রিসেট

ইসিকে শক্ত ভূমিকা পালনের পরামর্শ নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশিত: ৮ অক্টোবর (বুধবার), ২০২৫ Archive 2022Source: স্টাফ রিপোর্টার

সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন (ইসি)কে আরও জোরদার ও শক্ত ভূমিকা পালন করার পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার নির্বাচনী সংলাপে অংশ নিয়ে তারা বলেন, কেবল আইন ও আইনের নির্দেশনা জারি করে ক্ষান্ত হলে চলবে না। স্বচ্ছতা দিয়ে ইসি’র কার্যক্রম চালাতে হবে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

নির্বাচনে আচরণভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই শক্ত অবস্থানে থাকার পরামর্শও দিয়েছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র পাহারা কমিটি গঠন, ইসি কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া, দলীয় সংশ্লিষ্টতা আছে এমন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব না দেয়া, নির্বাচনী এলাকায় একাধিক রিটার্নিং অফিসার রাখা, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে করা, বিগত তিন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারীদের এবার নির্বাচনী দায়িত্ব না দেয়া এবং কালো টাকা, অর্থ পাচারকারী ও ঋণ খেলাপিদের নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দেন তারা।  

এই সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, চার কমিশনার ও নয়জন সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং একজন পর্যবেক্ষক অংশ নেন।

গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে করার জন্য সিইসিকে পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক মুনিরা খানম। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের আলোচনা হচ্ছে। গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে করতে পারেন। আলাদা করলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। অনেকেই আলাদা চাইতে পারে। কিন্তু আপনারা চেষ্টা করেন একইসঙ্গে দুইটা নির্বাচন করতে। মুনিরা খানম বলেন, স্বাধীনতার পরে যেকোনো নির্বাচনেই পেশিশক্তির ক্ষমতা দেখা গিয়েছে। আমাদের নির্বাচনই প্রায়ই করতে দিতো না। মিছিল করতে গেলেই অপরপক্ষ থেকে এসে হামলা করতো। এটা এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। বাংলাদেশে ভোট কারচুপি হয়েছে, ব্যালট ছিনতাই হয়েছে, এমন কিছু নাই যে, সেটা হয়নি।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের নির্বাহী ক্ষমতা দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন মাহফুজা আক্তার। তিনি বলেন, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবার জন্য আমি কমিশনকে অনুরোধ করবো। যাতে আমরা মাঠে আচরণবিধিমালা সেভাবে পরিচালনা করতে পারি। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি অধ্যাদেশ জারি করে নির্বাচনী দায়িত্বগুলো প্রত্যেকের মধ্যে সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে দেয় এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়, তাহলে মনে হয় ভালো হয়। মাহফুজা আক্তার বলেন, নির্বাচন কমিশনেরও আরও জোরদার ও শক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু আইন করে দিয়ে আর আইনের নির্দেশনা জারি করে দিয়ে ক্ষান্ত হলে হবে না। আমাদের নিজস্ব কর্মকর্তাদেরকে সেটা পরিচালনা করার বিষয়ে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা খন্দকার মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের আরপিও তে আছে সহকারী রিটার্নিং অফিসার একের অধিক কনস্টিটিউন্সিতে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার একাধিক নির্বাচনী এলাকায় থাকতে পারবে। এক্ষেত্রে ছোট জেলায় খুব বেশি সমস্যা হয় না। কিন্তু বড় এলাকায় সমস্যা হয়। তাই আমার মনে হয় নির্বাচন কমিশনার যদি মনে করেন তাহলে যেখানে নির্বাচনী এলাকা বেশি তাহলে একটি জেলায় একাধিক রিটার্নিং অফিসার রাখতে পারেন। কারণ যেখানে নির্বাচনী এলাকা দুইটা তিনটার বেশি সেখানে একজন রিটার্নিং অফিসারের মনিটর করা কঠিন। তাই যদি রিটার্নিং অফিসার বেশি থাকে তাহলে আমার মনে হয় তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সহজ হবে।

জাতীয় নির্বাচন করতে প্রায় ১০ লাখ লোকবল দরকার উল্লেখ করে সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ জকরিয়া বলেন, নির্বাচন কমিশনের লোকবল আড়াই হাজার। ইসি’র বাইরে সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে লোকবল নিয়োগ করা হয়। এসব লোকবল নিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বেসরকারি পর্যায়ে এমন প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো দলীয় প্রতিষ্ঠান যেমন ইসলামী ব্যাংকসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি মাথায় রেখে লোকবল নিয়োগ করতে হবে। বিগত তিন নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের নিয়োগ এড়ানো যেতে পারে।  এ সময় ইসি’র নিজস্ব কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া, কম সংখ্যক ভোটার নিয়ে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের পরামর্শ দেন তিনি। 

ভোটকেন্দ্র পাহারা কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়ে ড. জকরিয়া বলেন, লোকাল নির্দলীয় বয়স্ক লোকদের নিয়ে এ ধরনের কমিটি করা গেলে প্রত্যেকে প্রত্যেককে চিনতে পারবে এবং জাল ভোট দেয়া, অন্যায় আচরণ করা, নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা অনেকটা কমে আসবে। 

এদিকে দিনের অপর ভাগে সংলাপে অংশ নেন নারী নেত্রীরা। সমাজের প্রতিষ্ঠিত অঙ্গসংগঠনের নারী নেত্রীদের কাছ থেকেও নির্বাচন নিয়ে পরামর্শ শোনে ইসি। 

এতে অংশ নিয়ে ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশি কবির বলেন, নির্বাচনে আমরা যেটাতে বেশি আগ্রহী সেটা নারী প্রতিনিধিত্ব অংশগ্রহণ। সেখানে রাজনৈতিক দল থেকে যে ধরনের উৎসাহ চাচ্ছিলাম সেটা পাচ্ছি না। এ কারণে আমরা মনে করি সংরক্ষিত আসন থাকা দরকার এবং এটা সরাসরি নির্বাচন। যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হোক সেখানে নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচন চাচ্ছি এবং সংরক্ষিত আসনও চাচ্ছি। ভোটের মাধ্যমে তারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া নারী ভোটারের নিরাপত্তাও আপনাদের নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফৌজিয়া মুসলিম বলেন, শুধুমাত্র সিইসি জেন্ডার ফ্রেন্ডলি নির্বাচন আশা প্রকাশ করলে তা হবে না। নির্বাচন জেন্ডার ফ্রেন্ডলি করতে হলে যে স্টেক হোল্ডার আছেন তাদের মানসিকতাকে জেন্ডার ফ্রেন্ডলি করতে হবে। আমরা পুরো করতে পারবো না হয়তো কিন্তু বেশি যারা নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত আছে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। জেন্ডার ফ্রেন্ডলি নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রথমে আমার যে কথা মনে আসে তাহলো- আমরা যখন ভোট দিতে যাই, তখন আমরা প্রার্থী দেখি। এ প্রার্থী বাছাইয়ের আপনাদের নজর রাখতে হবে। যারা নারীবিদ্বেষী, যারা সামপ্রদায়িক, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এ তিনটা পয়েন্ট নজর রাখতে হবে আপনাদের।

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরিন হক বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সংসদে আসন বৃদ্ধি হয়নি। সেখানে আমরা বলেছি ৩০০ আসনের পরিবর্তে ৬০০ আসন করতে হবে। একটি নির্বাচনের আসনে দু’টি আসন থাকবে। যেখানে একটিতে শুধু নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। আরেকটিতে নারী-পুরুষ যে কেউ করতে পারবে। পিআর পদ্ধতি সমর্থন করি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা মুক্ত নির্বাচন যাতে হয় সেটা আমরা চাই। নারী প্রার্থীরা নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হন। তাদের বিরুদ্ধে এমনভাবে প্রচার প্রচারণা করা হয়, নারীবিদ্বেষী প্রচার-প্রচারণা করা হয়। এবারো আমরা এমন শঙ্কা করছি এবং নারী যারা ভোটার তারা অনেক ধরনের হুমকির মুখে থাকেন। এ জায়গাগুলো কীভাবে বন্ধ করা যায় তা আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে বড় ধরনের প্রত্যাশা থাকবে।

সমাপনী বক্তব্যে গত তিন নির্বাচনের ভোটের দায়িত্বে থাকাদের সকলকে বাদ না দেয়ার যুক্তি তুলে ধরে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ১০ লাখ লোকের মধ্যে বাদ দিতে গেলে, কম্বলই উজাড় হবে। ‘লোম বাছতে গিয়ে কম্বল উজাড়’- আমার অবস্থা হয়েছে সে রকম।

সিইসি বলেন, গত তিনটা নির্বাচনে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের নিয়ে সবাই তো সন্দেহ পোষণ করে। তবে ভালো-খারাপ তো সবখানেই আছে।

 

 এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, সুতরাং তাদের কিছু নিতে হবে। তবে তাদের নজরদারির মধ্যে রাখা হবে। মানুষ তো মানুষই। বিবেক আছে তো।
সিইসি বলেন, আমরা ব্যাংক থেকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নেয়ার কথা বলছি। আমাদের কাছে নানা কারণে অভিযোগ আসছে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার বিষয়ে। আমরা বিষয়টি লক্ষ্য রাখবো। যা করার আমরা করবো মোটামুটি।

নির্বাচন করার দায়িত্ব তো কেবল ইসি’র না উল্লেখ করে সিইসি বলেন, এটা জাতীয় দায়িত্ব। ভোটের সময় ইসি’র ক্ষমতা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা পায়। আগে তো রাতে গিয়ে মোটিভেটেড করে কায়দা করে ভোটটা আদায় করে নেয়া হয়েছে। এখন যত রকমের কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব আমরা নেবো, যাতে দলীয় আচরণ না করতে পারে।