রিসেট

স্থানান্তরিত ভোটার নিয়ে বিতর্ক

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি (সোমবার), ২০২৬ Archive 2022Source: মারুফ কিবরিয়া

সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংসদীয় আসনগুলোতে অসংখ্য ভোটার নিজেদের ঠিকানা বদলে স্থানান্তর করেছেন এক আসন থেকে অন্য আসনে। এ নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড। যত বিতর্ক। রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে নানা আলোচনা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ঢাকার ২০টি আসনেই ৪০ হাজারের মতো ভোটার ঠিকানা বদলেছেন। এরই মধ্যে বিএনপি অভিযোগ জানিয়েছে, একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের প্রার্থীদের জেতাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোটার স্থানান্তর করেছে। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ১৮ই  জানুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ অভিযোগ করেন। 

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ১০ই নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের জন্য আবেদন জমা পড়ে সাত লাখের বেশি। এর মধ্যে সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি ভোটারের আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। আর এই সময়ে ঢাকার ২০টি আসনেই মোট ভোটার স্থানান্তর ভোটার সংখ্যা ৪০ হাজারের মধ্যে। 

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটার এলাকা পরিবর্তন কোনো সহজ প্রক্রিয়া নয়। এর জন্য নতুন এলাকার নাগরিকত্ব সনদ, বিদ্যুৎ বিল বা বাসা ভাড়ার প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। পাশাপাশি স্থানান্তরিত এলাকার জনপ্রতিনিধির (কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যান) এনআইডি নম্বর, স্বাক্ষর ও সিল প্রয়োজন হয়।

স্থানান্তরিত ভোটার মিরপুর ও ভাটারা থানায় বেশি: 
নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ১০ই নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকার ৫৩টি থানার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার স্থানান্তর হয়েছে মিরপুর, ডেমরা ও পল্লবী থানায়। এই সময় মিরপুর থানায় ভোটার স্থানান্তর করেছেন ১,৬২৭ জন, ডেমরায় ১,৪৪৪ জন এবং পল্লবীতে ১,২৩৫ জন। এরপর কেরানীগঞ্জ থানায় ১,২০৭ জন, বাড্ডায় ৮৫১ জন, কাফরুলে ৮১১ জন, সাভারে ৭৭১ জন, খিলগাঁওয়ে ৭৪২ জন, যাত্রাবাড়ীতে ৭১৭ জন এবং পল্টন থানায় ৬৩৮ জন ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। এ ছাড়া ধামরাইয়ে ৬১৪ জন, কদমতলীতে ৬২১ জন, গুলশানে ৫৯১ জন, রমনায় ৫৪০ জন, ধানমণ্ডিতে ৪৩৬ জন, বনানীতে ৪১৮ জন, ভাটারায় ৩৯৭ জন, শাহজাহানপুরে ৩৭৫ জন, তুরাগে ৩৫৬ জন, নবাবগঞ্জে ৩৪৫ জন এবং মোহাম্মদপুরে ৩৩৬ জন ভোটার স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।

তুলনামূলকভাবে কম ভোটার স্থানান্তর হয়েছে আদাবরে ২৭৮ জন, শাহবাগে ২৮২ জন, উত্তরা পশ্চিমে ২৩৪ জন এবং উত্তরখানে ১৬৫ জন। সবচেয়ে কম স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে ভাষানটেকে ৯৬ জন, খিলখেতে ৮০ জন, কোতোয়ালিতে ৭৭ জন এবং কামরাঙ্গীরচরে ৭৩ জন। 
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ২০টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ছিল ৮১ লাখ ৭০ হাজার ৫১৯ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৫ জনে। অর্থাৎ, এই সময়ে ঢাকায় মোট ভোটার বেড়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৬৬ জন। আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা-১ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬০৯ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ১৪০ জন। এতে ভোটার বেড়েছে ৩১ হাজার ৫৩১ জন। ঢাকা-২ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫৮ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার ২১৫ জনে। ফলে এ আসনে ভোটার কমেছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৩ জন। ঢাকা-৩ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৪২ হাজার ৫৪২ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ১৫৯ জন। ভোটার বেড়েছে ১৯ হাজার ৬১৭ জন। ঢাকা-৪ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫৭৭ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটার দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০৬ জনে। ফলে ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৯ জন। ঢাকা-৫ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৪ লাখ ৯০ হাজার ৭৬৪ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৯৯৬ জনে। এতে ভোটার কমেছে ৭০ হাজার ৭৬৮ জন। ঢাকা-৬ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৩২ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ২৮৩ জন। ভোটার বেড়েছে ১০ হাজার ৮৫১ জন। ঢাকা-৭ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮৯ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটার দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৭৬ জনে। ফলে ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৭ জন। ঢাকা-৮ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫০ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭১ জন। ভোটার বেড়েছে ৪ হাজার ৮২১ জন। ঢাকা-৯ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জনে। ভোটার বেড়েছে ১৯ হাজার ৪০৮ জন। ঢাকা-১০ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৩৩ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬০ জন। এতে ভোটার বেড়েছে ৬৩ হাজার ৭২৭ জন। ঢাকা-১১ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৩৭ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮ জনে। ভোটার বেড়েছে ১২ হাজার ৫৪১ জন। ঢাকা-১২ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১১১ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা সামান্য বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩২০ জন। ভোটার বেড়েছে ২০৯ জন। ঢাকা-১৩ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৪৩৬ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৯১ জনে। ভোটার বেড়েছে ১৩ হাজার ৩৫৫ জন। ঢাকা-১৪ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৪ লাখ ১৮ হাজার ২১২ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন। ভোটার বেড়েছে ৩৭ হাজার ৮৩২ জন। ঢাকা-১৫ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯৭ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জনে। ভোটার বেড়েছে ৭ হাজার ১২১ জন। ঢাকা-১৬ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ২৪১ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ৪৯৯ জন। ভোটার বেড়েছে ১২ হাজার ২৫৮ জন। ঢাকা-১৭ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৩২ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জনে। ভোটার বেড়েছে ৯ হাজার ৮৪৫ জন। ঢাকা-১৮ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩ জন। ভোটার বেড়েছে ২৫ হাজার ৩৩৪ জন। তবে ঢাকা-১৯ আসনে ভোটার সংখ্যা কমেছে। দ্বাদশ নির্বাচনে এখানে ভোটার ছিল ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪১৬ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জনে। ফলে ভোটার কমেছে ১৮ হাজার ৩৪৬ জন। অন্যদিকে ঢাকা-২০ আসনে দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮২ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৬৩৯ জনে। ভোটার বেড়েছে ২০ হাজার ৬৫৭ জন।

ভোটার হ্রাস ও বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ইসি’র কর্মকর্তারা জানান, আসন্ন নির্বাচনের জন্য জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানার পুনর্নির্ধারণের ঢাকার নির্বাচনী এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে ছয়টি আসনে। ঢাকার মধ্যে ঢাকা-২, ৪, ৫, ৭, ১০ ও ১৪ আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছে। এজন্য এসব আসনের ভোটার তালিকায় হ্রাস ও বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও ঢাকার আসনভেদে ভোটার সংখ্যায় এই তারতম্য দেখা গেছে।