রিসেট

যে কারণে চামড়ার দামে ধস

প্রকাশিত: ১২ জুন (বৃহস্পতিবার), ২০২৫ Archive 2022Source: এম এম মাসুদ

সাভারের হেমায়েতপুরের ২০০ একর জমিতে গড়ে ওঠা চামড়া শিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। শিল্পপার্কে দেড়শ’র অধিক কারখানার মধ্যে উৎপাদনে আছে ১৩০-১০৪টি। এর  মধ্যে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ আছে ৮টি ট্যানারির। সনদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে আরও ৭টি মতো। কিন্তু সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় বাকিগুলোর সদন অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চামড়ার ভালো দাম পাচ্ছেন না বলে দাবি ট্যানারি মালিকদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠনের মাধ্যমে সমন্বিত পরিকল্পনায় কয়েক বছরেই মিলতে পারে সুফল। তাদের মতে, সিইটিপির উন্নয়ন, এলডব্লিউজি সনদ পাওয়া, কাঁচা চামড়ার উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হলে চামড়ার দাম ভালো পাওয়া যাবে। 

এদিকে সাভারের চামড়া শিল্প নগরে ত্রুটিপূর্ণ সিইটিপি নির্মাণে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। ঈদ পরবর্তী শিল্পনগরী পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধলেশ্বরী নদীকে বাঁচিয়ে চামড়ার বিশ্ববাজার ধরতে সাভারের শিল্পনগরীতে নতুন আরেকটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করবে সরকার। 

জানা গেছে, ১৯৫০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রাজধানীর হাজারীবাগ ছিল ট্যানারি শিল্পের বৃহৎ ঠিকানা। কিন্তু ট্যানারি শিল্প এলাকায় ছিল না আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আবার লোকালয়ের কাছে হওয়ায় এর দূষণ বিপর্যস্ত করছিল স্থানীয়দের, দূষিত হচ্ছিল বুড়িগঙ্গা। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরাতে ২০০৩ সালে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প হাতে নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। মোট ১২ দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ১ হাজার ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় এ নগরী। পরে হাজারীবাগ থেকে ২০১৭ সালে সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তর করা হয় ট্যানারিগুলো। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত হয়নি। দুই দশকের চেষ্টাতেও গড়ে তোলা যায়নি মানসম্পন্ন শিল্প পার্ক। তরল বর্জ্য পরিশোধনে স্থাপিত সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি) পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় দূষিত পানি যাচ্ছে সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে। 

ওদিকে গত বছরের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবেশ নিয়ে সরব থাকা কয়েকজন বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু তারা দায়িত্ব নেয়ার ১০ মাসেও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিাযোগ সংশ্লিষ্টদের। 

এলডব্লিউজি সনদ দরকার: বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে ভালো দামে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করতে হলে বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মাত্র ৮টি প্রতিষ্ঠানের এলডব্লিউজি সনদ রয়েছে। বাংলাদেশ মূলত এমন সব বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে যেখানে ব্র্যান্ড মূল্য নেই। 
বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, চামড়ার তরল ও কঠিন বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে এলডব্লিউজি সনদের জন্য অডিটরকে ডাকতে পারি। কিন্তু হচ্ছে না। চামড়া খাতের উন্নয়নে বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হলেও, তা বাস্তবতার মুখ দেখেনি। 

সক্ষমতার বেশি বর্জ্য: বর্তমানে সাভারে সিইটিপি প্রায় ১৮ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ঈদুল আজহার সময়ে অন্তত ৪৫ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য শোধনের প্রয়োজন পড়ে। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্যের বড় অংশই পড়ছে ধলেশ্বরী নদীতে। এসব কারণে মিলছে না চামড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে এলডব্লিউজি সনদ। দাম পাচ্ছেন না মৌসুমি ব্যবসায়ীও।
 

মরণদশায় ধলেশ্বরী নদী: চামড়া শিল্পের বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে মরণদশায় ধলেশ্বরী নদী। নদীর তীরে উন্মুক্ত স্থানে বিশেষ করে ক্রোমিয়ামযুক্ত কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়, যা পানি ও মাটি দুটোই দূষিত করছে। অন্যদিকে এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন মূলধনের অভাবে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারছেন না কারখানাগুলোতে। তবে আশা করা হচ্ছে বর্তমানে চালু থাকা বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি সচল হবে আগামী অর্থবছরেই।

শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, সিইটিপির ডিজাইনটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। যারা এটি করেছে, তারা ত্রুটিপূর্ণভাবে করেছেন। এখন নতুন করে প্লান্ট তৈরি করার সময় হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিনা মূল্যেই এটি করে দিতে যাচ্ছে। 
ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, ৮টি প্রতিষ্ঠানকে কাঁচা চামড়ার টুকরো (বর্জ্য) রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতের অনুমতি দিয়েছি। এ ছাড়া আমরা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগতভাবে সিইপিটি তৈরির অনুমতি দিচ্ছি। সেটি হয়ে গেলে এ খাতে উন্নতি ঘটবে।

চামড়ায় দম কমার কারণ: গত সোমবার সাভারের চামড়া শিল্পনগরী পরিদর্শনে গিয়ে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেছেন, আমাদের চেষ্টা ছিল ভালোভাবে চামড়া সংগ্রহ করা। সেইসঙ্গে চামড়া বিক্রেতারা যেন সরকার নির্ধারিত মূল্য পান, তা নিশ্চিত করা। তবে চলতি বছরে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে দেরিতে লবণ সরবরাহই দায়ী। চামড়ায় দেরিতে লবণ দেয়ার কারণে চলতি বছর কোরবানির পশুর চামড়ায় অনেকে কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি। তবে লবণজাত চামড়ার দর ঠিকই আছে। সরকার তৎপর ছিল বলেই এ বছর খুব কম সংখ্যক চামড়া নষ্ট হয়েছে। 
এদিকে গত বছরের তুলনায় এবার কাঁচা চামড়ার দাম বেশি বলে দাবি করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন। সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

উপদেষ্টা বলেন, আমরা চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছিলাম লবণসহ। ৭০০-৮০০ টাকায় চামড়া বিক্রি হয়েছে। কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া নিয়ে আধা পচা করে ফেলছে। এই আধা পচা চামড়া এই দামে বিক্রি হওয়া অনেক বেশি। যেটা ভালো চামড়া সেটা এক হাজার দুশ’ থেকে এক হাজার তিনশ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লবণ দেয়া চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি করছে। 

চলতি বছর কোরবানির ঈদের মৌসুমে ৮০ থেকে ৮৫ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ট্যানারি মালিকরা।
 

দাম না পেয়ে হতাশ: ঢাকায় প্রতিটি গরু বা মহিষের কাঁচা চামড়া ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ঢাকার বাইরে গ্রামেগঞ্জে বেচাকেনা হয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। ছাগলের চামড়ার ক্রেতা তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। শনিবার ঈদের দিন দেখা গেছে, একজন একটি বড় গরুর চামড়া কিনেছেন ৮০০ টাকা দিয়ে। বিক্রির সময় দাম বলছেন ৭০০ টাকা।১০০ টাকা ক্ষতি। ঢাকার বাইরের চিত্র আরও নেতিবাচক ছিল। 
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতবারের চেয়ে ৫ টাকা বাড়িয়ে ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, ঢাকার বাইরে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। 

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার প্রতি বছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে। ফলে প্রাথমিক ধাপের এ চামড়ার ন্যায্য দর পাওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা হারিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ ক্রেতা না পেয়ে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানায় বিনামূল্যে চামড়া দান করে দেয়। 
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর কোরবানি হয়েছে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু। ট্যানারি মালিক সূত্র বলছে, এ বছর ৮৫ থেকে ৯০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা।