ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, সোমবার, ১১ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৯ সফর ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

ড. মাহফুজ পারভেজ

(৪ সপ্তাহ আগে) ২৯ আগস্ট ২০২২, সোমবার, ৮:১৯ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৩:৫৬ অপরাহ্ন

১. 'মানুষ রাজনৈতিক জীব', এই দার্শনিক উক্তি কয়েক হাজার বছর ধরে প্রাচীন গ্রিসদেশের নগর রাষ্ট্রের আমল থেকে প্রতিষ্ঠিত সত্য। সঙ্কটকালে কিংবা স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে মানুষ রাজনীতি বিযুক্ত থাকে না এবং নিজের উপযোগিতার নিরিখে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ব্যক্তি বা দল, উভয় ক্ষেত্রে এমন হতে দেখা যায়। তদুপরি, মানুষ ও সমাজ থাকলে সেখানে দল ও রাজনীতি থাকেই। মানুষও তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, কারো পক্ষে বা বিপক্ষে অংশ নেয়। কখনো সরাসরি অংশগ্রহণ না করলে বা করতে না পারলেও, নিদেনপক্ষে অবহিত থাকে এবং নিজস্ব বাস্তবতার স্বার্থগত অবস্থান খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও রাজনীতি আছে, দল আছে। তবে সবদেশের রাজনীতির ধরণ ও বৈশিষ্ট্য এক ও অভিন্ন নয়। কোথাও আছে প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্র। কোথাও কল্যাণমূলক রাজনীতি। কোথাও দলীয় স্বেচ্ছাচার কিংবা গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে একদলীয় তাণ্ডব।

বাংলাদেশেও তার নিজস্ব স্টাইলে রাজনীতি আছে।

বিজ্ঞাপন
নানা রূপ-চরিত্র্যেই তা বিদ্যমান আছে। আছে ক্ষমতার রাজনীতি, বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলনের রাজনীতি, নির্বাচনের রাজনীতি, ঐক্য কিংবা বিভেদ অথবা মেরুকরণের রাজনীতি, কোণঠাসার রাজনীতি এবং অস্তিত্বের রাজনীতি। এমনই রাজনীতির নামে বহু স্রোত আমাদের চারপাশে প্রবহমান। আমজনতা নানামুখী রাজনীতির হালফিল খবর কখনো আগে জানে, কখনো পরে জানে, কখনো পুরোটা জানে অথবা অংশভাগ জানে। এভাবেই মানুষের জীবনের সঙ্গে আপাদমস্তক মিশে আছে রাজনীতি। 
 

২. রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদি নানা বিষয়ের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। করোনার বৈশ্বিক মহামারি এবং রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশীয় রাজনীতির পাশাপাশি বিশ্বরাজনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজমান।  বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনায় সীমিত আয়ের মানুষের একদিকে যেমন আয় কমেছে, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে একটি বিশাল অংশের কর্মক্ষম মানুষ। এর ফলে চরম চাপ কঠিন উপসর্গ যুক্ত হয়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে।

দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের দু’মুঠো অন্ন জোগাড় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে নিত্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। অথচ করোনা চলাকালীন সময়েও এভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি। শুধু যে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে, তা নয়। বেড়েছে নিত্যব্যবহার্য সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম, পরিবহণ খরচ, সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়।

মানুষের জীবনে এইসব সমস্যা কমাতে যে রাজনৈতিক ঐক্য, সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা থাকা দরকার, তার দেখা নেই। বদলে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার খবর জানা যাচ্ছে। আর আছে রাজনীতির বিচিত্র পালাবদল ও মেরুকরণের আভাস। 

৩. এমনই পরিস্থিতিতে রাজনীতি চলছে নানা সমীকরণে। সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি তো আগে থেকেই আন্দোলনে আছে আর এখন মাঠে সরব  রাজনৈতিক জোট গণতন্ত্র মঞ্চ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি), গণ অধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্যের মতো ছোট ও মাঝারি দলগুলোও। এইসব দলের ভাষা ও বক্তব্যে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সঙ্কল্প জোরালো হচ্ছে। 

আন্দোলন অবশ্যই রাজনীতির অংশ এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি নিয়মতান্ত্রিক রূপ। ভিন্নমত ও দাবি থাকলে সেগুলো আন্দোলনের মাধ্যমে উত্থাপন করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বীকৃত পন্থা। সেসব নিয়ে মতভেদ দূরীকরণে এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানসূত্র খুঁজে পেতে কার্যকর আলাপ-আলোচনা-সংলাপ ইত্যাদিও গণতন্ত্রের বিধান। যে আলোচনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য শেষপর্যন্ত একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু এইসব জরুরি রাজনৈতিক ইস্যুতে অর্থবহ আলোচনা বা সংলাপের লক্ষণ রাজনীতিতে দৃশ্যমান নয়। রাজনীতি এখন আন্দোলন ও নির্বাচনের সন্ধিক্ষণে। 


৪. বাংলাদেশের এরূপ রাজনৈতিক গতিশীলতায় হঠাৎ সামনে চলে এসেছে জামায়াত-বিএনপি সম্পর্কের বিষয়টি। জামায়াত-বিএনপি সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরতে '২০ দলীয় জোট' কথাটা পারতপক্ষে উচ্চারণ করতো না আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা। বলতো, 'বিএনপি-জামায়াত জোট'। ২০ দলের বাদবাকি ১৮টি দলকে দৃশ্যত উপেক্ষা করে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে দাগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এখন বিএনপি ও জামায়াত নৈকট্যের পর্যায় পেরিয়ে আলাদা আলাদা পথে চললে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ সম্পন্ন হবে, তা বলাই বাহুল্য। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দীর্ঘদিন ধরে টানাপড়েন চলছিল ২০ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। বিএনপি নেতারা বিভিন্ন সময় জামায়াত ছাড়ার কথা বলছেন। বিএনপির ভেতরে জামায়াত নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। বিএনপির কেউ কেউ মনে করতেন, জামায়াত সঙ্গে থাকলে লাভ। কেউ কেউ মনে করতেন, জামায়াত বোঝা। জামায়াতকে সঙ্গে রাখলে লোকসান।


জামায়াত কিন্তু জোটের প্রধান দল বিএনপির মধ্যে তাদের সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে প্রকাশ্যে কখনো কোনো মন্তব্য করেনি। কিন্তু অতি সম্প্রতি এক সভায় ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান।  জামায়াত আমীরের দেয়া বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপটি মানবজমিনের হাতে আসে। যার ভিত্তিতে জামায়াত সূত্রে জানা যায়, দলের একটি ঘরোয়া ভার্চ্যুয়াল সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা এতোদিন একটা জোটের সঙ্গে ছিলাম। ছিলাম বলে আপনারা হয়তো ভাবছেন কিছু হয়ে গেছে নাকি? আমি বলি হয়ে গেছে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত এটি একটি জোট ছিলো। ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর জোট তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। সেদিন বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ছিলো। সেটা আর ফিরে আসেনি। তিনি বলেন, বছরের পর বছর পর এই ধরনের অকার্যকর জোট চলতে পারে না।

একদা যে জামায়াত নানা বিরূপতার মধ্যেও বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করেনি, ২০ দলীয় জোটের সদস্য হয়ে ছিল, তারা যদি সত্যি সত্যিই জোটত্যাগ করে, তাহলে কি হতে পারে? এই প্রশ্নে উত্তর এখনই না হলেও অচিরেই পাওয়া যাবে।


৫. এই লেখার শিরোনাম ধার করা হয়েছে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস থেকে। 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা' হলো লেখক শহীদুল জহির রচিত একটি উল্লেখযোগ্য বাংলা উপন্যাস। এটি ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত জহিরের অভিষেক উপন্যাস। বাংলাদেশের জন্মকালের পূর্বাপর রাজনৈতিক বিন্যাসের উন্মোচনকারী একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা'।

এই উপন্যাস ভিত্তিক একই শিরোনামে সৈয়দ জামিল আহমেদ একটি মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা দেন। ২০১৯ সালে জহিরের মৃত্যুবার্ষিকী ২৩ মার্চ নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হয়। এত বছর পর আমাদের জীবনে সত্যিই কিরূপ রাজনৈতিক বাস্তবতা এসে উপস্থিত হচ্ছে এবং রাজনীতির মঞ্চে ও নেপথ্যে কোন রাজনীতি মঞ্চস্থ হচ্ছে, তা দেখার বিষয় বৈকি!
 

ড. মাহফুজ পারভেজ, লেখক-বিশ্লেষক।

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status