জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রধান আকাঙ্ক্ষাগুলোর মধ্যে একটি ছিল যে, রাষ্ট্রের এমন একটি পুলিশ বাহিনী থাকবে যা আর কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে বা জনগণের বিরুদ্ধে কাজ করবে না, বরং তা হবে একটি স্বতন্ত্র, পেশাদার এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী। এই লক্ষ্যে আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি কমিটি পুলিশ কমিশন খসড়া তৈরি করেছিল, তাতে এই আকাক্সক্ষার “কিছুটা” প্রতিফলন ছিল। কিন্তু খসড়া প্রস্তাবটি পরিপূর্ণ ছিল না; অনেক সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতি ছিল। তবে আইজিপি নিয়োগ-সহ কয়েকটি মৌলিক বিষয়, যা পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পরই আমলাতন্ত্রের কবলে পড়ে। পুলিশ সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল-পুলিশকে জনমুখী, পেশাদার এবং স্বতন্ত্র করে তোলা। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে প্রক্রিয়ায় কাজ করেছে, তাতে স্পষ্টত বোঝা যায়, তাদের লক্ষ্য পুলিশকে ‘আজ্ঞাবহ করে রাখা’-পুরনো প্রবণতাকে টিকিয়ে রাখা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল কাঁচি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং কমিশনের খসড়ার অনেক মৌলিক পরিবর্তনের সুযোগ (যেমন, পুলিশের অভ্যন্তরে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ ও পদোন্নতি এবং একটি স্বাধীন পুলিশ অভিযোগ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা) প্রায় সম্পূর্ণরূপে ছেঁটে ফেলেছে। এটি স্পষ্টতই সংস্কারের আত্মাকে হত্যা করার নামান্তর।
জন-আকাঙ্ক্ষা বিরোধী অবস্থান নেয়া আমলাতন্ত্রের কোন্ অংশটি সক্রিয়, তা নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এই অংশটি সংস্কারকে সরকারের লক্ষ্য পূরণের বদলে তাদের ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীস্বার্থের ক্ষমতা হ্রাসের কারণ হিসেবে দেখে। তারা সরকারের নীতিকে নিজেদের স্বার্থে বিকৃত করার ক্ষমতা রাখে, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায় নির্ধারণ: সরকার যখন নিজেই পুলিশ সংস্কারকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংস্কার-বিরোধী প্রস্তাবনা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যাওয়া-গুরুতর প্রশ্ন তোলে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে এই সংস্কার-বিরোধী পদক্ষেপ অনুমোদন দিয়েছেন, অথবা এটিকে ঠেকানোর জন্য কোনো কার্যকর ভূমিকা নেননি। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং সরকারের মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করার দায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সরকারের ভেতরেই একটি শক্তিশালী, সুযোগসন্ধানী এবং জন-আকাক্সক্ষা বিরোধী চক্র সক্রিয়। তারা সরকারের ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পুলিশকে জনগণের সেবক না বানিয়ে বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে রাখতে চায়। সমগ্র পুলিশ বাহিনী যেখানে সংস্কার চায়, সকল রাজনৈতিক দল যেখানে সংস্কার চায়, জনগণ যেখানে সংস্কার চায়, সেখানে আমলাতন্ত্রের একটি অংশ তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমলাতন্ত্রের প্রচণ্ড বিরোধিতা মূলত গণ-আকাক্সক্ষার বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। কমিশনের খসড়াকে পরিবর্তন করে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে নিরঙ্কুশ রাখতে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ খণ্ডিত আকারে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় উত্থাপন করা হয়। তবে এই “ভাগ্যক্রমে অসম্পূর্ণ অধ্যাদেশটি অনুমোদন করা হয়নি।” আমাদের আমলাতন্ত্রের ঔপনিবেশিক ও কর্তৃত্বপরায়ণ মানসিকতা রাষ্ট্রকে নৈতিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক করার সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং ব্যাহত করছে।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই নাগরিকের হয়, তবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে অবশ্যই “গোষ্ঠীগত” রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে দাঁড়াতে হবে। কারণ, আইনের শাসন কেবল আইনের অস্তিত্বে নয়-তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ, স্বাধীনতার নিশ্চয়তা এবং মানবিক মর্যাদার সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বাস্তবতা বুঝেই জনগণের সামনে আসে একটি নতুন ধারণা-একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও গণমুখী পুলিশ কমিশন গঠনের অপরিহার্য পথ। সে লক্ষ্যে কমিশন কেবলমাত্র একটি প্রশাসনিক কাঠামোই হবে না, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা হবে জনগণের প্রতি একটি নৈতিক অঙ্গীকার। আইনের প্রয়োগ হবে নিরপেক্ষভাবে, রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার জন্য নয়-জনগণের ন্যায্য অধিকারের জন্য।
কিন্তু সাম্প্রতিক সংবাদ যেনো এক নির্মম বিদ্রুপের ঘোষণা-কমিশন থাকবে, কিন্তু ক্ষমতা থাকবে না। নখ থাকবে, দাঁত থাকবে, রূপ থাকবে-কিন্তু থাকবে না কার্যকারিতা। এর চেয়ে বড় ব্যঙ্গ আর কী হতে পারে! গণ-আন্দোলনের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করার সবচেয়ে কৌশলী উপায় হচ্ছে-একটি অকার্যকর কমিশনকে ‘গণমুখী’ বলে সাজিয়ে রাখা। এ যেনো জনগণের আকাক্সক্ষাকে পূরণ না করে তাকে নীরবে প্রহসনের মঞ্চে পাঠানো। এভাবে তথাকথিত কমিশনকে জীবন্ত রেখে তার কার্যকারিতা মৃত রাখা বাস্তবে গণ-আন্দোলনের রক্তঝরা স্বপ্নের ওপর নির্মম আঘাত হানা। এখন প্রশ্ন ওঠে-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? উত্তরটি ভয়ঙ্করভাবে স্পষ্ট-প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং জনচাহিদাকে ‘গণতান্ত্রিক মোড়কে’ নিষ্ক্রিয় করে ফেলা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর কমিশনের যে খসড়াটি বদলে দেয়া হয়েছে, তা সাধারণ কোনো সংশোধন ছিল না, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’-যাতে ক্ষমতা থাকবে আগের জায়গাতেই, ফ্যাসিবাদের মোড়কেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো সরিয়ে দেয়া হয়েছে, যেমন:-
১. আইজিপি নিয়োগে কমিশনের মতামত বাদ।
২. বদলি ও পদোন্নতির “বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা” বাতিল।
৩. মানবাধিকার বা নাগরিক প্রতিনিধিকে সরিয়ে দেয়া।
৪. কমিশনের স্বাধীনতা দুর্বল করা।
এসব শুধু সংশোধন নয়-প্রশাসনিক মারপ্যাঁচের ‘ক্ষমতা নীতি’। যাতে কমিশন থাকবে ঠিকই, কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর থাকবে চূড়ান্ত সিলমোহর মাত্র।
এভাবে কমিশন গঠনের প্রস্তাবটি এক ধরনের বাহ্যিক ‘গণতন্ত্রের প্রসাধন’-বাহ্যিক সৌন্দর্য বজায় থাকবে, কিন্তু ভেতরের হৃদস্পন্দন থাকবে “রাজনৈতিক গোষ্ঠীর” হাতে। গণমুখী করার ভাষা থাকবে, কিন্তু ক্ষমতার দাঁড়ি-কমা থাকবে সরকারের কলমে। এটাই প্রকৃত বিপদ। এটাই ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিকতা। ফলে এটি হবে ‘ক্ষমতার পুনঃব্র্যান্ডিং’-সংস্কার নয়। এটি কোনো প্রশাসনিক সমন্বয় নয়-গণ-আকাক্সক্ষার বিপরীতে একটি অপকৌশলী প্রতিরোধ।
এতে অতীতের নিষ্ঠুর পুলিশি সংস্কৃতি ফিরে আসার সম্ভাবনাই বেশি। নিয়ন্ত্রিত পুলিশ কমিশন কার্যকর হলে-পুলিশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে। পুরনো আমলাতান্ত্রিক ভাবনা ফিরে আসবে। গণ-আন্দোলন-পরবর্তী আস্থা ও নতুন প্রত্যাশা ভেঙে যাবে। জনগণ আবার ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় পড়বে। ফলে জুলুম, নির্যাতন, গুম, ভয় এবং দমননীতির যে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষ অকাতরে আত্মদান করেছে, তা আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হবে। রাষ্ট্রের অন্যতম মূল সমস্যা “বিদ্যমান আত্মঘাতী প্রশাসন”, যা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রকে অরক্ষিত করে। এটাই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরাধীনতা। ’৭১ সালে দেশ বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হলো, কিন্তু আজও ঔপনিবেশিক প্রশাসনের আওতায় পরাধীন রয়ে গেছে।
আমরা যদি সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তবে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই পরিবর্তিত হতে হবে। আমাদের পুলিশ-আইন এখনো বৃটিশ-ঔপনিবেশিক আমলের (Police Act 1861)-এর দর্শন ছিল-Police = Rulers tool of control (পুলিশ = শাসকের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার)
কিন্তু আজকের যুগে পুলিশ হতে হবে-
‘Guardian of Constitutional Rights’ (সাংবিধানিক অধিকারের রক্ষক)
তাই শুধুই কমিশন নয়, চাই:-
ক. পুলিশ প্রশিক্ষণে মানবিক মর্যাদা (Human Dignity)-কে প্রাধান্য দেয়া।
খ. পুলিশকে সংবিধানের সেবক (Servant of the Constitution) রূপে প্রতিষ্ঠা করা।
গ. আদেশ-নিয়ন্ত্রণ মানসিকতা থেকে সেবা-জবাবদিহিতার মানসিকতায় রূপান্তর।
ঘ. আমলাতন্ত্রের বদলে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।
অর্থাৎ, আইন বদলালেও মানসিকতা না বদলালে কিছুই বদলাবে না। এ কারণেই শুধু কমিশন নয়-চিন্তা-চেতনা, প্রশিক্ষণ, মনস্তত্ত্ব এবং কাঠামোগত সব প্রক্রিয়ার সংস্কার অপরিহার্য। প্রশাসনের কাছে রাষ্ট্র মানে “নিয়ন্ত্রণ”; কিন্তু আধুনিক গণতন্ত্রে রাষ্ট্র মানে “সেবা, সম্মান ও জবাবদিহিতা”।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে দু’টি পথ:-
১) রাজনৈতিক পুলিশ (দলীয় নির্দেশমাফিক কাজ করা দমনযন্ত্র)।
অথবা
২) গণমুখী সিভিল পুলিশ (সংবিধান, আইন, মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষক)।
প্রথম পথটি দ্বারা জনগণের রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা সহজ হবে আর দ্বিতীয় পথটি দ্বারা রাষ্ট্রকে জনগণের করা সহজ হবে। কোনো সুনাগরিকই রাষ্ট্রকে ধ্বংসের পক্ষে থাকতে পারেন না। অতএব পুলিশ যদি ন্যায়বিচারের “সূচনাস্তর” না হয়, তাহলে রাষ্ট্রই দুষ্টচক্রের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে। মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য-আর তাই কমিশনকে বাস্তব ক্ষমতা দিতে হবে। এ কারণেই কমিশনকে শুধু নামমাত্র রাখা নয়, বরং-
১. আইজিপি নিয়োগে কমিশনের মতামত বাধ্যতামূলক করতে হবে।
২. বদলি/পদোন্নতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধ করতে হবে।
৩. মানবাধিকার, নারী প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজ-সহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিকে যুক্ত করতে হবে।
৪. “ঔপনিবেশিক” আমলের আইনকে বিদায় জানাতে হবে।
৫. ‘Rule of Law নীতিকে সাংবিধানিকভাবে প্রাধান্য দিতে হবে।
রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে পুলিশের কাঠামো
পুনর্গঠন জরুরি। গণমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশ্নটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। প্রশ্নটি তাই আর আইনগত নয়-এটি ইতিহাসগত ও নৈতিক প্রশ্ন। আমরা কি গণ-আন্দোলনের চেতনাকে বাঁচাবো? নাকি আবারো দমননীতির পুরনো অন্ধকারে ফিরে যাবো? লোক দেখানো কমিশন গঠিত হলে পুলিশ সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটির অপমৃত্যু ঘটবে।
আমরা দাবি করছি না-কেবল একটি কমিশনের, দাবি করছি-রাষ্ট্রের নৈতিক পুনর্জাগরণের। যেখানে পুলিশ ভয় হবে না-হবে আস্থার প্রতীক। যেখানে ক্ষমতা নয়-মানবিকমর্যাদাই হবে পুলিশের কাজের মূলনীতি। যদি সত্যিই আমরা জনগণের নতুন বাংলাদেশ চাই, তাহলে পুলিশ কমিশনকে হতে হবে স্বাধীন, কার্যকর এবং গণমুখী। অন্যথায় রাষ্ট্র নিজেই ঝুঁকিতে পড়বে।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]
