ঢাকা, ৩ অক্টোবর ২০২৩, মঙ্গলবার, ১৮ আশ্বিন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৫ হিঃ

শরীর ও মন

শিশুর জন্মগত হৃদরোগ

অধ্যাপক (ডা.) মনজুর হোসেন
৩০ আগস্ট ২০২২, মঙ্গলবারmzamin

গর্ভাবস্থা থেকেই শিশুকে নিয়ে মা-বাবা বেশ চিন্তিত থাকেন। কিন্তু এই চিন্তা যখন বাস্তবে রূপ নেয় তখন মা-বাবার ঘুম হারাম হয়ে যায়। শিশুদের জন্মগত রোগের মধ্যে হৃদরোগ অন্যতম। যা শুরু মায়ের গর্ভ থেকেই। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০০ জন জীবিত শিশুর মধ্যে ৮ জন শিশু জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই ১০০০ জনের ৮ জনের মধ্যে আবার ২-৩ জনের রোগের লক্ষণ জন্মের প্রথম ৬ মাসের মধ্যেই নানাবিধ উপসর্গ সহ প্রকাশ পায়। বাকিদের পরবর্তীতে জীবনের যেকোনো সময় তা প্রকাশ পেতে পারে। আর আমাদের দেশে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। যাদের চিকিৎসা করতে হিমশিম খেতে হয়। আবার অনেক গরিব রোগীর পিতা-মাতা চিন্তায় প্রায় পাগলের মতো হয়ে যান।

বিজ্ঞাপন
কিন্তু এত চিন্তিত না হয়ে আমাদের দেশে সরকারি হাসপাতালে এর চিকিৎসার সুব্যবস্থা আছে।  

শিশুর জন্মগত হৃদরোগ কী:
মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় শিশুর হৃদযন্ত্র তৈরি ও বিকশিত হওয়ার প্রাক্কালেই যদি কোনো প্রকার ত্রুটি হয় এবং শিশু সেই হৃদযন্ত্র নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, তবে তাকে জন্মগত হৃদরোগ বলে। অনেক সময় একে  শিশুর হার্টে ফুটা বা ছিদ্র আছে এমন শব্দ  ব্যবহার করা হয়।
 

কারণ:

জন্মগত শিশু হৃদরোগের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায় নাই। তবে গর্ভাবস্থায় ও গর্ভ পরিকল্পনাকালীন সময়ে বিভিন্ন ওষুধ, রাসায়নিক দ্রব্য, রেডিয়েশান, মায়ের ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ, প্রভৃতি রোগ, গর্ভাবস্থায় মায়ের রুবেলা সংক্রমণ ইত্যাদির সঙ্গে শিশু হৃদরোগের যোগসূত্র পাওয়া যায়। এ ছাড়াও জেনেটিক কিছু রোগ যেমন ডাউন সিনড্রোম (উড়হি ঝুহফৎড়সব), টারনার সিনড্রোম (ঞঁৎহবৎ ঝুহফৎড়সব) নিয়ে জন্মানো শিশুরা হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারে।

হৃদরোগের যেসব লক্ষণ:
জন্মের পর থেকেই ঘন ঘন ঠাণ্ডাকাশি ও শ্বাসকষ্ট, মায়ের বুকের দুধ টেনে খেতে অসুবিধা ও অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া, হাত ও পায়ের আঙ্গুল ও ঠোঁটে নীলাভ ভাব, ওজন ও শারীরিক বৃদ্ধির অপ্রতুলতা ইত্যাদি।
জন্মের পরই মায়েদের যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত:
১. শিশুটির জন্মের পর পরই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কিনা।
২. ভীষণ রকমের কালচে বা নীলাভ ভাব তার ঠোঁটে বা চামড়ায় দেখা যাচ্ছে কিনা?
৩. শিশুটির হার্ট বিট যদি অস্বাভাবিক রকমের কম বা বেশি হয় অথবা ছন্দোবদ্ধ না হয়ে অস্বাভাবিক ভাবে চলে।
৪. বাচ্চাটি জন্মগ্রহণ করার পর মায়ের দুধ পান করার সময় হাঁপিয়ে যায় কিনা।
৫. অল্প অল্প দুধ পান করে ক্লান্ত হয়ে ছেড়ে দিয়ে আবার কিছু সময় পর দুধ পান করছে কিনা।
৬. দুধ পান করার সময় শিশুটি অস্বাভাবিক রকমের ঘামছে অথবা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
৭. শিশুটি অন্য সব বাচ্চাদের মতো ওজনে বাড়ছে না।
৮. জন্মের পর থেকেই শিশুর বার বার ঠাণ্ডা কাশি লেগেই আছে কিনা এবং সে কারণে বার বার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে বা ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে।
৯. শিশুটি কান্নার সময় অস্বাভাবিক রকমের কালো হয়ে যায় এবং একই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হয়। একটু বড় বাচ্চারা খেলার সময় একটু দৌড়াদৌড়ি করলেই কালো হয়ে যায়, শ্বাস কষ্ট হয় এবং উপুড় করে শুইয়ে দিলে বা বড় বাচ্চারা হাঁটু গেড়ে বসলে তাদের স্বস্তি আসে। বড় বাচ্চাদের কখনো কখনো বুকে ব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদিও হতে পারে।
উপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই শিশুকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।

রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষা সমূহ:
সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করতে পারলে বেশির ভাগ হৃদরোগ চিকিৎসায় ভালো হয়।
একটি মাত্র পরীক্ষা যদি করা হয় রোগ শনাক্তের জন্য তাহলে সেটা হলো কালার ডপলার ইকোকারডিওগ্রাফী Color Doppler Echocardiograpy। আমাদের দেশে প্রায় সব ভালো হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ইকোকারডিওগ্রাফি পরীক্ষা হয়। এ ছাড়াও চেস্ট এক্স-রে, ইসিজি, হলটার মনিটরিং, ক্যাথ স্টাডি, কার্ডিয়াক সিটি স্কান, এম আর আই ইত্যাদি চেকআপ করা হয়।
চিকিৎসা সাধারণত ওষুধের মাধ্যমে, ইন্টারভেনশান বা বিনা অপারেশনে রক্তনালীর মাধ্যমে ও সার্জারি বা অপারেশন  এই তিনটি পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুদের হার্টের চিকিৎসা করা হয়।

শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ প্রতিরোধে করণীয়:
* মহিলাদের রুবেলা টিকা দেয়া।
* গর্ভাবস্থায় যথাযথ পরিচর্যা এবং ফলিক এসিডের ঘাটতি পূরণ করা।
* গর্ভাবস্থায় রাসায়নিক পদার্থ ও তেজস্ক্রিয়তা থেকে সতর্ক থাকা।
* গর্ভধারণের পূর্বেই ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, খিঁচুনি জাতীয় রোগে আক্রান্ত মায়েদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।
শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষৎ। শিশুর সুন্দর, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন আমাদের সকলের কাম্য। তাই জন্মের শুরু থেকেই শিশুদের দিকে পিতা-মাতার বিশেষ যত্ন নেয়া অপরিহার্য।

লেখক: শিশুরোগ ও শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ।
সাবেক পরিচালক, শিশু হাসপাতাল।
চেম্বার: ডা. মনজুর’স চাইলড’স কেয়ার সেন্টার।
৮৪/১ (৩য় তলা), রোড  ৭/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৯।

 

শরীর ও মন থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status