্তু, তাদের প্রাপ্য  সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্যেরও সীমা নেই। তাদের ঘিরে বৈষম্যের কৃষ্ণপ্রহর আগেও ছিল, বর্তমানেও তার অবসান হয় নি। 

৯. অনেকে বলবেন, হয়তো নারী ফুটবলারদের জীবন মানের উন্নতি ঘটেছে। আসলে কি তাই? ফেডারেশন থেকে এখন তাদের বেতন ৮-১২ হাজার টাকা সর্বোচ্চ। ক্লাবে খেলে বছরে মাত্র ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় করেন তারা। অথচ পুরুষ খেলোয়াড়রা আয় করেন কোটির ঘরে। সামাজিক অবস্থানেও তারা পেছনে। দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়েও তারা অবজ্ঞা, অবহেলা, অমর্যাদার রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারেন নি।

১০. যদি যথার্থ অর্থে সংবর্ধিত করা হয় এবং সম্মান জানানো হয়, তাহলে কারোই কোনও প্রশ্ন থাকে না। যথাযোগ্য ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ সম্মান ও মর্যাদা পাবেন, এমনই হওয়া উচিত। কিন্তু সম্মান জানানোর নামে দাঁড় করিয়ে রাখা, টাকা-পয়সা, মালামাল চুরি হওয়া, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া এবং সাংস্কৃতিকভাবে কোণঠাসা করে রাখার ঘটনাগুলো মোটেও তাদের সম্মানিত ও মর্যাদাবান হওয়ার প্রমাণ দেয় না। এই রূঢ় বাস্তবতা সৎসাহসের সঙ্গে নতমস্তকে স্বীকার করা সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  অধ্যাপক ও বিশ্লেষক।

পাঠকের মতামত

আমি লেখকের মতামতের সাথে সম্পুর্ন একমত। ফুটবল ফেডারেশন এর মাননীয় সভাপতি জনাব কাজী সালা উদ্দিনের এই পদ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। ফুটবল এখন আমাদের দেশে মৃতপ্রায়। অনেক দিন ধরে তিনি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি থাকার সুবাদে তাঁর নিজের উন্নতি হয়েছে কিন্তু চরম অবনতি ঘটেছে আমাদের দেশের ফুটবলের। তাই ফুটবলের প্রতি সন্মান ও ভালবাসা দেখিয়ে জনাব কাজী সালা উদ্দিন তাঁর পদ ছেড়ে দিলে ফুটবল এবং জাতি উভয় উপকৃত হবে।

AKM GOLAM KABIR Bhui
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার, ৪:১০ পূর্বাহ্ন

স্যার,আপনি যাদেরকে খোঁচা দিলেন ; তারা গন্ডারের মত। বেড়ে পোকা গন্ডারের গায়ে কামড় দিলে তিনদিন পরে টের পায়, ওর পিঠে কিছু একটা পড়েছে! শৈশবে আমার এক শিক্ষকের কাছে শুনছিলাম, " খায় দায় চানমিয়া আর মোটা হয় জব্বার। " আজ সাফজয়ী মেয়েদের পিছনে দাড়িয়ে থাকা আর আমলাদের সামনে থেকে ফটোশুট করা ঐকথারই নামান্তর। প্রবাদে বলে," মোল্লার জন্য বিরিয়ানি খেলে! সেই মোল্লারে চিনলি না!!"

Mohiuddin molla
২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১০:৪৩ অপরাহ্ন

অনলাইন থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

অনলাইন থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রায়শই মিলত ধর্ষণের হুমকি/ ‘গেট খুলে দেখি মেয়ে অর্ধ-উলঙ্গ এবং গলা কাটা’

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status