রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে বেপরোয়া এম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। তাদের কাছে জিম্মি রোগী ও স্বজনরা। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের খুশি করতে না পারলে কেউই হাসপাতাল থেকে এম্বুলেন্সে করে রোগী নিয়ে বের হতে পারে না। রোগীর অবস্থা যত খারাপ হয় রেট তত বাড়তে থাকে। জীবিত রোগী তো দূরের কথা এদের হাত থেকে লাশও ছাড় পায় না।
বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ও ছাড়পত্র পাওয়া রোগীদের সমীকরণ বলছে, সরকারি-বেসরকারি দিয়ে প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপতালে প্রায় লাখ খানেক লোক সেবা নিয়ে থাকেন। এদের মধ্যে ৮ থেকে ১০ হাজার রোগীরই এম্বুলেন্স সেবার প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে প্রতিটি এম্বুলেন্স থেকে গড়ে ৩ হাজার টাকা করে হলেও প্রতিদিন এসব এম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের পকেটে ঢুকছে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে ও পুলিশ ফাঁড়ির পাশে, হাসপাতালের সামনে সারি সারি এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। একের পর এক রোগী নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও হাসপাতালে আসছে এম্বুলেন্স। রোগী নামিয়ে দিয়েই তারা আবার বাইরে বের হয়ে যাচ্ছে। আর এসব এম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ করছেন বেশ কিছু মানুষ। তবে তারা কেউই হাসপাতালের লোক নয়। জরুরি বিভাগের পেছনে এম্বুলেন্সের সিরিয়াল দিতে হয়। রোগীরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। নাসরিন আক্তার নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ। বাড়ি যশোরের কেশবপুরে। ১০/১৫ দিন আগে খুলনা মেডিকেল থেকে এই হাসপাতালে আসি। আসার সময়ও খুমেক থেকে কোনো সরকারি এম্বুলেন্স পাইনি। অনেক এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু কেউ দশ হাজার টাকার নিচে আসলো না। সবারই ভাড়া এক। পুরো সিন্ডিকেট। এখানে এসেও দেখি একই অবস্থা। আমি সকাল থেকে এম্বুলেন্স খুঁজছি। এত এম্বুলেন্স কেউ যেতে চায় না। দুপুরে একটা যশোরের এম্বুলেন্স রোগী নিয়ে আসছিল। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলতে দিলো না কেউ। ওই এম্বুলেন্স চালকও কোনো কিছু না বলে দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে যায়। কয়েকজন এসে বললো- আপনি রোগী নিয়ে যেতে চাইলে সমিতির লোকের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের ম্যানেজ না করে কেউ যেতে পারবে না। কিন্তু তারা অনেক টাকা ভাড়া চায়। আমি অনেক আকুতি-মিনতি করে বললাম, আমার স্বামী তো অসুস্থ। আয়-ইনকাম নেই। এত টাকা কোথায় পাবো! কিন্তু তারা কোনো কথা শোনেনি। পরে ১২ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়। আমাকে বাধ্য হয়েই এই টাকা দিয়ে স্বামীকে নিয়ে যেতে হবে। রহমত নামে এক এম্বুলেন্স চালক বলেন, ঢাকা থেকে বরিশালের এম্বুলেন্স ভাড়া ১২ হাজার টাকা। কিন্তু মূল গাড়িচালক পায় ৫/৬ হাজার টাকা। বাকি টাকা সিন্ডিকেটে যায়।
সিন্ডিকেটের টাকা না দিয়ে কেউ ভেতর থেকে রোগী নিয়ে যেতে পারে না। আর যদি কোনো পরিচিত কোনো এলাকার এম্বুলেন্স থাকে তাদের সঙ্গে কথা বলে হাসপাতালের বাইরে থেকে অন্য কোথা থেকে রোগী পরিবহন করতে হয়। রোগী যত অসুস্থই হোক তাকে অন্য কোনো যানবাহনে করে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। কেউ কিছু বলতে পারে না এই সিন্ডিকেট সদস্যদের। ঢামেকের কর্মচারী, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় ও ক্ষমতার দাপটে আনসার, ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরাও অসহায়। ঢামেকের মধ্যে বাংলাদেশ এম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির অফিস দেখিয়ে তিনি বলেন, এই অফিস থেকেই সব নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে। ৫ই আগস্টের আগে এই অফিসের নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগের লোকের হাতে, আর এখন নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন দবির হোসেন ও বাদল। তাদের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন রয়েছে। তাদের লোকজনই এই ঢামেকের এম্বুলেন্স সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন।
ঢামেকের বার্ন ইউনিটে ভর্তি থাকা মো. সাইফুল ইসলাম নামে রোগীর এক স্বজন বলেন, সরকারি হাসপাতাল ছাড়া যেসব এম্বুলেন্স চলে, সেগুলোর অনুমতি দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেই বিআরটিএ’র হিসাবে দেশে ৬ হাজার ১৬১টি এম্বুলেন্স বেসরকারি মালিকানায় রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। তবে বাস্তবে মাইক্রোবাস হিসাবে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি এম্বুলেন্স চলছে। অনেকেই মাইক্রোবাসকে মোডিফাই করে এম্বুলেন্সে রূপ দিয়ে ব্যবসায় নামিয়েছেন। আর এই সবই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক রোগীর স্বজনকে দেখিয়ে বলেন, এই যে লোক শেরপুরের শ্রীবর্দী যাবেন। সকাল ১০টা থেকে এম্বুলেন্স খুঁজছেন। জরুরি বিভাগের সামনে এম্বুলেন্সের সারি কিন্তু কেউ যাবে না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই তাকে যেতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি হিসাবে রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৩৫ টাকা এবং এর বেশি দূরত্বের জন্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করা আছে। এসি হলে ৪০ টাকা হারে হবে। কিন্তু সেই তালিকা কেউই মানে না। এখন দুই হাজার টাকার ভাড়া ৮ হাজার টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে আমাদের। তবে জোবায়ের নামে এম্বুলেন্সের এক চালক বলেন, রোড খরচ, টোল, সিন্ডিকেট চার্জ সব দিয়ে কোনো গাড়িচালককেই সরকারি রেটে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়।
এদিকে রাজধানীর সরকারি হাসপাতাল সবচেয়ে বেশি শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁও এলাকায়। প্রতিদিন এসব হাসপাতাল থেকেও দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীরা সেবা নিয়ে থাকেন। সোহরাওয়ার্দীর মর্গ থেকেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাশ পরিবহন হয় এম্বুলেন্সযোগে। আর এখানকার হাসপাতালগুলোতেও রয়েছে এম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। রীতিমতো সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে অফিস খুলে খাতা মেনটেইন করে সিন্ডিকেট চালানো হচ্ছে। সাদা চোখে দেখে কেউ বুঝতে না পারলেও এলাকাটির সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, শিশু হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, কিডনি ইনস্টিটিউট, মানসিক হাসপাতাল, টিবি হাসপাতাল সব কয়েকটিতেই রয়েছে এম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের এক এম্বুলেন্স ব্যবসায়ী বলেন, এই শেরেবাংলা নগর ও আদাবর এলাকায় যে ক’টি সরকারি হাসপাতাল আছে সবগুলোই আগে নিয়ন্ত্রণ করতো আওয়ামী লীগের লোকজন। এখন করে দুটি গ্রুপ। এর মধ্যে একটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন মোহাম্মদপুরের এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী। তিনিই হাসান নামে একজনকে দিয়ে এই সবগুলো হাসপাতালের এম্বুলেন্স সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও টাকা ওঠানোর কাজ করে। আরেকটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ ওয়ার্ডের নেতাদের হাতে। এই এম্বুলেন্স সিন্ডিকেট নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। থানায় জিডিও হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে আমাদের মতো কোনো গাড়ির মালিককে এম্বুলেন্স ঢোকাতে হলে প্রথমেই সিন্ডিকেটকে ২ লাখ টাকা জমা দিতে হয়। এরপর ট্রিপপ্রতি আলাদা টাকা। এই টাকা না দিয়ে কেউ এম্বুলেন্স নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারে না। স্থানীয় এম্বুলেন্সের চেয়ে বাইরের এম্বুলেন্স থেকে বখরা বেশি পাওয়ায় তারা বাইরের এম্বুলেন্স আগে সিরিয়ালে রাখে। যেমন- একটি এম্বুলেন্স কিশোরগঞ্জ থেকে রোগী নিয়ে হৃদরোগে এলো। সে কিন্তু যাওয়ার সময় ফাঁকা যাবে। কারণ হাসপাতালের ভেতর থেকে সেই চালক কোনো রোগী তুলতে পারবে না। আর এদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের। হাসপাতালে ভর্তি থাকা কোনো রোগী যদি এম্বুলেন্স ভাড়া করতে চায় তখন সকল চালক ওই সিন্ডিকেটের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা তখন দেখা যাচ্ছে- কিশোরগঞ্জের জন্য ১০ হাজার টাকা এম্বুলেন্স ভাড়া ঠিক করে। নিজে ৫ হাজার রেখে এম্বুলেন্স চালককে ৫ হাজার টাকা দিয়ে দেয়। তারেক নামে আরেক এম্বুলেন্স ব্যবসায়ী বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে এম্বুলেন্সে করে রোগী নিয়ে হাসপাতালে ঢোকার পর যদি রোগী মারাও যায় তখন ওই এম্বুলেন্স ওই লাশ ফেরত নিয়ে যেতে পারে না। তাকে ওই লাশ হাসপাতালে নামিয়ে দিতে হবে। পরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আবারো এম্বুলেন্স ভাড়া করে তারপর লাশ নিয়ে দেশে যেতে হবে।
অভিযুক্ত সিন্ডিকেটের হোতা হাসান নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, আমি কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নই। আমার গাড়ি আছে তাই আমি মাঝে মধ্যে হাসপাতালে আসি। আমি কারোর কাছ থেকে কোনো টাকা নিইনি। আর কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেও আমার কোনো যোগাযোগ নেই।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ এম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. বাদল বলেন, সারা দেশে প্রায় ৯ হাজার প্লাস বেসরকারি এম্বুলেন্স আছে। আর সরকারি আছে দেড়-দুই হাজার। ঢাকা মেডিকেল এত বড় হাসপাতাল এখানেই সরকারি এম্বুলেন্স আছে ৫/৭টা। কিন্তু প্রতিদিন চাহিদা থাকে প্রায় ১০০/১৫০। যারা সরকারি এম্বুলেন্স পায় না তারা নিজেদের মতো বেসরকারি এম্বুলেন্স ভাড়া করে নিয়ে যায়। এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই।
