শান্তিতে নোবেল পাওয়ার ইচ্ছার কথা গোপন করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার ভক্তরা বলছেন, তিনি ইতিমধ্যেই পুরস্কার পাবার যোগ্য। যদিও সমালোচকরা বিষয়টিকে উপহাস করে ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতিগুলোকে অযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্প উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন এই নতুন শতাব্দীর সবচেয়ে খারাপ দুটি সংঘাত, গাজা ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। উভয় ফ্রন্টে একটি সমঝোতার রূপরেখার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প এবং তার দল শান্তি এনে দিতে পারবেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু যদি তারা তা করে, নোবেল কমিটি কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিতে পারে এবং ট্রাম্পকে তার লোভনীয় পদক প্রদান করতে পারে। নয় মাস ধরে একাধিক নীতি এবং পুতিন, জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন বৈঠকের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মীমাংসা এখনো হয়নি। ২০ হাজারের বেশি রাশিয়ান সেনা নিহত হয়েছেন। সমাধান সূত্রে পৌঁছাতে হলে ভবিষ্যত রুশ হামলার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সার্বভৌম ভূখণ্ড রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো মিত্রদের প্রতিশ্রুতিসহ একটি নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিতে হবে।
পাশাপাশি পূর্ব ইউক্রেনের বর্তমান যোগাযোগের লাইন বরাবর কিছু ভূমি অদলবদল করে নিরাপদ সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তির জন্য শর্ত স্থাপন করতে হবে। ইউক্রেনের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা গ্যারান্টি থেকে পৃথক ভূমি অদলবদলের কোনো চুক্তির অনুমতি দেয়ার সম্ভাবনা নেই এবং আঞ্চলিক মানচিত্রে কোনোরকম নিষ্পত্তি ছাড়া রাশিয়ার দিক থেকে বিপর্যয়কর যুদ্ধ বন্ধ করার সম্ভাবনা নেই।
সেখানে পৌঁছানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো থেকে ইউক্রেনের কাছে বিমান প্রতিরক্ষা এবং দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ সামরিক সরবরাহের একটি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। এর জন্য মস্কোর উপর ক্রমবর্ধমান নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক চাপ দারকার। নিউইয়র্কে সাম্প্রতিক জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের পর ট্রাম্প এই পদ্ধতিকে সমর্থন করেছেন বলে মনে হচ্ছে। প্রথমবারের মতো ইউরোপীয়রা চলমান যুদ্ধ মোকাবেলায় তার অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা ভিত্তিকে সহায়তা করার জন্য ইউক্রেনকে ঋণ হিসাবে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হিমায়িত রাশিয়ান সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করছে। যতক্ষণ হোয়াইট হাউস এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত পুতিনের সামনে একটি চুক্তি করা এবং মুখ বাঁচানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
রাশিয়া এখন পুতিনের পছন্দের যুদ্ধে ১ মিলিয়নেরও বেশি সেনা হারিয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমানভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে। সুদের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি। যদি ট্রাম্প যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চুক্তির রূপরেখা তৈরি করে মস্কোর উপর চাপ বজায় রাখতে পারেন, তাহলে নোবেল কমিটি এখন থেকে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারের জন্য তার নাম নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে পারে।
অন্যদিকে মার্চের শুরু দিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের পর গত ছয় মাসে এখনও পর্যন্ত ইসরাইলি সামরিক অভিযানের জেরে গাজার মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ইসরাইল গাজার সীমান্ত অবরোধ করে রাখার জেরে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। দুই সপ্তাহ আগে গাজার পরিস্থিতির কারণে নোবেল পুরস্কারের দাবি সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছিল। কারণ সব আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরিবর্তে ইসরাইল গাজা শহর এবং উপত্যকার উত্তর অংশ দখল করার জন্য একটি বিতর্কিত সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রবীণ ইসরাইলি কর্মকর্তারাও দাবি করেছেন যে গাজাবাসীকে জোর করে উৎখাত করে গাজা দখলের পরিকল্পনা করেছে ইসরাইল। এতে পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপের দিকেই যাচ্ছিল। তবে গত সপ্তাহে সেই চিত্র কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। কেননা যুদ্ধের অবসানের জন্য ২০ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন ট্রাম্প। যেখানে ইসরাইলের দখলদারি বন্ধ, গাজায় হামাসকে নিষ্ক্রিয় করা এবং জীবিত ও মৃত সকল জিম্মিকে ফেরত দেয়ার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনায় ইসরাইলের সায় আছে। পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, মিশর, জর্ডান, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং ইন্দোনেশিয়াসহ আরব ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর সমর্থনও আছে। যদিও মঙ্গলবার কাতার জানিয়েছে, মুসলিম লিডারদের সঙ্গে ট্রাম্পের যে প্রস্তাবগুলো নিয়ে কথা হয়েছে তা কাঁটছাট করেছে ইসরাইল। আর হামাসও নিজেদের নিষ্ক্রিয়তার বিপক্ষে মত দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন যুদ্ধ শেষ হলে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারবে না। গাজার নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার করতে ও প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসনকারী হামাসকে স্থানচ্যুত করার জন্য নতুন শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা সংগঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
হামাস গত সপ্তাহে পরিকল্পনাটির নিজস্ব শর্তে অনুমোদনের প্রস্তাব দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনি বন্দীদের বিনিময়ে জিম্মিদের মুক্তির আয়োজন করার জন্য এখন কায়রোতে আলোচনা চালাচ্ছে। ট্রাম্প হামাসের উপর চাপ বজায় রাখতে শনিবার লিখেছেনÑ আর বিলম্ব সহ্য করা হবে না। এটি যুদ্ধের সমাপ্তি ত্বরান্বিত করতে পারে এবং হামাস ছাড়া গাজায় দীর্ঘমেয়াদী শান্তির জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় শর্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে এখন গাজা যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সহাবস্থান এবং শান্তির পথের রূপরেখা তৈরী করতে হবে। হামাসকে অবশ্যই সকল জিম্মিকে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং অনেক ফিলিস্তিনি বন্দীর বিনিময়ে গাজার নিয়ন্ত্রণ ত্যাগ করতে হবে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর তারিখে প্রদান করা হয়। কমিটি তার প্রাপককে দুই মাস আগে অর্থাৎ ১০ অক্টোবর বেছে নেয়। ট্রাম্প আশা করছেন, তিনি এই সপ্তাহে পুরস্কারটি নিশ্চিত করতে পারেন। গাজা এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ দুটি টাচস্টোন যা সমাধান করা হলে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ জুড়ে আন্তঃসংযোগ বাড়াতে সাহায্য করবে। উভয় যুদ্ধের অবসানে পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার দল কৃতিত্বের যোগ্য। যদি তারা ফোকাস না হারান তাহলে ট্রাম্প ১২৫ তম নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন বলে অনেকের ধারণা। যুদ্ধ এবং শান্তির মতো দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন, আমাদের সকলের আশা করা উচিত যাতে শান্তি স্থাপনে তিনি সফল হন।
সূত্র : সিএনএন
