ঢাকা, ৪ অক্টোবর ২০২২, মঙ্গলবার, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

শেষের পাতা

কলকাতার চিঠি

পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলে তেলেভাজা খেলেন? অর্পিতা কি পরে আছেন, শাড়ি না সালোয়ার?

জয়ন্ত চক্রবর্তী
১২ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার

 স্কুল সার্ভিস কমিটির নিয়োগ দুর্নীতিতে সাবেক মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলে গেছেন। বান্ধবী অর্পিতাও জেলে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় নাকি জেলে তেলেভাজা খেতে চেয়েছেন, অর্পিতা মুখোপাধ্যায় আলিপুর মহিলা সংশোধনাগারে। কি পোশাক পরে আছেন? শাড়ি নাকি সালোয়ার স্যুট? টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খাওয়া ভিড়। প্রভাতী সংবাদপত্রে  পাঠকদের দাপাদাপি। কোথায় লাগে টিআরপি রেটিং-এ এক নম্বরে থাকা সিরিয়াল মিঠাই? পার্থ-অর্পিতা কাণ্ডে ক্রাইম আছে, সেক্স আছে, আছে রহস্য রোমাঞ্চের ধারাবাহিক উপাখ্যান। আর মিডিয়া? যা পাবলিক খাচ্ছে তাই দাও। অতি ভোজনে পেটের ব্যামো হলে সেই দায় তো আমাদের নয়। তাই, সন্ধ্যা হলেই সেজেগুজে ক্যামেরার সামনে বসে অপার মুণ্ডুপাত কিংবা দুজনে জেলে  কীভাবে কাটাচ্ছেন তার সরস বর্ণনা। সকালের কাগজে সুললিত বাংলায় পার্থ-অর্পিতার রগরগে কাহিনী।

বিজ্ঞাপন
সাংবাদিক কি সঞ্জয়? অন্তর্দৃষ্টিতে মহাভারতের যুদ্ধ অবলোকন করে  তিনি ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে। এখনকার সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিক তার অন্তর্দৃষ্টিতে দেখতে পান বান্ধবী অর্পিতা বিহনে ব্যাকুল পার্থ চট্টোপাধ্যায় খোঁজ নিচ্ছেন, ও খাওয়া দাওয়া করছে তো? পার্থ-অর্পিতা হিট। 

আগামী পনেরো আগস্ট ভারতের স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পূর্তি হচ্ছে। আজাদির পঁচাত্তর পূর্তি অনুষ্ঠান অমৃত মহোৎসব হিসেবে পালিত হবে। ঘরে ঘরে তিরঙ্গা উড়বে। দিকে দিকে অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পঁচাত্তর পূর্তি অনুষ্ঠানের দিন কেউ কি একবার মনে করবেন মালদহের যাদুপাড়ার নিশ্চিন্তিপুর গ্রামের কথা? অভাবের তাড়নায় যেখানকার তিরিশ ঘর অধিবাসী আজ ইঁদুর পুড়িয়ে খায়? শিউরে উঠছেন, বিশ্বাস হচ্ছে না? হবে তো না বটেই। একবার চলে যান না যেকোনো ট্রেন ধরে মালদহ টাউন স্টেশনে। সেখান থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে নিশ্চিন্তিপুরে। নিজের চোখে দেখে আসুন নিদারুণ দারিদ্র্য আর অনটনের অভিশাপে খাদ্যবস্তু কিনতে না পাড়ার অক্ষমতায় মানুষ কেমন ইঁদুর মেরে খাচ্ছে। বলবেন তো, ইঁদুর তো আদিবাসীদের ডেলিকেসি! জানি, আপনি এই কথা বলবেন। বিদেশের উদাহরণ টেনে আনবেন। কিন্তু, একবার কান পাতুন নিশ্চিন্তিপুরের অন্দরে কন্দরে- তীব্র হাহাকার ছাড়া আর কিছু শুনতে পাবেন না। এই ইঁদুর রোস্ট হয়ে পার্থ- অর্পিতার প্লেটে পড়লে মিলিয়ন ডলার নিউজ হতো জানি। কিন্তু, হে সাংবাদিক কুল, একবার শুধু একবার নির্মোক ছেড়ে বেরিয়ে আসুন না... চিরাচরিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-শুভেন্দু অধিকারী কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিট-এর বাইরেও যে একটি বিশাল বঙ্গ প্রদেশ পড়ে আছে তারদিকে একটু দৃষ্টিপাত করুন না। 

আপনাদের দোষ দিয়েই বা কি লাভ! যে রাজ্যে আজও প্রভাতী সংবাদপত্রে ডাইনি নিধনের কথা পড়ে চায়ে বিস্কুট চোবাতে চোবাতে মধ্যবয়স্ক বাঙালি ভাবে- কাগজওয়ালারা বড় অদ্ভুত তো! লিখতে পারতো তো ডাইনির বয়স কতো ছিল? ডাইনি গায়ে গতরে ডাগরডোগর ছিল তো? ডাইনি সুস্তনি ছিল না সু নিতম্বিনী তা কি লিখতে পারতো না অসভ্য কাগজওয়ালারা? গজগজ করতে করতে যে পাঠক কাগজ ছুঁড়ে ফেলে উঠে চলে যান, আজ স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পরেও এরাই কাগজের টার্গেট রিডার কিংবা টেলিভিশনের টার্গেট অডিয়েন্স।  অতএব, নিশ্চিন্তিপুরের ইঁদুর খাওয়ার ঘটনা নয়, স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরে ইঁদুর খেয়ে বেঁচে থাকা গ্রাম নয়, ব্রেকফাস্টে পার্থ-অর্পিতার মেন্যু কিংবা দুপুরে তাদের ডাল সবজি ভাত খাওয়া কিংবা রাতের খাদ্যতালিকা পাঠক দর্শকদের কণ্ঠস্থ করাতে হবে, ভাঁড় মে যায় ইঁদুর খাওয়ার গল্প! আমলাশোলে মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গেল নাকি কোথাকার নিশ্চিন্তিপুরের মানুষ ইঁদুর খেয়ে দিন গুজরান করছে তাতে আমার কি? আমি  বঙ্গ পুঙ্গব, পনেরো আগস্ট ছুটির দিন সকালে ডালপুরি আলুরদম খেয়ে বাড়িতে তিরঙ্গা ওড়াবো। পাড়ার চায়ের দোকানের গুলতানিতে মমতাদের তুলোধোনা করবো, দুপুরে মাংস ভাত খেয়ে নধর একটি দিবানিদ্রা। সন্ধ্যার শো তে কোনো মাল্টিপ্লেক্সে ঢুকে সালমান খানকে সুন্দরী নায়িকার সঙ্গে প্রেম করতে দেখে আক্ষেপ করা- আমি কেন সালমান হলাম না? এভাবেই কেটে যাবে স্বাধীনতার পঁচাত্তর উদ্‌যাপন। 

বৃটিশদের কাছ থেকে যে তরুণ বাঙালি একদা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল তাদের কথা নিদেনপক্ষে স্মরণ করলেও যে দিনটি ভালোভাবে কাটতো আমরা তো তাকে ক্ষুদিরামের গ্যাস খাওয়ার দিন বলে চিহ্নিত করেছি। তাহলে আর আক্ষেপের কি আছে! চালাও পানসি বেলঘরিয়া... আমরা স্বাধীনতার পঁচাত্তর সেলিব্রেট করি।  পানশালায় বরং সফেন বিয়ারের  মগ-এ ঠোকাঠুকি করে বলি, চিয়ার্স, স্বাধীনতা এসে গেছে! স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পূর্তির পরেও আজও যে দেশে ভোট বিক্রি হয় সোনা, টেলিভিশন সেট, ল্যাপটপ, মিক্সার গ্রাইনডার, ফ্যান, সোলার পাওয়ার সিস্টেম এবং গরু ছাগলের বিনিময়ে সেই দেশের অঙ্গরাজ্যে এই অবস্থা কি অসম্ভব? সুপ্রিম কোর্ট এবং ইলেকশন কমিশন ভোটে এই ফ্রি বিস ব্যবহার নিয়ে চূড়ান্ত বিবাদে লিপ্ত। রাজনীতিবিদরা একে অপরের গায়ে কাদা ছিটাতে ব্যস্ত। মহাত্মা গান্ধী উনিশশো পঁচিশ সালে পনেরো নম্বর কলেজ স্ট্রিটে যে খাদির প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন, সেখানে স্বাধীনতার ক’দিন আগেও একটিও জাতীয় পতাকা নেই স্টকে। জরাজীর্ণ দোকানটি শতবর্ষের মুখেই হয়তোবা ভেঙে পড়বে। তাতে কার কি আসে যায়! বাঙালি তো মজে আছে পার্থ-অর্পিতার সোপ অপেরায়। একজন কোনো নীতিবাগিশ এই সব কথা তুললেই আম বাঙালি চোখ পাকিয়ে বলছেন- চোপ, ক্ষমতা-দুর্নীতি-সেক্স এর সিরিয়াল চলছে। দেখতে দেখতে বাঙালি ঘুমাইতেছে। কাঁচা ঘুম ভাঙাইও না!   

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

শেষের পাতা থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status