ঢাকা, ৯ জুলাই ২০২৫, বুধবার, ২৫ আষাঢ় ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৩ মহরম ১৪৪৭ হিঃ

প্রথম পাতা

ডেঙ্গু আতঙ্কের জনপদ

মিজানুর রহমান, বরগুনা থেকে
৯ জুলাই ২০২৫, বুধবার
mzamin

বরগুনায় ঝরলো ৩১ প্রাণ, ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগী ঠাঁই নেই হাসপাতালে

বরগুনা যেন এক আতঙ্কের জনপদ। ডেঙ্গুতে এই জেলাটিতে প্রায় প্রতিদিনই ঝরছে তাজা প্রাণ। গত তিন মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। জেলা শহর থেকে উপজেলাগুলোর গ্রামে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। প্রায় ঘরে ঘরেই ডেঙ্গু রোগী। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। খালি নেই হাসপাতালের শয্যা। মেঝেতে, বেলকনিতে দেয়া হচ্ছে চিকিৎসা। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বরগুনায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করছেন আইইডিসিআর’র একটি গবেষক দল। তারা জানিয়েছেন, জেলাটিতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার কারণে এডিসের লার্ভা থেকে ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে ছড়িয়েছে। সদর উপজেলায় লার্ভার ঘনত্ব মিলেছে স্বাভাবিকের অন্তত সাড়ে ৮ গুণ বেশি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরগুনায় প্রায় প্রতিটি ঘরেই ডেঙ্গু পজিটিভ রোগী। রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে রোগীকে ঘরে বসেই চিকিৎসা দিচ্ছেন। আবার অনেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাড়ি জমান দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে। অনেক সময় শরীরে জ্বর নিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ না হলেও মারা যাচ্ছেন রোগী। প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন পার করছেন এখানকার মানুষ। জেলা জুড়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন এখানকার চিকিৎসক ও সেবিকারা। বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের সিঁড়ি, বেলকনি, রিসেপশন কক্ষসহ যেখানেই একটু জায়গা মিলছে, সেখানেই মেঝেতে বিছানা পেতে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ মঙ্গলবার সদর উপজেলার গুদিঘাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হাসিনা বেগম (৪৫) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার জেলায় নতুন করে আরও ৮৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে বরগুনা জেলায় মোট ৩ হাজার ৬০৬ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলায় ৬৩ জন, বামনায় ৮ জন, পাথরঘাটায় ৯ জন এবং বেতাগী ও তালতলীতে ২ জন করে শনাক্ত হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ২২৪ জন, যার মধ্যে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১৫০ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩ হাজার ৩৮২ জন।

বরগুনার উপজেলাভিত্তিক মোট আক্রান্তের মধ্যে বরগুনা সদরে ৩ হাজার ১৭৯ জন, পাথরঘাটায় ১৭৫ জন, বামনায় ১১৪ জন, তালতলীতে ৫৭ জন, আমতলীতে ৪৩ জন এবং বেতাগীতে ৩৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মৃতদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫শে মার্চ থেকে ৮ই জুলাই পর্যন্ত ৩১ জন মৃত্যুবরণ করেন। এরমধ্যে ২৫ জনের বাড়ি বরগুনা সদরে, ৪ জন বেতাগীতে এবং ২ জন পাথরঘাটায়। 

পুরনো পানি থেকে মশার প্রজনন বাড়ছে
চলতি বছরে রাজধানী ঢাকার পর বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় জেলা বরগুনায় ডেঙ্গু রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে। জেলাটিতে সুপেয় পানির অভাব। বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখেন বাসিন্দারা। তাতে পুরনো পানি থেকেই যায়। এতেই মূলত মশা ডিম পাড়ে। প্রজনন বাড়ে। বরগুনা শহরের ৯টি ওয়ার্ডের ৫টি ওয়ার্ডই ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সদর উপজেলায় লার্ভার ঘনত্ব মিলেছে স্বাভাবিকের অন্তত সাড়ে ৮ গুণ বেশি। প্রভাব বিস্তার করছে ডেঙ্গুর ডেন-৩ ও ডেন-২ ধরন। চিকুনগুনিয়া বা অন্য কোনো ভেরিয়েন্ট নেই। ডেঙ্গুর প্রজনন উৎসের বেশির ভাগ প্লাস্টিকের ড্রাম, প্লাস্টিক বালতি, সিমেন্টের পাত্র, ফুলের টব ও ট্রে, প্ল্যাস্টিকের মগ ও বদনা, প্লাস্টিকের বোতল থেকে। গত ১৬ই জুন থেকে ২২শে জুন আইইডিসিআর এর গবেষণা টিমের বরগুনায় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবে নিয়ে করা গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। 

২৫শে জুন আইডিসিআর অডিটোরিয়ামে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন এসব প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, বরগুনার ৯ ওয়ার্ডের মধ্যে লার্ভার ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ৫টি ওয়ার্ডে। এর মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিতে ৭ এবং ৯ নং ওয়ার্ড। পাশাপাশি ২, ৬ এবং ৮নং ওয়ার্ডেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লার্ভার ঘনত্ব পাওয়া গেছে। ডেঙ্গুর তিনটি ধরনের মধ্যে ডেন-৩ সবচেয়ে বেশি- ৪৬.৫ শতাংশ, এবং ডেন-২ ৩৯.৫ শতাংশ এবং ডেন:২+৩ পাওয়া গেছে ১৪ শতাংশ। ১৮৪ পরিবার/বাড়ি নিয়ে তারা কাজ করেন। শুধু সরকারি হিসাবে আসা কেস নিয়ে তারা কাজ করেছেন। কমিউনিটি বা বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য এর মধ্যে আসেনি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা পৌর এলাকার ১৩৮টি পরিবারের মধ্যে ৬৫ জন আক্রান্ত পাওয়া গেছে এবং সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৪৬ পরিবারে মধ্যে ৭৫ জন আক্রান্ত পাওয়া গেছে। অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, এবার ডেঙ্গুর ডেন-৩, ডেন-২ এবং ডেন-২+৩ পাওয়া গেছে। কিন্তু চিকুনগুনিয়া বা অন্য কোনো ভেরিয়েন্ট নেই। গবেষক টিমের নেতৃত্ব দেয়া আইইডিসিআর’র প্রিন্সিপাল বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. রত্না দাস বলেন, উপকূলীয় এলাকাটিতে সুপেয় পানির অভাব। বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখেন তারা। এতে ঢাকনাও দেন না। শুধু পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন। পুরনো পানি পরিবর্তন বা ফেলে দেন না। ব্যবহার শেষ হওয়ার আগেই এতে নতুন পানি যুক্ত করেন, তাতে পুরনো পানি থেকেই যায়। এতেই মূলত মশা ডিম পাড়ে। প্রজনন বাড়ে। এত বেশি আক্রান্ত হওয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে আক্রান্ত হয়েছে তাকে মশারির মধ্যে রাখা যায় না, বেরিয়ে যায়। বিশেষ করে বাচ্চারা খেলতে বেরিয়ে পড়ে। পাশাপাশি ঈদের মৌসুম হওয়ায় মানুষের যাতায়াত বেশি হওয়ায় ছড়িয়েছেও বেশি। ডেঙ্গু সঙ্গে নিয়ে আসছে, বা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকারের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। তিনি  বলেন, স্থানীয় সরকারের জনবল অভাব আছে। 

বরগুনায় ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ ডেন-৩ ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত হয়েছেন। সীমিতসংখ্যক নমুনা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকাহ বলেন, প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে। সীমিত জনবল ও অবকাঠামোতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, কিন্তু পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ছে।

বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে জনসচেতনতা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মশক নিধন কর্মসূচি চালানো ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বরগুনায় আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আমাদের চিকিৎসা সক্ষমতা সীমিত, তাই প্রতিরোধেই জোর দিতে হবে। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেয়া এবং মশা নিধনের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি।
 

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

   
Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2025
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status