রিসেট

দেশের বিদ্যমান কাঠামোয় গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা দুর্বল

প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি (বুধবার), ২০২৬ Archive 2022Source: স্টাফ রিপোর্টার

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রত্যেকটি দল তাদের ইশতেহার চূড়ান্ত করতে কাজ করছে। তবে দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব প্রস্তুতির মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিদ্যমান ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নাগরিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ- নাগরিক সমাজের আলোচনায় এমন মতামত দিয়েছেন বক্তারা। 

গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরম আয়োজিত ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন রাজনীতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন-বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, গণফোরামের সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় সদস্য ও বরিশাল জেলা সমন্বয়কারী ডা. মনীষা চক্রবর্তী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর রওনক জাহান প্রমুখ। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। 

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব কাঠামোয় রূপান্তর করা।

নাগরিক ইশতেহারের খসড়া উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের নৈতিক ভিত্তি গড়ে দেয়।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বৈষম্য, বঞ্চনা ও সুশাসনের ঘাটতির পুঞ্জীভূত বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত সামনে আনে জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান। এটি ছিল ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে কর্তৃত্ববাদী শাসন, ভয়-ভীতি ও জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য ও জোরালো প্রত্যাঘাত। এই আন্দোলনের মাধ্যমে একটি স্পষ্ট উপলব্ধি জন্ম নেয়- এটাই সময় অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার।

আন্দোলন-পরবর্তী বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন- এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনী ইশতেহারে কি নাগরিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে? রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো কি বাস্তবায়িত হবে? পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কারা অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কারা আবারো উপেক্ষিত থেকে যাবে?

নাগরিক ইশতেহারের দাবিগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, আঞ্চলিক পরামর্শ সভা, যুব কর্মশালা ও অনলাইন মতামত সংগ্রহের মাধ্যমে নাগরিকদের যে প্রত্যাশা উঠে এসেছে, তার মূল সুর একটাই- একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ, সুশাসিত ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এসব প্রত্যাশা পরস্পরের পরিপূরক। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও রাষ্ট্র সংস্কারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। একইসঙ্গে বৈষম্যকে কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের আহ্বান জানান।
নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রচিন্তা ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে স্থান পাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিভিল সোসাইটিকে কাজ করতে না দেয়া এক ধরনের স্বৈরতন্ত্র। সরকার এককভাবে কিছু করতে পারে না- সব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাই গণতন্ত্রের ভিত্তি। তিনি বলেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে সংসদকে কার্যকর করতে হবে, সংসদীয় কমিটিগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বক্তব্যে রাজনীতিবিদদের জবাবদিহির বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, রাজনীতিবিদ অনেক ভালো ভালো কথা বলবেন। কিন্তু জবাবদিহি থাকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে এতদিন সেটা অনুপস্থিত ছিল, কারণ অনির্বাচিত সরকার ছিল। সংসদের ভেতরে ও বাইরে কার্যকর জবাবদিহির মাধ্যমেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

এ সময় নাগরিক প্ল্যাটফরম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে জানতে চান, ‘সরকারগুলো তাদের হানিমুন পিরিয়ড শেষে যখন ফেল করতে থাকে, তখন তারা আর ক্রিটিসিজম নিতে পারে না। বিভিন্ন ধরনের নিবর্তনমূলক পদক্ষেপ নেয়। ভবিষ্যতে এই হানিমুন পিরিয়ড সিনড্রোম থাকবে না- এটার নিশ্চয়তা কীভাবে পাওয়া যাবে?’
জবাবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা ফেরাতে রাজনীতিবিদদেরই কাজ করতে হবে। তাছাড়া দেশের মানুষের মনোজগতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা যেসব রাজনৈতিক দল ধারণ করতে পারবে না, তাদের রাজনীতিতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা এখন বড় সংকট। নির্বাচনে নিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে শরীফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়েছে। সুষ্ঠু সুন্দর একটি নির্বাচন করতে হবে। রক্তের বিছানার উপর দাঁড়িয়ে আমরা এবারের নির্বাচন পেয়েছি।  

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, পুরনো বন্দোবস্তের মধ্যেই নতুন রাজনীতি করতে গিয়ে ছোট দলগুলো সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়। তরুণরা রাজনীতিতে আসতে চাইলেও নির্বাচনী বাস্তবতায় তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তিনি বলেন, দল যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রের বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার বারবার ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হচ্ছে।

আলোচনায় ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় দেশের গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে মানুষের আস্থা ফিরবে না। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা যদি দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তারা আর এমপি থাকেন না- এমন ব্যবস্থায় সংসদ কীভাবে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনবে? অথচ গণতন্ত্রে পার্লামেন্টের অন্যতম দায়িত্বই হলো এক্সিকিউটিভকে জবাবদিহি করানো।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, গণতন্ত্রে ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক সমতা নিশ্চিত না হলে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়ে। তিনি গণভোটের প্রস্তাবকে অপ্রয়োজনীয় আখ্যা দিয়ে বলেন, সংবিধানের মৌলিক নীতিগুলোর সুরক্ষা ছাড়া কোনো সংস্কার কার্যকর হবে না।