রিসেট

বিএনপি’র ৩১ দফা নিয়ে প্রকৌশলীদের করণীয়

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই (বুধবার), ২০২৫ Archive 2022Source: প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান

বিএনপি’র প্রণীত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফায় মূলত সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদান রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। যেহেতু একটি দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, পরিবেশগত উন্নয়ন ইত্যাদি প্রকৌশল সংক্রান্ত- তাই দেখা যায়, মোটা দাগে ৫টি দফাই (দফা: ১৮, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১) প্রকৌশল সংক্রান্ত এবং এই দফাগুলো নিয়ে প্রকৌশলীরা ব্যাপকভাবে জ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে এবং ৩১ দফার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

দফা-১৮: বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির যথাযথ অনুসন্ধান করার সঙ্গে  সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও মিশ্র শক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে জ্বালানি খাতকে টেকসই করা যায়, কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমানো যায় এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রকৌশলীদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে উদ্যোগ নেয়ারও অবদান রাখার সুযোগ আছে। বর্তমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপর সব দেশ জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনে বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি- যেমন সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ,  বায়োগ্যাস, ভূ-তাপীয় শক্তি- এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের খনিজ সম্পদের ওপর চাপ কমাতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বায়ুবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ-এই  প্রযুক্তিগুলোকে কীভাবে আরও টেকসই এবং উৎপাদন সাশ্রয়ী করা যায়, তা নিয়ে প্রকৌশলীরা গবেষণা ও কার্যকরী কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে পারে এবং তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর ও কর্মশালার আয়োজন করতে পারে।

বাংলাদেশে যদিও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার চলমান রয়েছে কিন্তু তা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ঢাকা শহরে নতুন বাসা-বাড়িতে সৌর প্যানেল বসানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু প্রান্তিক অঞ্চলে এর বিস্তৃতি ঘটেনি মূলত সৌর প্যানেলের মূল্যের কারণে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি মানে যেই জ্বালানি কখনো ফুরিয়ে যায় না, পরিবেশের ওপর কোনো হুমকিস্বরূপ নয় তা নিয়ে প্রকৌশলীদের ব্যাপকভিত্তিক কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

দফা-২৮:  বাংলাদেশের পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় উন্নয়ন নামক শব্দটি পরিণত হয়েছিল অবৈধভাবে টাকা উপার্জনের একটি কার্যকরী হাতিয়ার। যোগাযোগ খাতে প্রত্যেকটা প্রকল্পের নির্মাণমূল্য দফায় দফায় অকারণে বৃদ্ধি করে প্রকল্পগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছিল- পদ্মা সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে,  মেট্রোরেল  প্রত্যেকটা প্রকল্পের টাকা দুই গুণ, তিন গুণ বৃদ্ধি করে ঋণের বোঝা জনগণের ওপর চাপানো হয়েছে।  

প্রকৌশলীরা সড়ক, রেল ও নৌপথের এই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটা প্রকৃত ডাটাবেইজ তৈরি করতে পারে। সড়ক, রেল ও নৌপথের আধুনিকায়নে কী কী পদক্ষেপে নেয়া যায়, সে ব্যাপারে কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরী কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, এই অপমৃত্যুতে একটা কিংবা একাধিক পরিবার সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরী উদ্যোগের প্রস্তাবনা দিতে পারে। বর্তমানে চলমান নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো কীভাবে জনবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী করা যায় সে ব্যাপারে প্রস্তাবনা দিতে পারে। কোথায় কোন প্রজেক্ট সরকার গ্রহণ করলে গণমানুষের উপকার হবে, অর্থনীতিতে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না যেটাকে বলা যায় “ংধভবৎ ্‌ বপড়হড়সরপ” সেরকম প্রকল্পের প্রস্তাবনা করতে পারে। এই প্রস্তাবনাগুলো সমষ্টিগত কোনো উদ্যোগে হতে পারে অথবা ব্যক্তিগত  উদ্যোগেও প্রকৌশলীরা এটা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে পারে পরবর্তী কার্যকরী পদক্ষেপের জন্য।

দফা-২৯: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের বিরূপ প্রভাবকে আমলে নিয়ে টেকসই ও কার্যকর কী কী কর্মকৌশল প্রণয়ন করা যায় তা নিয়ে প্রকৌশলীদের জরুরিভিত্তিতে কাজ করা উচিত।  বন্যা, জ্বলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, খরা-এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোকে কীভাবে পুনর্বাসন করা যায় এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। শহীদ প্রেসেডিন্ট জিয়াউর রহমানের যুগান্তকারী উদ্যোগ ছিল খাল খনন কর্মসূচি।  এর মাধ্যমে কৃষিতে যেমন একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন  এসেছিল,  ঠিক তেমনি বন্যার সময় অতিরিক্ত পানির প্রবাহকে রোধ করা সম্ভব হয়েছিল। খাল খনন কর্মসূচির আওতা কীভাবে বাড়ানো যায় এবং কোন কোন এলাকায় বা জনপদে এটা কার্যকরী করা যায়, তা নিয়ে ব্যাপক কাজ করা প্রয়োজন। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানকার মানুষকে সচেতন করা এবং ভূমিকম্প নিয়ে এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা একটি বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকরী টেকনিক্যাল পেপার তৈরি করতে পারে এবং এটা করা খুবই জরুরি। কারণ ভূমিকম্প হলে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকারই কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি  হবে এর কোনো প্রকৃত ংঃঁফ বা ঢ়ধঢ়বৎ ড়িৎশ এখন পর্যন্ত হয়নি। বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সমুদ্র সীমানায় তেল-গ্যাস আহরণ এবং এর মজুতের ভিত্তিতে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র বিদেশি প্রকৌশলী বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের সক্ষমতা কী করে বাড়ানো যায় সে ব্যাপারেও প্রকৌশলীরা যথাযথ প্রস্তাবনা দিতে পারে।

দফা-৩০: তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এই খাতের প্রকৌশলীদের খুব ফলপ্রসূ কিছু উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনের বেশির ভাগই ডিজিটাল প্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।  
তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে স্বাস্থ্য খাত, কৃষি খাত, শিক্ষা খাতে কী কী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে এবং কীভাবে তা কার্যকরী হবে, এ নিয়ে কৌশলপত্র প্রণয়ন করা উচিত। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির প্রকৌশলীরা বিশেষ করে কম্পিউটার প্রকৌশলী ও তড়িৎ প্রকৌশলীরা এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে। নতুন নতুন সফটওয়্যার তৈরি করা এবং এর রপ্তানির উদ্যোগ নেয়ার জন্যও কী কী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দলকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশকে ডিজিটাল প্রযুক্তির দিকে অবশ্যই পরিপূর্ণ ফোকাস করতে হবে। কারণ বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিময়। ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তি খাত একটি বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের উপায় হতে পারে। মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করার জন্য এবং জীবনের মান উন্নয়নের জন্য এই মুহূর্তে ডিজিটাল প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়াও মহাকাশ গবেষণা এবং আনবিক শক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা উদ্যোগী হতে পারে। দেশের সার্বিক উন্নয়নে বিদেশের বড় বড় (ইন্টেল, মাইক্রোসফট,  নাসা, আই বি এম এরকম আরও অনেক)  প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রকৌশলীদের এগিয়ে আসা উচিত।

দফা-৩১: জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসতো কম। এই প্রবণতাটা কম ছিল। কারণ গ্রামে মানুষদের জন্য  সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যাবস্থা করা হতো। কিন্তু এখনকার মানুষ শহরমুখী। এক রাজধানী ঢাকা শহরই মানুষের চাপে পিষ্ট। ৩১ নম্বর দফায় বিএনপি খুব জোরালোভাবে একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনার কথা বলেছে। 
কৃষি জমি নষ্ট না করে কীভাবে পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করা যায়, গ্রামের মানুষ যেন শহরমুখী না হয়- গ্রামেই যেন তারা তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পায়- এ নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীরা কাজ করতে পারে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কীভাবে টেকসই,  পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তোলা যায় এ নিয়ে পুরকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ যৌথভাবে অ্যাকশান প্ল্যান তৈরি করতে পারে। যেকোনো উন্নয়নে যেন পরিবেশের বিরূপ প্রভাব না পড়ে, কৃষি জমিগুলো যেন নষ্ট না হয় সে জন্য জাতীয় মহাপরিকল্পনার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনভিত্তিক ও জেলাভিত্তিক একটি নগর পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।

বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা দেশে এবং বিদেশে নানান প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত।  সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সময় তারা জনগণের টাকায় পড়াশোনা করেছে। কাজেই তাদের নিজে থেকেই দায়িত্ববোধ থাকা উচিত দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেদের অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ করা এবং জনগণের কাছে তাদের দায় শোধ করা।
বিএনপি একটি দল হিসেবে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছে। তারা এর বাস্তবায়নে সর্বাত্মক কর্মসূচি হাতে নিবে এটা অনুমেয়। বিএনপিমনা অনেক প্রকৌশলীরাও হয়তো কাজ করবেন। কিন্তু এর বাইরেও দেশে-বিদেশে কর্মরত আমাদের অনেক দক্ষ প্রকৌশলী, নগর-পরিকল্পনাবিদ আছেন যারা এই দফাগুলো নিয়ে কাজ করলে অনেক ভালো কোনো কৌশলপত্র, পরামর্শ বের হয়ে আসবে বলে মনে করি। দেশ ও জাতির কল্যাণে, গণমানুষের প্রকৃত উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা বিএনপি’র ৩১ দফার এই ৫টি দফাকে ধারণ করবেন এবং এর বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিবেন এই প্রত্যাশা।
www.engr-salahuddin.com 

[email protected]