পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৮তম বর্ষপূর্তির দিন আজ। চুক্তির মৌলিক কাঠামোতে যে সাংবিধানিক বৈষম্য, পাহাড়ের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মতামতকে প্রাধান্য না দেয়া এবং জাতীয় স্বার্থের সংঘাত বিদ্যমান থাকায় এই চুক্তিটি বোদ্ধা মহলের কাছে ‘তথাকথিত শান্তিচুক্তি’ না হয়ে বরং একটি ‘বৈষম্য দলিল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। অভিযোগ আছে পার্বত্য চুক্তির বিভিন্ন ধারা উপধারা এবং চুক্তির মাধ্যমে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, ৩ পার্বত্য জেলার ৩ জেলা পরিষদ এবং শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সসহ অন্যান্য কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে অশ্রদ্ধা ও লঙ্ঘন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে সবমিলিয়ে যেখানে শান্তি স্থাপনের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই একটি শান্তি চুক্তির স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব ছিল, সেখানে এ চুক্তি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে একটি বৈষম্য দলিলে পরিণত হয়েছে। সাংবিধানিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত করেছে ওই অঞ্চলের অর্ধেকের বেশি বাঙালি জনগোষ্ঠীসহ প্রায় দুই তৃতীয়াংশ নাগরিককে। মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের মতো উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৩টি নৃগোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে প্রধানত ১টি বিশেষ জনগোষ্ঠী একচেটিয়া সুবিধার কেন্দ্রে রয়েছে। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আরও ২টি নৃগোষ্ঠী সুবিধার ছোয়া পেলেও বাকি ১০টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি এ কথিত বন্দোবস্ত।
একতরফা চুক্তি ও সাংবিধানিক সংঘাতের পটভূমি
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পটভূমি রচিত হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে। ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এবং ১৯৭৩ সালে তার সশস্ত্র গেরিলা শাখা তথাকথিত শান্তিবাহিনী গঠনের মধ্যদিয়ে এই অঞ্চলে খুন-অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সাম্প্রদায়িক হামলার এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনীতে থাকা চাকমা সদস্যরা সে সময়ের অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে শান্তিবাহিনীর যাত্রা শুরু করে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানের জন্য সরকার তরফে আশির দশক থেকেই একটি সমঝোতা চুক্তির চেষ্টা চলছিল। শহীদ রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমান সরকার থেকে শুরু করে জেনারেল এরশাদ সরকার ও বেগম খালেদা জিয়ার (১৯৯১-৯৬) বিএনপি সরকার পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনা ও আলোচনার মাধ্যমে একটি বহুপাক্ষিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় সেই দীর্ঘ আলোচনার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। অভিযোগ আছে যে, শেখ হাসিনার নতুন সরকার একতরফাভাবে পার্বত্য বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে এবং শুধুমাত্র উপজাতীয়দের সশস্ত্র অংশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে চুক্তিতে উপনীত হয়। এই দ্রুত চুক্তি সম্পাদন নিয়ে জনশ্রুতি রয়েছে, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভের প্রবল আগ্রহে যেনতেনভাবে এই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছিল। এই আকাঙ্ক্ষার তাড়াহুড়োয় চুক্তির মৌলিক কাঠামোতে যে সাংবিধানিক বৈষম্য ও জাতীয় স্বার্থের সংঘাত রয়ে যায়, তার ফলস্বরূপ এই চুক্তিটি বোদ্ধা মহলের কাছে ‘শান্তিচুক্তি’ না হয়ে বরং একটি ‘বৈষম্য দলিল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
বৈষম্যের মূলনীতি: সংবিধানের আলোকে পর্যালোচনা
চুক্তি-সৃষ্ট আইনগুলো বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে একটি ‘দ্বৈত কাঠামো’ তৈরি করেছে। এই আইনগুলো সরাসরি সংবিধানের তিনটি মৌলিক অনুচ্ছেদকে চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। যেমন-
১. অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা): এই আইনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে আইনি অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করে।
২. অনুচ্ছেদ ২৮ (ধর্ম, ইত্যাদি কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ): জাতিগোষ্ঠীর (উপজাতি) ভিত্তিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক পদে সংরক্ষণের মাধ্যমে অন্যদের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা হয়েছে।
৩. অনুচ্ছেদ ২৯ (সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা): চাকরিসহ স্থানীয় সরকারের শীর্ষ পদ ও অধিকাংশ সদস্যপদ একটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য সংরক্ষিত করে সকল নাগরিকের সুযোগের সমতা নষ্ট করা হয়েছে। এই আইনগুলোর ‘পদ সংরক্ষণ’ সংক্রান্ত ধারাগুলোই মূলত জনসংখ্যার (পার্বত্য বাঙালি) প্রায় অর্ধেক অংশ থাকা সত্ত্বেও তাদের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করেছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনের বিশ্লেষণ
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন-১৯৯৮, দেশের এককেন্দ্রিক শাসন কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশের ‘একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো’ তৈরি করেছে। উপজাতীয়দের হাতে একক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছে। এই আইনই প্রমাণ করে কীভাবে এটি একটি ‘বৈষম্য দলিল’।
চেয়ারম্যানের পদের সংরক্ষণ: ধারা ৫ (২) অনুযায়ী, পরিষদের ‘চেয়ারম্যান উপজাতীয়গণের মধ্য হইতে নির্বাচিত হইবেন’। এই ধারাটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮ ও ২৯ এর সরাসরি লঙ্ঘন ঘটিয়ে প্রায় ১০ লক্ষাধিক বাঙালি নাগরিকের এই সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নির্বাচন করার মৌলিক অধিকার তথা সাংবিধানিক অধিকার স্থায়ীভাবে হরণ করেছে।
সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ধারা ৫ (১) অনুযায়ী, মোট ২৫ সদস্যের (পদাধিকার বলে ৩ জনসহ) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মধ্যে উপজাতীয়দের জন্য ১৮টি পদ এবং অ-উপজাতীয় তথা বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ৭টি পদ সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। জনসংখ্যা প্রায় সমান হওয়া সত্ত্বেও, এই ধারাটি উপজাতীয়দের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণের মাধ্যমে রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রান্তিক করেছে।
জাতীয় আইনের ওপর প্রভাব: আঞ্চলিক পরিষদকে আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন এবং জেলা পরিষদগুলোর ওপর সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এই ক্ষমতাটি ডিসি বা এসপি-এর মতো কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের ক্ষমতাকে খর্ব করে এবং দেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।
একটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদও সংরক্ষিত!
শুনতে আশ্চর্যজনক মনে হলেও এই চুক্তির আলোকে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা পদটিও উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। যা সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন। এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেকের বেশি অধিবাসীকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
হাইকোর্ট কর্তৃক আঞ্চলিক পরিষদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা:
২০১০ সালে হাইকোর্ট একটি রায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৯৮-কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। এই রায়ের মূল বক্তব্য ছিল, আঞ্চলিক পরিষদের গঠন ও এর প্রদত্ত ক্ষমতা বাংলাদেশের সংবিধানের ‘একক রাষ্ট্র’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা:
পরিশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৮ বছর পূর্তিতে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এই তথাকথিত শান্তিচুক্তি শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বরং সাংবিধানিক বৈষম্য ও সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। চুক্তি-সৃষ্ট আইনগুলোর মাধ্যমে দেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয় ‘দ্বৈত শাসন’ ও ১০ লক্ষাধিক বাঙালি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সীমিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য জরুরি পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বিষয়ক টাস্কফোর্স এবং পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের সুনির্দিষ্ট ধারা-উপধারাগুলো সংশোধন।
বিশেষ করে, মন্ত্রী, আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং অধিকাংশ সদস্যপদ সংরক্ষণের বিধানগুলো অবিলম্বে বাতিল করা প্রয়োজন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮ ও ২৯-এর প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অধিবাসী-বাঙালি ও উপজাতি নির্বিশেষে- সমান রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এক সংবিধানের অধীনে সমান বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কেবল এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]
