রিসেট

এলপিজি’র তীব্র সংকট, গ্রাহক ভোগান্তি

প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারি (রবিবার), ২০২৬ Archive 2022Source: অর্থনৈতিক রিপোর্টার

টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাজধানী ঢাকায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের তীব্র সংকট লক্ষ করা গেছে। গ্রাহক পর্যায়ে চাহিদা থাকলেও এলাকার খুচরা দোকানগুলোয় মিলছে না বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত গ্যাসের সিলিন্ডার। ফলে দোকানে দোকানে ঘুরছেন গ্রাহকেরা। আবার কোথাও পাওয়া গেলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বাধ্য হয়ে অনেকেই হোটেল থেকে খাবার কিনে খেয়েছেন। শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গ্রাহকদের এমন ভোগান্তি দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরেই সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যায় না। তবে এবার অতিরিক্ত দামের আগের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ১২ কেজির এ জ্বালানির সিলিন্ডার প্রতি খুচরা দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারিত হলেও ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনতে হচ্ছে।

এদিকে চলতি জানুয়ারি মাসে এলপিজি’র মূল্য বাড়ছে নাকি কমছে-তা জানা যাবে আজ রোববার। এদিন এক মাসের জন্য এলপিজি’র নতুন দাম ঘোষণা করবে সরকার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে ডিসেম্বর মাসে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার ২৫৩ টাকা।

সরজমিন দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডারের গ্যাস কিনতে পাওয়া যায় না। খুচরায় অন্তত দুইশ’ টাকা বেশি গুনতে হয় ক্রেতাদের। এখন যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে বাড়তে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নেয়া হচ্ছে। জ্বালানি খাতের মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা বিইআরসি ডিসেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১,২৫৩ টাকা। কিন্তু রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এ পরিমাণের গ্যাসের সিলিন্ডার ১,৮০০ থেকে ২,২০০ টাকা, কোথাও আরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।
অনেক জায়গায় আবার বাড়তি দাম দিয়েও সিলিন্ডার মিলছে না। এতে বাসাবাড়িতে খাবার রান্না করা নিয়ে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন এলপিজি ব্যবহারকারীরা। পাইপলাইনের গ্যাস নেই কিংবা চাপ না থাকায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেই অনেকে এলপিজি ব্যবহার করে থাকেন। হঠাৎ করে সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে খুচরা বিক্রেতারা ডিলারদের দোষ দিচ্ছেন।
এর বিপরীতে এলপিজি পরিবেশক ও অপারেটরগুলোর সংগঠনের তরফে দাবি করা হয়েছে, গত মাসে (ডিসেম্বরে) আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দিনে ঘুরে নির্ধারিত দামের আশপাশে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। কোথাও সরবরাহ নেই, এই যুক্তিতে খুচরা বিক্রেতারা এক লাফে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি চাইছেন বলে অভিযোগ। কোথায় কোথায় বাড়তি নেয়া হচ্ছে এক হাজার টাকাও।
বিভিন্ন এলাকার পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে এলপিজি’র দাম ক্রমে বাড়ছে। সর্বশেষ গত তিন দিন চার এলাকার পৃথক চার ভোক্তা ভিন্ন দামে সিলিন্ডার কেনার তথ্য জানিয়েছেন। বুধবার রাজধানীর রামপুরার বাসিন্দা শাখাওয়াত হোসেন স্থানীয় বিক্রেতার কাছ থেকে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। পরদিন বৃহস্পতিবার রাজধানীর মুগদার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান কেনেন ১ হাজার ৮০০ টাকায় ও টাঙ্গাইলের সাইফুজ্জামান কেনেন ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। শুক্রবার মোহাম্মদপুরে ২ হাজার ১০০ টাকায় ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনেছেন ফরিদউদ্দিন। সকল ক্রেতাই জানান, বেশি দামে এলপিজি কিনে বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রয় রসিদ চাইলেও পাননি তারা।

যাত্রাবাড়ীর কাজলার এক সিলিন্ডার ব্যবসায়ী পাভেল বলেন, “১০ দিন আগে যে গ্যাস ১২৫০ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন তা ২২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। গত ২৬-২৭শে ডিসেম্বর থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে আসে। আস্তে আস্তে দাম বাড়তে শুরু করেছে। এখন ২২০০ টাকায় এসে ঠেকেছে।” দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “সিলিন্ডার গ্যাস তো বাইরে থেকে আসে। এখন মাল নিয়ে জাহাজ আসতে পারছে না বলে জানিয়েছেন ডিস্ট্রিবিউটররা। এ কারণে সরবরাহ কম।”

আরেক বিক্রেতা মিজান বলেন, “গত দুই দিন ধরে আমাদের এলাকায় কোনো গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ নেই। ছোট-বড় কোনো সিলিন্ডারই ডিলাররা দিচ্ছে না। ফোন করলে তারা ধরছে না, আর ধরলেও অস্বাভাবিক দাম বলছে।” “ডিলাররা ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য আমাদের কাছ থেকেই ১,৮০০ টাকা চাইছে। তাও আবার দুই-চারটার বেশি দিতে চায় না। এই অবস্থায় আমরা সিলিন্ডার আনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছি।”
সরকার নির্ধারিত দামের বিষয়ে তিনি বলেন, “সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেটাতে আমরা নিজেরাই গ্যাস পাই না। গত মাসে ১,২৫৩ টাকা নির্ধারণ থাকলেও আমাদের ১,২৮০-১,৩০০ টাকায় কিনতে হয়েছে।” ডিলাররা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছে।”
দুইজন এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক জানান, এলপিজি অপারেটর কোম্পানিগুলো বেশির ভাগ এখন সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। ডিস্ট্রিবিউটররা ১ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে ৩০০-৪০০ সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। তাও সিলিন্ডার প্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা বাড়তি দাম নিচ্ছে অপারেটর কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলোতে ট্রাক গিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় খরচ বাড়ছে। আবার দামও বেশি পড়ছে। তাই ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটররাও নিজ নিজ পর্যায়ে ১৫০-২০০ টাকা করে বেশিতে বিক্রি করছে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। খুচরা বিক্রেতারাও তাদের কেনা বেশি হওয়ায় মুনাফার হার বাড়িয়ে দিয়ে বিক্রি করছে।

শীতের সময় বিশ্ববাজারে এলপিজি’র চাহিদা বেড়ে যায়। এতে দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজ সংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। ফলে আগের মাসের তুলনায় গত মাসে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। সব মিলিয়ে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে বা হবে এমন আশঙ্কায় দাম বাড়িয়েছে বিক্রেতারা। 
এমন পরিস্থিতিতে আজ এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম প্রতি মাসের মতো এ মাসেও পুনর্নির্ধারণ করতে যাচ্ছে বিইআরসি। বিইআরসি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সৌদি আরামকো ঘোষিত জানুয়ারি মাসের সৌদি সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) অনুযায়ী বেসরকারি এলপিজির এই দাম সমন্বয় করা হবে। রোববার বিকাল ৩টায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই নির্দেশনা জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা হবে।

এর আগে, ডিসেম্বর মাসে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার ২৫৩ টাকা। এ ছাড়া সাড়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার এক হাজার ৩০৫ টাকা, ১৫ কেজির এক হাজার ৫৬৬ টাকা, ১৬ কেজির এক হাজার ৬৭১ টাকা, ১৮ কেজির এক হাজার ৮৮০ টাকা, ২০ কেজির দুই হাজার ৮৮ টাকা, ২২ কেজির দুই হাজার ২৯৮ টাকা, ২৫ কেজির দুই হাজার ৬১০ টাকা, ৩০ কেজির ৩ হাজার ১৩৩ টাকা, ৩৩ কেজির ৩ হাজার ৪৪৬ টাকা, ৩৫ কেজির ৩ হাজার ৬৫৪ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪ হাজার ৬৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এলপিজির দাম এ যাবতকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। 

রাজধানীর উত্তরার গৃহিণী মেহেরুন্ননেছা বলেন, বাসায় তিতাসের গ্যাস লাইন থাকলেও রান্নার সময় প্রায়ই গ্যাস চলে যায়। বাধ্য হয়ে প্রতি মাসে ১২ কেজির এলপি গ্যাসের একটি সিলিন্ডার কিনতে হয়। কিন্তু বিইআরসির নির্ধারিত দামে তা কখনোই কেনা সম্ভব হয় না। আগে বাড়তি ২০০ টাকা বেশি দিলে পাওয়া যেতো। এখন তাও পাওয়া যায় না। গত শুক্রবার সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে বিক্রেতা ২ হাজার টাকা চাওয়ায় হতবাক হন তিনি। বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই বেশি দাম দিয়ে কিনেন তিনি। বিক্রেতারা কেউ সরকার নির্ধারিত দাম মানছেন না। নিজেদের তৈরি বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। এবার তো একেবারেই নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। যদি তদারকি না থাকে, তাহলে দাম নির্ধারণের কোনো মানে নেই। সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
ক্যাবের ৭ দফা দাবি: এলপি গ্যাস, চিনি ও ভোজ্য তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ও নৈরাজ্যকর বাণিজ্যের প্রতিবাদে এবং মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টানতে ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছে সংগঠনটি। শনিবার  গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত একটি বিবৃতি পাঠিয়েছে ক্যাব।

সংস্থাটির ভাষ্য, এলপিজি’র ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ২৫৪ টাকা হলেও ব্যবসায়ীরা ২ হাজার টাকার বেশি রাখছেন। এলপিজি, ভোজ্য তেল ও চিনির দামে ধারাবাহিক বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। 
?বিবৃতিতে ক্যাব বলছে, আমদানি ও মিল পর্যায়ে উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও একটি প্রভাবশালী চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। বিশেষ করে রমজান মাসকে সামনে রেখে সুকৌশলে চিনির দাম প্রতি কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের প্রতি বছরের চিরাচরিত কারসাজি।
আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দেখিয়ে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারে ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে ক্যাবের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, টিসিবির তথ্যমতে, গত এক বছরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম খুচরা পর্যায়ে ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে এলপিজির ক্ষেত্রে বিইআরসি দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠ পর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। আমদানিকারক ও পরিবেশকদের কারসাজিতে ভোক্তারা একতরফাভাবে উচ্চমূল্যের চাপ বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংগঠনটি মনে করছে, যদি এই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সরকারের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে।
সরকারের কাছে উত্থাপন করা ক্যাবের ৭ দফা দাবি-


১. মিল পর্যায়ে চিনির উৎপাদন ও মজুত যাচাই করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করা।
২. সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া।
৩. আন্তর্জাতিক বাজারদর ও আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে স্থানীয় মূল্যের যৌক্তিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা।
৪. পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান কমাতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জোরদার করা।
৫. নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিদপ্তরের সমন্বিত তদারকি।
৬. এলপিজি আমদানিকারক ও পরিবেশকদের মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানো।
৭. কোনো অজুহাতেই যেন বাজার তদারকি প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা।