২০৪০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বড় বিনিয়োগ অপরিহার্য বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। আলোচ্য সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ৩৫.২ বিলিয়ন থেকে ৪২.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে নীতিমালার অসংগতি, জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধে পরিকল্পনার অভাব এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার কারণে এই লক্ষ্য অর্জন হুমকিতে পড়তে পারে।
গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ আয়োজিত ‘এনডিসি ৩.০: ভবিষ্যৎ টার্গেট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। সেশনটি পরিচালনা করেন সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দেশের সর্বাধিক কার্বন নিঃসরণকারী খাত। জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশকে আরও উচ্চাভিলাষী কার্বন হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তর এনডিসি ৩.০ খসড়া প্রণয়ন করছে। ইতিমধ্যে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে, যা ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিপিডি’র গবেষণায় বলা হয়, টেকসই বিদ্যুৎ খাত গড়ে তুলতে আগামী দুই দশকে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ১৬ হাজার ৬৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে লাগবে ১৮ বিলিয়ন ডলার, ২০৩৫ সালে ১২ হাজার ৮৩২ মেগাওয়াট উৎপাদনে লাগবে ১৩ বিলিয়ন ডলার, আর ২০৪১ সালে ১১ হাজার ১২৪ মেগাওয়াট উৎপাদনে লাগবে ১১ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে ৩২ বিলিয়ন ডলার বৈশ্বিক ৩০টি জলবায়ু তহবিল থেকে সংগ্রহ সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় নীতি পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য ভিন্ন ভিন্ন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব লক্ষ্যে বাস্তবতাকে পাশ কাটানো হয়েছে। মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যানে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫-এ ২০৪০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য ৩০%। আবার সমন্বিত বিদ্যুৎ জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় (আইইপিএমপি) ২০৪০ সালের মধ্যে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ।
সভায় দু’টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন সিপিডি’র গবেষণা সহকারী মেহেদী হাসান শামীন ও গবেষক হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি। গবেষণায় উঠে আসে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো না গেলে জলবায়ু অভিযোজন ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যাবে।
সিপিডি সতর্ক করে জানায়, ২০৩৫ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে দেশের বিদ্যুৎ খাত আরও বেশি কার্বননির্ভর হয়ে পড়বে, যা আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই আন্তর্জাতিক তহবিল, দেশীয় বিনিয়োগ ও কার্যকর নীতির সমন্বয় ছাড়া জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশ যদি নীতিগত অস্পষ্টতা ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বজায় রাখে, তবে আর্থিক সংকট ও জলবায়ু লক্ষ্যে ব্যর্থতার ঝুঁকি বাড়বে। অন্যদিকে, ঐক্যবদ্ধ কৌশল গ্রহণ করলে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সফল রূপান্তর করতে পারবে। এখনই সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেয়ার সময়।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সফলভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উত্তরণে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে সিপিডি। এসবের মধ্যে রয়েছে-সব জাতীয় নীতিতে সমন্বিতভাবে একটি ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে।
২০৩০ ও ২০৩৫-এর জন্য স্পষ্ট মাইলফলকসহ একটি জ্বালানি উৎস-ভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে জীবাশ্ম বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরের সময়সূচিও থাকে।
নেপাল, ভুটান ও ভারতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমৃদ্ধ প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে স্বল্পমেয়াদি সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ এবং আন্তঃসীমান্ত-বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে।
বহুজাতিক উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি, এআইআইবি, বিশ্বব্যাংক) এবং জলবায়ু তহবিলের সঙ্গে কৌশলগতভাবে সম্পৃক্ত হয়ে স্বল্প সুদে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে, প্রকল্প ঝুঁকি কমাতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগে বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণ করতে হবে।
গ্রিড অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তিতে জরুরি বিনিয়োগ করতে হবে এবং ছাদে সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার) ও মিনি-গ্রিডের মতো বিকেন্দ্রীকৃত জ্বালানি ব্যবস্থা প্রসার করতে হবে।
আলোচনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ সাফিউল্লাহ, পরিবেশ উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি’র চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এম রেজওয়ান খান এবং বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. এম আসাদুজ্জামান।
