সেনাবাহিনীর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে নিজের গুম হওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক। তিনি বলেছেন, ২০১৮ সালের ৮ই আগস্ট আমার বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আব্দুল্লাহ আমার বাসায় আসেন। সে আমাকে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়। ২ ঘণ্টা ঘোরার পর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় মেজর মহসিনের বাসায় যাই। আমরা রাত ১০টার পর বের হলে রাস্তায় ৮-১০ জন লোককে দেখি, আমার পেছনে ছিল যায়িদ। এত রাতে এই এলাকায় ৮/১০ জনের উপস্থিতি অস্বাভাবিক ছিল। তারা আমার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। পেছনে তাকাতে দেখি আমার বন্ধু যায়িদ আব্দুল্লাহ নেই। তখন সামনে আমার শ্যালিকার বাসার কেয়ারটেকার সেকান্দারকে ডাকি। এরপর আমার লাইসেন্স করা অস্ত্র দেখিয়ে তাদের হাত উঁচু করতে বলি, তাদের একসঙ্গে জড়ো হতো করি। এরপর সামনে থাকা একটি মাইক্রোবাসের দিকে নেয়ার চেষ্টা করি। এসময় আরও ৪টি মাইক্রোবাসে করে লোক এসে আমার শ্যালিকার বাসায় অপর কেয়ারটেকার মুক্তারকে ‘শক বাটন’ দিয়ে আঘাত করে মাইক্রোবাসে উঠানো হয়। পরে কয়েকজন ব্যক্তি এসে আমার কোমরে আঘাত করে ৫/৭ জন আমাকে জাপটে ধরে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। রোববার সকালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেআইসিতে জোরপূর্বক অপহরণ ও গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায় হাসিনুর রহমানের আংশিক সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জন সাবেক-বর্তমান সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে করা এই মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিচ্ছেন তিনি। সকালে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। দুপুরে বিরতির পরে তিনি বাকি সাক্ষী দিবেন।
হাসিনুর রহমান বলেন, আমাকে ২০১৮ সালের ৮ই আগস্ট গুম করে ২০২০ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেয়া হয়। আমাকে ১ বছর ৬ মাস ১৪ দিন গুম করে রাখা হয়।
তিনি বলেন, গুম করে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্ন করা হতো, কেন আমি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করি। কেন আমি ২০১৪ সালের নিবার্চন, আওয়ামী ও ভারতের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কথা বলি। এসময় আমাকে মেরে আমার লাশও গুম করে দেয়ার হুমকি দেয়া হতো বলে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান।
তিনি বলেন, আমাকে গুমের পিছনে আমার বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আব্দুল্লাহ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজহার এবং ডিজিএফআই ও র্যাবের কর্মকর্তারা জড়িত ছিলো।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, আমাকে যখন মাইক্রোবাসে উঠানো হয়, তখন আমাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ব্লাইন্ডফোল্ড করে, জমটুপি পড়িয়ে, তার ওপর ‘কালো কাপড় পেঁচিয়ে ফিতা দিয়ে বেঁধে দেয়া হয়। গাড়িটি ২০-২৫ মিনিট চলার পর থামে। এরপর গেট খোলার শব্দ শোনা যায়। তখন আমাকে ইচ্ছেমতো মারধর করে অন্য পক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। এতে আমি নিস্তেজ হয়ে যাই। তারা আমাকে ধরাধরি করে একটি রুমে নিয়ে যায়। এরপর হ্যান্ডকাফসহ চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। সেখানে চারপাশে মুখোশ পরা লোক দেখি। তারা আমাকে রুমে রেখে দরজা বাইর থেকে বন্ধ করে চলে যায়।
তিনি আরও বলেন, এই রুমের দেয়ালের মধ্যে রক্তাক্ত বা রক্ত দিয়ে মোবাইল নাম্বারসহ বিভিন্ন লেখা ছিলো। রুমটি ছিল ৮/১০ ফিট স্যাঁতসেঁতে। সেখানে হাই ভোল্টেজের লাইট জ্বলছিল। দেয়ালে রক্ত দিয়ে মোবাইল নাম্বার ও প্রচণ্ড গরমে আমি অস্থির হয়ে যাই। একটা চৌকিতে বিছানা ছিল। কিন্তু চাদরটি নোংরা ও রক্তাক্ত ছিল। আধা ঘণ্টা পর হ্যান্ডকাফ পরিয়ে চোখ দুটি আগের মতো বাঁধা হয়। এরপর চড় থাপ্পড় দিতে দিতে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। রুমটি ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। সেখানে একজন আমার সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন। সেখানে চেয়ারে বসিয়ে তার সঙ্গে আমাকে বেঁধে ফেলা হয়। উপস্থিত ব্যক্তির কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল তিনি সেনা কর্মকর্তা। প্রথমত তিনি আমার ফেসবুক আইডি জানতে চান। জবাবে আমার ফেসবুক আইডি মনে নেই বলি। আমি তাকে বাসায় নিয়ে আসতে বলি। এতে ক্ষেপে যান। একটু পরে তিনি রুম থেকে চলে যান, তখন আমাকে আবার মারধর করা হয়।
