দেশ-বিদেশের জটিল রোগীদের চিকিৎসায় সুনাম অর্জনকারী নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. বাসুদেব কুমার সাহা সম্প্রতি এক বিরল ও ঝুঁকিপূর্ণ সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং ম্যালিয়াস ইএনটি স্পেশালাইজড হাসপাতালের চীফ কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনরত এই চিকিৎসক ৬৫ বছর বয়সী আবুল কাশেমের গলায় ৪৫ বছর ধরে থাকা বিশাল থাইরয়েড টিউমার সফলভাবে অপসারণ করে চিকিৎসা জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।
সাত সন্তানের জনক আবুল কাশেম দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গলায় টিউমার নিয়ে জীবনযাপন করছিলেন। দেশ-বিদেশে বহুবার চিকিৎসা নিয়েও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি। অপারেশনের সম্ভাব্য মৃত্যু ঝুঁকির কারণে চিকিৎসা থেকে বারবার পিছিয়ে এসেছেন। সময়ের সঙ্গে টিউমারটি ফুলে ফেঁপে এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে তার মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যায়, শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে তিনি স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ ও শ্বাস নিতে পারছিলেন না। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা এই রোগীকে নতুন আশার আলো দেখান ডা. বাসুদেব।
রোগীর শারীরিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন অপারেশনের। চলতি মাসের ১ তারিখে ১০ সদস্যের একটি দক্ষ চিকিৎসক দল নিয়ে টানা ১০ ঘণ্টা অপারেশন পরিচালনা করেন তিনি। সফলভাবে টিউমারটি অপসারণের পর রোগী জ্ঞান ফিরে পান। অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে ডা. বাসুদেব যখন বলেন, ‘অপারেশন সফল, আব্বাজান চোখ মেলে তাকিয়েছেন’-তখন রোগীর সন্তানরা আবেগে কেঁদে ফেলেন। মাত্র তিন মাস আগে নিজের বাবাকে হারানো ডা. বাসুদেবও রোগীর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আবেগে ভেসে যান। মুহূর্তেই অপারেশন থিয়েটারের বাইরে সৃষ্টি হয় এক মানবিক দৃশ্যপট।
বিশ্বজুড়ে এত বড় থাইরয়েড গ্লান্ডের সার্জারি অত্যন্ত বিরল। এই জটিল অপারেশনে এনেস্থিসিয়া পরিচালনা করেন ডা. এসএমএ আলীম। অপারেশনের বিষয়ে ডা. বাসুদেব বলেন, “টিউমারটি আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ নার্ভ, রক্তনালী, শ্বাসনালী, খাদ্যনালী ও মাংসপেশীকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে রেখেছিল। এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাকচার থেকে টিউমার আলাদা করা ছিল এক যুদ্ধের মতো। সামান্য ভুলেই রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারতো। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কৃপা, মানুষের দোয়া এবং আমার টিমের দক্ষতা ও পরিশ্রমে আমরা সফল হয়েছি।’
তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তার টিমের সদস্যদের প্রতি-ডা. আলীম, ডা. নোবেল, ডা. আশিক, ডা. মামুন, ডা. সাব্বির, ডা. সোহান, ডা. আরাফাতসহ সকলের প্রতি। অপারেশন শেষে আবুল কাশেমের মেয়ে সালমা বলেন, ‘জন্মের পর বাবাকে কখনো স্বাভাবিক চেহারায় দেখিনি। আজ সেই ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে।’
ডা. বাসুদেব শুধু আবুল কাশেম নয়, দেশ-বিদেশের বহু রোগীকে মরণব্যাধি থেকে মুক্তি দিয়েছেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপারেশন করেছেন বহুবার। পাশাপাশি গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ভিডিও দেখে অনেকেই সচেতন হচ্ছেন। তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তার স্বাস্থ্য টিপস আমাদের অনেক উপকারে আসে। তার প্রতি আমাদের অগাধ বিশ্বাস রয়েছে।’
আরেক রোগী কামরুল বলেন, ‘অনেক জায়গায় চিকিৎসা করেও ভালো হয়নি। শেষমেশ ডা. বাসুদেবের কাছে এসে সুস্থ হয়ে উঠেছি। তিনি আন্তরিকভাবে রোগীদের চিকিৎসা দেন।’
ফরিদপুর জেলার সালথা উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ডা. বাসুদেব। ১৯৯৩ সালে ফুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাইমারি বৃত্তি এবং ১৯৯৬ সালে ফুলবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে জুনিয়র বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে মাধ্যমিক এবং ২০০১ সালে নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় স্টার মার্কসসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ২০০৮ সালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। ২০১১ সালে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদান করেন। ২০১৩ সালে এমএস ভর্তি পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম স্থান অর্জন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ইএনটিতে এম.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। ভারত, নেপাল ও থাইল্যান্ড থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তার গবেষণা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটে সুনামের সঙ্গে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছেন।
চিকিৎসা পেশায় মানবিকতা, দক্ষতা ও সাহসিকতার অনন্য সংমিশ্রণ হয়ে উঠেছেন ডা. বাসুদেব কুমার সাহা। তার হাতে নতুন জীবন ফিরে পাওয়া রোগীরা যেমন কৃতজ্ঞ, তেমনি চিকিৎসা জগতে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনুকরণীয় আদর্শ।
