আমাদের দেশে বিসিএস পরীক্ষা শুধু ক্যাডার সার্ভিসে প্রবেশের পরীক্ষা নয়, এটি সমাজে আজ মেধা যাচাইয়ের মানদণ্ড। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে এখন পর্যন্ত বিসিএস পরীক্ষাকেই বিবেচনা করা হয়। মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণ কার্যক্রম- প্রতিটি স্তরে শিক্ষিত ও যোগ্য কর্মকর্তা বাছাই করা হয় তুমুল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে। আর এই পরীক্ষার আয়োজন থেকে শুরু করে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রকাশসহ যোগ্য প্রার্থীদের চাকরির জন্য সুপারিশের গুরুদায়িত্ব বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ওপর ন্যস্ত। বিসিএস পরীক্ষার ধারাবাহিক পরিক্রমায় গত ১০ই অক্টোবর পাবলিক সার্ভিস কমিশন ৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার আয়োজন করে। এমসিকিউ (Multiple Choice Question) আকারে আয়োজিত এ লিখিত পরীক্ষায় ২০০ নম্বরের প্রশ্ন সন্নিবেশিত হয়। এর মধ্যে ১০০টি এমসিকিউ নিয়ে মোট ১০০ নম্বর ছিল আবশ্যিক।
বিপত্তি এখানে নয়, কারণ পিএসসি তার পূর্বনির্দেশিত নিয়ম অনুসরণ করেই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে। এই ১০০ নম্বরের এমসিকিউ আবশ্যিক প্রশ্নপত্রে অন্তত ৩৩টি শব্দে বানান ভুল বা ভাষাগত অপপ্রয়োগ দৃষ্টিগোচর হওয়ায় ঘটে বিপত্তি- যা রীতিমতো বিস্মিত করে সচেতন মহলকে। উদাহরণ হিসেবে গত ১০ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৪৯তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা-২০২৫ এর সেট ০১ (চামেলী) প্রশ্নপত্রে কিছু ভুল চিহ্নিত করতে চাই। উক্ত প্রশ্নপত্রের ২য় প্রশ্ন ছিল ‘এ কাজ করতে আমি বদ্ধপরিকর’- এখানে ‘পরিবার’ শব্দের অর্থ কী জানতে চাওয়া হয়। আজব বিষয় হলো-প্রশ্নে ‘পরিবার’ শব্দটিই অনুপস্থিত। ঠিক পরের ৩য় প্রশ্নে ‘অন্তর্ভুক্ত’ বানানটি ‘অন্তুরভুক্ত’ হিসেবে লেখা হয়েছে। ৫ম প্রশ্নে ‘কী বার’ এর পরিবর্তে ‘কি বার’ লেখা হয়েছে। ৯ম প্রশ্নে ‘ভূমিকা’ শব্দে দীর্ঘ উকার ( ূ) এর স্থলে হ্রস্ব উকার ( ু) দেয়া হয়েছে। একই প্রশ্নে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটি ভুলভাবে লেখা হয়েছে। ১২ নম্বর প্রশ্নে ‘স্বাক্ষরিত’ শব্দকে লেখা হয়েছে ‘সাক্ষরিত’। একই ভুল করা হয়েছে ২৪ নম্বর প্রশ্নে। অন্য এক প্রশ্নে চব্বিশের ‘গণ-অভ্যুত্থানকে’ লেখা হয়েছে ‘গনঅভুধানের’। একই প্রশ্নে ‘ঐকমত্যকে’ লেখা হয়েছে ‘ঐক্যমতের’। অন্যান্য প্রশ্নে ‘কারণ’কে লেখা হয়েছে ‘কারন’, ‘উচ্চারণ’কে লেখা হয়েছে ‘উচ্চারন’, ‘পরিমাণ’কে লেখা হয়েছে ‘পরিমানে’, ‘ভূমি’কে লেখা হয়েছে ‘ভুমি’, ‘গণমাধ্যম’কে লেখা হয়েছে ‘গনমাধ্যম’, শব্দের অপপ্রয়োগে ‘সংগঠন’- এর স্থলে লেখা হয়েছে ‘সংঘটন’, ‘পারমাণবিক’কে লেখা হয়েছে ‘পারমানবিক’, ‘ধারণা’কে লেখা হয়েছে ‘ধারনা’, ‘পারিভাষিক’কে লেখা হয়েছে ‘পরিভাষিক’ ইত্যাদি। দুই পৃষ্ঠার লেখায় ১০০টি প্রশ্নে অন্তত ৩৩টি ভুল বানান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শব্দের অপপ্রয়োগ লক্ষ্য করা গেছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বা লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে ২০ নম্বর প্রশ্নে। এখানে সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের ‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ নামক বইটিকে ‘কম দামে কেনা বেশি দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ নাম দেয়া হয়েছে। বইয়ের নাম ভুল লেখার কারণে নামটির অর্থ কী দাঁড়ায় দেখার কেউ ছিল না। একইভাবে ইংরেজি অংশে ‘Woman’-এর স্থলে ‘Women’, ‘Mary’ এর স্থলে ‘Marry’ এবং ‘Word’ এর স্থলে ‘Words’, ‘Masculine’ এর স্থলে ‘Masculin’ লিখে যথাক্রমে বইয়ের নাম, লেখকের নাম ও শব্দে ভুল প্রয়োগ হয়েছে। এমন প্রশ্ন রয়েছে যেখানে ১টি প্রশ্নের তিন জায়গায় বানান ও ভাষাগত ভুল প্রয়োগ হয়েছে। অন্য এক প্রশ্নে বইয়ের নাম ‘Rubiæat of Omar Khayyam’ এ ‘Omar’ বাদ পড়েছে। এই যে একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এত এত ভুল হলো- এই ভুলের বিষয়ে পিএসসিকে পরীক্ষা পরবর্তীতে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে শোনা যায়নি। পিএসসি কি ভেবেছে তাদের করা ভুল কারও নজরে আসেনি? নাকি এই ভুলের বিষয়গুলো এখন পর্যন্ত পিএসসি’র নজরে আসেনি? আমার এই নিবন্ধের মাধ্যমে যদি বিষয়টি তাদের নজরে আসে তাহলে তারা এ সম্পর্কে কী ব্যাখ্যা দিবেন? তারা কি ভুলের দায় এড়াতে পারবেন? বিসিএসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় তাদের অসচেতনতা বা খামখেয়ালিপনা বোধ করি আগে এতটা হয়নি। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই সেখানেও পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়নের একটি নিয়ম থাকে। পরীক্ষা কমিটি থাকে, থাকে প্রশ্ন মডারেশনের জন্য বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ। অনেক সময় অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সটার্নাল এক্সপার্ট থাকেন। ফলে প্রশ্নপত্র ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে একদম কম। পাবলিক সার্ভিস কমিশনেরও নিশ্চয়ই অনুরূপ পরীক্ষা কমিটি ছিল, মডারেশনের জন্য ছিল উপযুক্ত এক্সপার্ট (বিশেষজ্ঞ)। অন্যান্য পরীক্ষার ন্যায় ৪৯তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায়ও নিশ্চয় পরীক্ষা কমিটি ও প্রশ্নপত্র মডারেশন পর্বের জন্য কর্তাব্যক্তি ও শিক্ষকদের পেছনে পর্যাপ্ত সময় ও অর্থ বরাদ্দ ছিল।
তাহলে এত ভুল কীভাবে? প্রশ্ন প্রণয়নকারী, পরীক্ষা কমিটি বা প্রশ্ন মডারেশনে যারা ছিলেন বা আছেন (যেহেতু প্রক্রিয়াটি এখনো চলমান) তাদের যোগ্যতা বা দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রাখার ধৃষ্টতা আমার নেই। কারণ পিএসসি’র মতো একটি প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেরা শিক্ষকদের নির্বাচন করে বলেই আমার ধারণা। আর আমার ধারণা যদি ঠিক হয় তাহলে এই পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়নে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের যোগ্যতা বা দক্ষতার ঘাটতি না থাকলেও ঘাটতি ছিল একাগ্রতার। আর নিষ্ঠা, একাগ্রতা বা মনোযোগ না থাকলে যোগ্যতা বা দক্ষতা মূল্যহীন হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। প্রশ্ন প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অবচেতনতা ও অমনোযোগিতা ছিল। আর পিএসসি কর্তৃক আয়োজিত বিসিএস পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় প্রশ্ন প্রণয়নে দায়িত্ব নিয়ে যারা দায়িত্ব পালনের প্রথম ধাপে অবহেলার পরিচয় দিলেন, পুরো প্রক্রিয়ার জন্য তাদের ওপর কতোটুকু আস্থা রাখা যায়?
যেকোনো পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়নে ভাষা, বানান ও ব্যকরণের নিয়মে নিখুঁত ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ- একে অবহেলা করা মানে প্রশ্নের উদ্দেশ্য ও অর্থ বিকৃত করার ঝুঁকি নেয়া। ভাষার অপপ্রয়োগ ও ভুল বানান পরীক্ষার্থীদের মাঝে শুধু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে না- প্রশ্ন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দিকেও ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন প্রণয়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশ্নপত্রটি পরীক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত শিক্ষণ-উদ্দেশ্যনির্ভর মূল্যায়ন নিশ্চিত করছে কিনা। শুধু এই বিষয়গুলো যথেষ্ট নয়, আরও দু’টি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয়। এর একটি ‘টপ সিক্রেসি’ (সর্বোচ্চ গোপনীয়তা) ও অপরটি ‘টপ সিকিউরিটি’ (সর্বোচ্চ নিরাপত্তা)। পিএসসি এই বিষয়গুলো অতীতে মাথায় রাখার চেষ্টা করেছে বলেই এখনো সর্বমহলের কাছে এটি একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
প্রশ্নের মানের প্রতি শুরু থেকেই আস্থা থাকার কারণে স্বয়ং শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাকে পিএসসি’র অধীনে আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। দেশের অন্য সকল প্রতিষ্ঠান পিএসসি’র করা প্রশ্নকে একরকম আদর্শস্বরূপ হিসেবে মেনে নিতে চান। তাই পিএসসি ‘প্রিন্টিং মিসটেক’-এর দোহাই দিয়ে বা দোষ একে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে গা-বাঁচানোর চেষ্টার পথ নিশ্চয়ই বেছে নিবে না। এত এত ভুল কেন হলো এবং কার গাফিলতির কারণে হলো তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। বিসিএস একটি সংবেদনশীল পরীক্ষা। আর পিএসসি একটি সাংবিধানিক ও স্বাধীন সংস্থা। যে পিএসসি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সিলেবাসে ভাষার প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, বানান ও বাক্যশুদ্ধি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রেখেছে, সেই পিএসসিকে এগুলো ব্যবহারে যত্নবান হতে হবে। হেলাফেলা বা গাফিলতির কোনো অবকাশ এখানে নেই। তবে এবারের পরীক্ষায় ইতিবাচক দিক হলো বাজারের গাইড বই থেকে গতানুগতিক প্রশ্ন হুবহু তুলে ধরা হয়নি। মুখস্থনির্ভরতা কমাতে এটি সহায়ক ছিল। ভবিষ্যতে পিএসসি’র ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে ভুলের এই ঘটনাটিকে যেন বালিশচাপা দিয়ে গুরুত্বহীন বানানো না হয়। পরীক্ষার্থীসহ সকলের আস্থা ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
লেখক: ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও কলামিস্ট
