রিসেট

জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি’র জোট রাজনৈতিক সংকট

প্রকাশিত: ৩০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার), ২০২৫ Archive 2022Source: মানবজমিন ডেস্ক

ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট করেছে তরুণনির্ভর দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এতে দলটির অন্তত ৩০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যে এই জোটের বিরোধিতা করেছেন। পাশাপাশি একাধিক নেতা প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত এনসিপি’র ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকেই আরও শক্তিশালী করবে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জনমত জরিপে ফলাফল বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি’র পরই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াত। আর এনসিপি’র অবস্থান তৃতীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এইচ এম নাজমুল আলম বলেন, এনসিপি নিজেদের তরুণ নেতৃত্বাধীন, প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছিল। জামায়াতের সঙ্গে জোট সেই পরিচয়কে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তরুণনির্ভর কোনো দল নির্বাচনে হারলেই ভেঙে পড়ে না, এর জন্য আদর্শিক অস্পষ্টতা ও অভ্যন্তরীণ ঐক্যও দায়ী।

বৃহত্তর ঐক্যের পক্ষে যুক্তি: ২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ছাত্র ও জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ নেতাদের হাত ধরে গড়ে ওঠে এনসিপি। রাজনীতিতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র আধিপত্য ভাঙার অঙ্গীকারের মাধ্যমে পথ চলা শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে জন্ম নেয়া জেন-জি তথা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন এই দল। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচন কার্যত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে যাচ্ছে। ২০১৩ সালে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আদালতের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয় এবং তারা এতদিন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে দলটির ওপর সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

রোববার রাতে সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেন, আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাচন বানচালের চেষ্টা হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই জোটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যে স্বৈরশাসন আমরা উৎখাত করেছি, তারা নির্বাচন নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে। তাই বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে জামায়াতের সঙ্গে আমরা নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছেছি। নাহিদ দাবি করেন, এটি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত, তবে ভিন্নমত পোষণকারীরা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত  নেয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন।
ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকায় স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন ৩২ বছর বয়সী শরীফ ওসমান হাদি। পুলিশ হত্যাকারীদের শনাক্ত করার দাবি করলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

ভাঙনের সুর: এনসিপি’র দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো, অর্থসংকট এবং নারী ও সংখ্যালঘু অধিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অস্পষ্ট অবস্থান আগেই দলটির জন্য চাপ  তৈরি করেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। পদত্যাগ করা জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে একজন যুক্তরাজ্যে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত পেশা ছেড়ে রাজনীতিতে আসা তাসনিম জারা। তিনি এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, আমি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। যেকোনো পরিস্থিতিতে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক আসিফ শামস বলেন, এনসিপি’র এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। জামায়াতের সঙ্গে গেলে লাভ হবে জামায়াতেরই। তারা একটি উদার মুখোশ পাবে, আর এনসিপি ধীরে ধীরে ডানপন্থি শক্তিতে পরিণত হবে। তাদের মধ্যপন্থি ভাবনা ও আদর্শ সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাবে। উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামী দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সক্রিয় এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে আদর্শিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সামপ্রতিক সময়ে দলটি নারী কর্মীদের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার অনুমতি দিয়েছে। দলের প্রধান ড. শফিকুর রহমান দাবি করেছেন, ক্ষমতায় এলে নারীদের কর্মক্ষেত্র ও পোশাকের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার বজায় থাকবে। তবে এনসিপি’র সঙ্গে এই জোট তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ করবে কিনা, নাকি দলটিকে আরও ভাঙনের দিকে ঠেলে দেবে- সেই প্রশ্নই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।