ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, সোমবার, ১১ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৯ সফর ১৪৪৪ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

বেহুদা প্যাঁচাল

দেড় হাজার ডলারের ছবি কি বার্তা দিচ্ছে?

শামীমুল হক
২ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার

ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র দায়িত্বশীল নেতাদের মুখ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে খেলার ডাক এসেছে। শুরুটা অবশ্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এরপর খেলার ডাক গ্রহণ করে অনেকেই আওয়ামী লীগকেও খেলার ডাক দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ওবায়দুল কাদেরকে বলেছেন আসুন খেলি


ছিল বিএনপি’র কর্মসূচি। বাগেরহাটে গতকাল রামদা-হকিস্টিক নিয়ে যুবলীগের অ্যাকশন। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় বুধবার প্রকাশিত প্রধান ছবির ক্যাপশন এটি। ইতিমধ্যে এ ছবি নিয়ে নানা আলোচনা সর্বত্র। ছবিটি দৃষ্টি কেড়েছে সব মহলের। মূল বিষয় হলো- বিএনপি’র কর্মসূচি প্রতিহত করতে মাঠে নেমেছে স্থানীয় যুবলীগ নেতাকর্মীরা। রাজনীতিতে আরেক দলের কর্মসূচি প্রতিহত করা কতোটুকু যৌক্তিক? যদিও দেশে এটা নতুন কিছু নয়।

বিজ্ঞাপন
সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার মন-মানসিকতা। প্রশ্ন হলো-এ কালচার থেকে কী আমরা বেরুতে পারবো না। কিংবা ওই দল করেছে বলে আমরাও করবো- এ মন-মানসিকতা নিয়েই পথ চলবে দিনের পর দিন। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র দায়িত্বশীল নেতাদের মুখ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে খেলার ডাক এসেছে। শুরুটা অবশ্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এরপর খেলার ডাক গ্রহণ করে অনেকেই আওয়ামী লীগকেও খেলার ডাক দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ওবায়দুল কাদেরকে বলেছেন আসুন খেলি। আপনারা খেলেছেন প্রতিপক্ষ ছাড়া। আপনারা খেলেছেন রাতের আঁধারে। আপনারা খেলছেন পুলিশ প্রশাসন নিয়ে। কিন্তু আমরা একা খেলতে চাই না। পুলিশ প্রশাসন ছাড়া মাঠে আসুন, খেলি।

 এই খেলাখেলির পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে এমনিতেই রাজনীতি এখন উত্তপ্ত। আর দলের নেতারা যখন খেলার ডাক দিচ্ছেন তখন কর্মীরা তো আশকারা পাবেনই। সাহস পাবেন। আর এই সাহস থেকেই তারা অন্যের কর্মসূচি প্রতিহত করতে রামদা-হকিস্টিক নিয়ে নামেন। মূল কথা হলো রামদা-হকিস্টিক নিয়ে অন্যের কর্মসূচি প্রতিহত করতে কেউ মাঠে নামলে তখন আর রাজনীতি সুস্থ থাকে না। অসুস্থ হয়ে উঠে। বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত প্রতিহতের এ ছবি তাই বিদেশিদেরও নজর কেড়েছে। তাই তো সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক ও ফটোগ্রাফারের কাছ থেকে এ ছবি কিনে নিয়েছে একটি বিদেশি দূতাবাস। ওই প্রতিবেদক ও ফটোগ্রাফার বুধবার ফোন করে জানান, তার এ ছবি নাকি ওই দূতাবাস কিনে নিয়েছে পনের শ’ ডলারে। নিশ্চয় এ ছবি কোনো ভালো বার্তা দিচ্ছে না। এতে দেশের সুনামও বয়ে আনছে না। বরং দেশের ভাবমূর্তি অনেকটা মলিন করে দিচ্ছে। তাই, প্রতিহতের এমন দৃশ্য কতোটুকু যৌক্তিক রাজনীতিকরা নিশ্চয় ভেবে দেখবেন। তবে, দেশের মানুষ কিন্তু আতঙ্কিত। খেলা-পাল্টা খেলার বক্তব্যে তারা ভীত। এমনিতেই ভোলায় পুলিশের গুলিতে বিএনপির ২ নেতা নিহত হওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল নারায়ণগঞ্জে ঘটেছে একই ঘটনা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় পুলিশের গুলিতে এক যুবদল কর্মী নিহত হয়েছেন। 

এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা সব সময় দেখা যায়। কিন্তু গুলি? কেন? অবশ্য বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশ বরাবরই মেঘাচ্ছন্ন। কখনো ঝড়, ঘূর্ণিঝড় আবার কখনো টর্নেডোর পূর্বাভাস আসে নেতাদের বক্তব্যে। আর এতে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে ঘর থেকে বাইরে আসে মানুষ। কাজ শেষে আবার ঘরে ফিরে একই উৎকণ্ঠা নিয়ে। ঘুমুতে গেলেও শান্তি নেই। সকালে উঠে আবার কী শুনতে হয়। এরকম এক গুমোটবাঁধা আকাশে হঠাৎ রোদ দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। কিন্তু তাদের সে অপেক্ষার পালা কি শেষ হবে? স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যুগপৎ আন্দোলন করেছিল। তাদের সেই আন্দোলনও একাধিকবার রাজনৈতিক গ্যাঁরাকলে পড়ে। তারপরও ফের এক হয়ে রাজপথে লড়াই করে। একই সঙ্গে আন্দোলন করে। দুই নেত্রীই তখন নানা কৌশলে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে থাকেন। স্বৈরাচারের বুলেটও সে সময় নেতাকর্মীদের টলাতে পারেনি। এরশাদ এক সময় হার মানেন। ক্ষমতা ছেড়ে দেন। রূপরেখা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দেশবাসীকে অবাক করে দিয়ে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। সরকার গঠন করে তারা। এরপর থেকে দুই নেত্রীর দূরত্ব বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র দূরত্ব। বর্তমান সময়ে এসে তা গিয়ে ঠেকেছে দা-কুমড়া সম্পর্কে। আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলো এখন বিপরীত মেরুতে। বিরোধীরা চাইছে নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। আর সরকার চাইছে সংবিধান অনুযায়ী। এ নিয়েই বর্তমানে উত্তাপ। 

 

 

গত দুটি নির্বাচনের উদাহরণ টেনে এনে বিরোধীরা তাদের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরছে। অন্যদিকে সরকারও তাদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছে। এখানেই যদি থেমে থাকতো তাহলে দেশবাসীর উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। এটা যখন প্রতিহতের পর্যায়ে চলে যায় তখনই ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। বিএনপি ক’দিন ধরে জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। এই বিক্ষোভ সমাবেশ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলার মুখে পড়ছে দলটির নেতাকর্মীরা। কখনো পুলিশি বাধায় পণ্ড হচ্ছে সমাবেশ। কখনো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পণ্ড হচ্ছে। কোথাও কোথাও দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। আহত হচ্ছে নেতাকর্মীরা। প্রতিদিনই এমন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে দেশের মিডিয়াগুলোতে। প্রশ্ন হলো- কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে অন্য  কোনো রাজনৈতিক দলের বাধা দেয়া কতোটুকু যৌক্তিক। সেই রাজনৈতিক দল যদি কোনো অরাজকতা করে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে। তারা বিষয়টি দেখবেন। তা না করে সরাসরি রাজনৈতিক দলের অ্যাকশন কোনো প্রকারেই কাম্য নয়। এই কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে দলগুলোকে। একদলের প্রতি অন্যদলের সহমর্মিতা থাকাটা সবার আগে প্রয়োজন। যদিও বাংলাদেশে সহমর্মিতার প্রশ্ন এলেই একে অন্যের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা হয়। বলা হয়, তারা সরকারে থাকার সময় এটা করেছে। ওটা করেছে। এই দোষাদোষির রাজনীতি দেখতে চায় না মানুষ। 

মানুষ চায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশে রাজনীতির নামে যা চলছে পৃথিবীর কোনো দেশেই তা দেখা যায় না। পৃথিবীর দেশে দেশে দেখা যায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্প্রীতির বন্ধন। জাতীয় ইস্যুতে তারা এক টেবিলে বসে আলাপ করে। দেশের স্বার্থে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে ভারতের কথাই ধরা যাক। শুধুমাত্র বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি করতে পারছে না কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মত নেই এতে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছা করলেই তা করে ফেলতে পারে। কিন্তু রাজ্য সরকারকে রাজি করেই তারা এটা করতে চায়। শুধু তাই ভারতের কোনো জাতীয় ইস্যুতে সকল দল এক টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের কাছে দেশই বড়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। যেখানে সরকার সরকারের পথে চলে। বিরোধী দলগুলো বিরোধী দলের পথে। অন্য দলগুলোও জোটের পক্ষে সাফাই গায়। কিন্তু সরকারে যারাই থাকুক না কেন তারা কাউকে ডেকে জাতীয় কোনো ইস্যুতে পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজনটুকুও আছে বলে মনে করেন না। আর তাইতো এই দেশকে নিয়ে বিশ্ব খেলতে পারে সহজে। মাঝে মাঝে বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতার আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু নিমিষেই সেই আভাস মিলিয়ে যায় বাতাসে। যেন  মেঘের সঙ্গে কুলোতে না পেরে রোদ হার মানে। আড়ালে চলে যায়। আবার মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রাজনীতির আকাশ। মানুষ আতঙ্কে রাত কাটায়, দিন কাটায়। অনিশ্চিত এক যাত্রায় বাংলাদেশ। কোথায় গিয়ে ঠেকে এর  রেশ- কারও জানা নেই। তবে উন্নয়নে বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেক। গড় আয় বেড়েছে বহু গুণ। গ্রামে গ্রামে আজকাল আর কুঁড়েঘর দেখাই যায় না।

 সব জায়গায় স্থান করে নিয়েছে ইট, পাথরের দালান কিংবা টিন। শিক্ষার উন্নয়নে তো বিপ্লব ঘটেছে। কিন্তু সব উন্নয়নই মার খাচ্ছে রাজনীতিতে উন্নয়ন না হওয়ায়। সবার আগে তো প্রয়োজন রাজনীতিতে উন্নয়ন। রাজনীতিতে হানাহানি, খুনোখুনি সব উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছে। বিশ্বে বাংলাদেশ সংঘাতপূর্ণ জাতি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এবার এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার সময় এসেছে। দেশের মানুষ আশা নিয়ে বসে আছেন রাজনীতির নীতি পরিবর্তন হবে। রাজনীতিকরা একে অপরকে শ্রদ্ধা করবেন। জনসভায় দাঁড়িয়ে আর খেলার ডাক দেবেন না। আক্রমণাত্মক বক্তব্য রাখবেন না। তারা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাবেন। দেশের গুরুতর সমস্যায় এক টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেবেন। একসঙ্গে সমাধানের পথ খুঁজে নেবেন। কেউ আর কাউকে খেলার ডাক দেবেন না। সমঝোতার ডাক দেবেন। এক টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেয়ার ডাক দেবেন। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিহত করার এমন ছবি আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা চাই, এ ছবিটির উল্টোপিঠ দেখতে। যেখানে ছবি ছাপা হবে, সব দলের নেতারা হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে তাদের দেশ। প্রিয় বাংলাদেশ। যে দেশকে সবাই মিলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করছেন। দেশের মানুষ তা দেখে হাততালি দিচ্ছেন। এমন দিনের প্রত্যাশা কি পূরণ হবে?  

পাঠকের মতামত

এই বিষয়টা উপেক্ষা না করে বিরোধী দলগুলো একটা জরুরি আলোচনায় বসে ঠিক করতে পারে সম্মিলিত ভাবে কি ভাবে এর মোকাবিলা করা যায়।

Mortuza Huq
১ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ৩:২৩ অপরাহ্ন

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

নির্বাচিত কলাম থেকে সর্বাধিক পঠিত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট / আমরা এখানে কীভাবে এলাম?

বেহুদা প্যাঁচাল: মমতাজের ফেরি করে বিদ্যুৎ বিক্রি, রাব্বানীর দৃষ্টিতে সেরা কৌতুক / কি হয়েছে সিইসি কাজী হাবিবের?

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status