ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, বুধবার, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

ইংরেজ কবি পার্সি বিশি শেলির হৃৎপিণ্ড নিয়ে মিথ

গাজী মিজানুর রহমান

(৪ সপ্তাহ আগে) ৩০ আগস্ট ২০২২, মঙ্গলবার, ৩:১৪ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৫:৩৬ অপরাহ্ন

গাজী মিজানুর রহমান

‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নামের  উপন্যাস লিখে মেরি শেলি  বিখ্যাত হয়েছেন। তিনি প্রখ্যাত রোমান্টিক কবি পার্সি বিশি শেলির স্ত্রী ছিলেন  । মেরি শেলি  তার লেখা-পড়ার টেবিলে একটা স্মারক-বস্তু রাখতেন । তিনি বিশ্বাস করতেন  এটা তার প্রয়াত স্বামী কবি শেলির হৃৎপিণ্ড ।  টেবিলে রাখা ওই কথিত হার্ট কি সত্যিকারের হার্ট ছিল ? আগের দিনে এটা নিয়ে নানা জনের নানারূপ বিশ্বাস-অবিশ্বাস ছিল । এখন এটা একটা মিথ বলেই বিশ্বাস করা হয়। কারণ হার্ট কখনোই  চিতার জলন্ত আগুনের সামনে টিকে থাকতে পারে না। অন্য কোনো পদার্থকে ভুলবশতঃ অকুস্থল থেকে  কুড়িয়ে এনে শেলির হার্ট বলে চালানো  হয়েছিল  । বলা হয় যে, তার যক্ষা হয়েছিল  বলে হার্ট শক্ত হয়ে গিয়েছিল । আবার বলা হয়, সমুদ্রের লোনা পানিতে দশ দিন ডুবে থাকায় হার্ট-লিভার শক্ত হয়ে গিয়েছিল ।

বিজ্ঞাপন
এগুলি সম্ভবত কবি-প্রেমিকদের একটা বাড়াবাড়ি ছিল । 

পার্সি বিশি শেলি একজন  ক্ষ্যাপাটে  প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি ধর্মীয় কোনো আচার-অনুষ্ঠান মানতেন না । তার ছিল বৈপ্লবিক রাজনৈতিক চিন্তা । এছাড়া ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির মানুষ । প্রথম স্ত্রী  হ্যারিয়েটকে ফেলে তিনি লেখিকা মেরি শেলিকে নিয়ে পালিয়ে যান। মেরির পিতা তাদের এই কাজকে মেনে নেন নি । অন্যদিকে পরিত্যক্ত এবং অপমানিত হয়ে হ্যারিয়েট  আত্মহত্যা করেন । এরপর ধর্মমতে  শেলির সাথে মেরি শেলির বিয়ের পথ পরিষ্কার হলেও  ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠা পাওয়া কবির জন্য কঠিন হয়ে যায় ।  তার সামাজিক সুনাম এতই ক্ষুন্ন হয়েছিল যে , এটা বিবেচনা করে  আদালত তার প্রয়াত স্ত্রীর গর্ভজাত  সন্তানদেরকে তাদের পিতার  জিম্মায় দিতে অস্বীকৃতি জানান । শেলির ধনী পিতা একজন ব্যারন ছিলেন ।  পুত্রের অধঃপতন দেখে তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করলে ভীষণ আর্থিক অনটনে পড়েন  কবি শেলি । পরে অবশ্য তিনি তার দাদার কাছ থেকে কিছু  সম্পদের উত্তরাধিকারী হন এবং  দু’হাতে  টাকা উড়াতে থাকেন  । এমন একটা  বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে শেলি ইতালিতে স্বেচ্ছা-নির্বাসিত জীবন বেছে নেন।  

ইংরেজি সাহিত্যে ‘পরবর্তী  রোমান্টিকস’ নামে খ্যাত  শেলি-সহ  তিন বিখ্যাত ইংরেজ কবির অন্য দুই জন  হলেন জন কীটস এবং লর্ড বায়রন। এরা সবাই অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। প্রথমে কীটস ২৫ বছর বয়সে। তারপর শেলি  ৩০ বছর বয়সে। সর্বশেষে  বায়রন যখন ইহধাম ত্যাগ করেন তখন তার বয়স ছিল  ৩৬ বছর । মাত্র চার বছরের  ব্যবধানে এরা সবাই ইহধাম ত্যাগ করেন এবং তারা সকলেই পরস্পর বন্ধু ছিলেন এবং সবাই ইতালিতে দীর্ঘকাল বসবাস করেছেন ।  ইতালিতে গিয়ে শেলি  দুহাত ভরে লিখেছেন  আর  ভ্রমণ করে জীবন উপভোগ করেছেন  । এমন এক ভ্রমণের সময়ে ১৮২২ সালের ৮ জুলাই তারিখে  ইতালির সমুদ্র উপকূলে তার বোট ‘ ডন জুয়ান ‘ ঝড়ের কবলে পড়ে উল্টে যায় এবং  মৃত্যু হয় এই ‘স্বীকৃতিবিহীন বিশ্ব- আইনপ্রণেতার’ ( তার কথামতে ) । মৃত্যুর  দশদিন পর তার লাশ ভিয়ারেজিও  সৈকতে দাফন করা হয়। এরপর কবির বন্ধুরা  কবর থেকে লাশ তুলে তা পুড়িয়ে সৎকার করেন । খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটা শাখা এভাবে লাশ সৎকার করে থাকে । 

 ১৮২২ সালের ১৬ আগস্ট ইতালির সমুদ্র উপকূলে  শেলির দেহ কবর থেকে তুলে  তা  পুড়িয়ে ভস্ম করা হয় । উদ্দেশ্য ছিল ছাইগুলির কিছু অংশ ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে একটা মনুমেন্ট বানানো  । এই দলে ছিলেন কবি বায়রন, লেখক লেই হান্ট এবং বন্ধু এডওয়ার্ড জন ট্রেলনি । সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে গেলো ৷ কিন্তু ট্রেলনি লক্ষ্য করলেন যে , শেলির হার্টখানা পুড়লো না, আস্ত রয়ে গেলো। তিনি চট করে তা তুলে নিলেন এবং তুলতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেললেন। উল্লেখ্য যে , এডওয়ার্ড জন ট্রেলনি  এমন  ভূতুড়ে কাহিনী সৃষ্টি করে আনন্দ পেতেন ব’লে আগেও  প্রমাণ ছিল । যাহোক ,  কথিত হৃৎপিণ্ড পরে শেলির স্ত্রী মেরি শেলিকে দেয়া হয়। তিরিশ বছর পরে ( ১৮৫২) মেরি শেলির মৃত্যু হলে তাদের একমাত্র পুত্র ব্যারন পার্সি ফ্লোরেন্স শেলি কথিত হার্টের জিম্মাদার হন । ১৮৮৯ সালে তার মৃত্যু হলে তার দেহের সাথে সেই কথিত হার্ট দাফন করা হয়।

 এসব কল্পকথা মিথ্যা হলেও কবি শেলির কাব্যপ্রতিভাকে ওরা খাটো করতে পারে না ।  ব্যক্তি জীবনের দুর্বল দিক ছাপিয়ে তার কবিতা আজো বেঁচে আছে পাঠকের কাছে ।  ওজাইম্যান্ডিয়াস , ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড , টু আ স্কাইলার্ক , দ্য ক্লাউড , এডোনেইজ প্রভৃতি কবিতা তার সাহিত্য প্রতিভার  পরিচয়বাহী । এডোনেইজ কবিতাটি তিনি  কবি-বন্ধু কীটসের মৃত্যুর পর শোক-গাথা হিসেবে রচনা করেন । মৃত্যুর সময় তিনি তার নিজের যে বোট নিয়ে সমুদ্রে গিয়েছিলেন আমোদ-ভ্রমণে , তার নাম ছিল ‘ডন জুয়ান’ । নামটা তিনি কবি-বন্ধু বায়রনের কাব্যের নায়কের নাম থেকে গ্রহণ করেন ।  সেকালে এবং একালে কবি-লেখকদের বন্ধুত্বের যে-সব নজির আছে তার মধ্যে  কীটস,  বায়রন এবং  শেলির মধ্যে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব উজ্জ্বলতা ছড়ায় । এতে শেলির অবদান ছিল সবচেয়ে অকৃত্রিম । তিনি ছিলেন বন্ধু-অন্তপ্রাণ এক কবি । এসব কথা বিবেচনায় আনলে  তার স্মৃতির জন্য তার হৃৎপিণ্ডকে ঘিরে  জেনে-না-জেনে অন্য বন্ধুরা  যদি একটু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে , তা আমরা ক্ষমা করতেই পারি ।

 

গাজী মিজানুর রহমান  : লেখক এবং প্রবন্ধকার 

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status