ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, বুধবার, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

দেশ বিদেশ

অসচ্ছল হয়েও টিসিবি’র কার্ড পায়নি সাড়ে ৩৯ শতাংশ পরিবার: টিআইবি

স্টাফ রিপোর্টার
১২ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার

রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অসচ্ছল হয়েও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্ড পায়নি সাড়ে ৩৯ শতাংশ পরিবার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।  চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে টিসিবি কর্তৃক এক কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে দুই দফায় তেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও পিয়াজ বিতরণ করা হয়। যেখানে করোনার সময় ২৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়া ৩৮.৫ লাখ পরিবারের অন্তর্ভুক্তি থাকার কথা ছিল। নগদ সহায়তা পাওয়া এসব পরিবারের ওপর গবেষণা করে বৃহস্পতিবার ‘টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য পরবর্তীতে আরও ৬১.৫ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তাদেরকে এই জরিপের আওতায় আনা হয়নি। টিআইবি ৩৫টি জেলা থেকে মোট ১০৪৭ পরিবারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩৯.৫ শতাংশ পরিবার টিসিবি’র কার্ড পায়নি। যাদের মধ্যে ৮০.৪ শতাংশ বলেছেন- তারা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বাদ পড়েছেন, স্বেচ্ছায় কার্ড নেননি ৫.৫ শতাংশ এবং বাদ পড়ার কোনো কারণ জানে না ১৪.১ শতাংশ। কার্ড না পাওয়া পরিবারগুলো জানায়, তদবির-সুপারিশ না থাকা, যোগ্য নয় এমন ব্যক্তিদের কার্ড দেয়া, রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ দেয়া, ছবি-আইডি কার্ড নিয়েও কার্ড না দেয়া, কার্ডের স্বল্পতার অজুহাত, একই পরিবারে একাধিক কার্ড দেয়া, ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ না দেয়া ইত্যাদি কারণে তাদের বাদ পড়তে হয়েছে। 

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বল্প আয়ের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ জনগণ যে সুবিধা পাওয়ার কথা মোটা দাগে সেটা অর্জন হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
তবে রাজনৈতিক চাপ, ব্যবস্থাপনার সংকটে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে যাদের পাওয়ার কথা তাদের মধ্যে ৩৯.৫ শতাংশ এই সুবিধাটা পায়নি, বঞ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে তুলনামূলক বেশি বঞ্চিত হয়েছে নারীরা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে যাদের পাওয়ার কথা নয়, তারাও পেয়েছে। অনেকে প্রতারণার শিকার হয়েছে। একই পরিবার একাধিক কার্ড পেয়েছে এবং অভিযোগ নিরসনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতাদের ৫১.৩ শতাংশ মনে করেন তালিকাভুক্তিতে যোগ্য হতদরিদ্র ব্যক্তিদেরকে বাদ দিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সচ্ছল ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার মধ্যে ৭৬.১ শতাংশ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি, ৬৫ শতাংশ জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজন, ৪৪.৫ শতাংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, ৪৪.৫ শতাংশ রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্য ৭.১ শতাংশ এবং পণ্য বিক্রয়কারী ডিলার ৫.২ শতাংশ।  উত্তরদাতাদের ৮ শতাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তারা বলছেন, কার্ড প্রাপ্তিতে উপকারভোগীদের ৫০ থেকে ২০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। আবার সামর্থ্যের অভাবে কিছু দরিদ্র মানুষ পণ্যও ক্রয় করতে পারেনি। জরিপের উত্তরদাতাদের মধ্যে ৭.৫ শতাংশ পরিবার একবারও পণ্য ক্রয় করতে পারেনি।  রোজার আগে ও মাঝে এক কার্ড ?দিয়ে দুইবার তিনটি ও চারটি পণ্যের প্যাকেজ ক্রয় করেছে পরিবারগুলো। 

প্যাকেজের মূল্য ছিল যথাক্রমে ৪৬০ ও ৫৬০ টাকা। পণ্য নেয়ার সময়ও মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। টিসিবি’র ট্রাক বা ডিলারের কাছ থেকে পণ্য কেনার সময় অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হয়েছে ১৩.৭ শতাংশ উপকারভোগী। এর মধ্যে নিম্নমানের পণ্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অতিরিক্ত পণ্য বিক্রয়, ট্রাক না আসায় অপেক্ষা করে ফেরত যাওয়া, সিরিয়াল আসার পূর্বেই সরবরাহকারীর মজুত শেষ হয়ে যাওয়া, প্যাকেজে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে কম পণ্য বিক্রয়, তালিকায় নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দামে পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য করা। কিছুক্ষেত্রে পণ্য ক্রয়ের সময় ডিলার/বিক্রয়কর্মী নিয়মবহির্ভূতভাবে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি আদায় করেছে। ৩৩ শতাংশ উপকারভোগী প্যাকেজে নিম্নমানের পণ্য পেয়েছে। এর মধ্যে দলা পাকানো ডাল, শক্ত হয়ে যাওয়া চিনি, নিম্নমানের ভোজ্য তেল পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পরবর্তীতে এ ধরনের উদ্যোগ থাকলে দলীয় বিবেচনা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা টিআইবি’র ১০টি সুপারিশ: ১. জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপকারভোগীদের প্রাথমিক তালিকা তৈরির পর ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দলিত, আদিবাসী, প্রভৃতি প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। 

২. উপকারভোগীর চূড়ান্ত তালিকা স্থানীয় পর্যায়ে (ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন) প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। সারা দেশ থেকে সংগৃহীত মোট উপকারভোগীর তালিকা মন্ত্রণালয়/টিসিবি’র ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। ৩. শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করতে হবে ও বিতরণের সময়, তারিখ, স্থান ইত্যাদি তথ্য সবপর্যায়ে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ৪. বিনামূল্যে তালিকাভুক্তি ও কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেন না করার বিষয়ে উপকারভোগীদের সচেতন করতে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম (এসএমএস পাঠানো, ফ্যামিলি কার্ডে সচেতনতামূলক তথ্য মুদ্রণ করে দেয়া ইত্যাদি) পরিচালনা করতে হবে। এ ধরনের ঘটনা সংঘটিত হলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে তা প্রচার করতে হবে। ৫. উপকারভোগীদের চাহিদা-সামর্থ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্যাকেজে পণ্যের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। প্যাকেজভিত্তিক পণ্য বিক্রির পাশাপাশি অতিদরিদ্র ব্যক্তি যাদের প্যাকেজের সব পণ্য একসঙ্গে ক্রয়ের সক্ষমতা নেই তাদের চাহিদা-সামর্থ্য অনুযায়ী স্বল্প পরিমাণে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা রাখতে হবে। 

৬. পণ্যের গুণগতমান, পরিমাণ, কেন্দ্র কিংবা পয়েন্ট খোলা থাকার সময় ও অবস্থান পরিবীক্ষণে ‘ট্যাগ টিম’-এর কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ৭. বিক্রয় কেন্দ্রের কিংবা পয়েন্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে ও এসব কেন্দ্র নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. প্যাকেজে পণ্যের ধরন, পরিমাণ, নির্ধারিত মূল্য ইত্যাদি তথ্য বিক্রয়কেন্দ্রে প্রদর্শন করতে হবে। অভিযোগ দায়ের করার সুবিধার্থে টিসিবি ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির হটলাইন নম্বর, নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর ইত্যাদি প্রদর্শন করতে হবে।  ৯. তালিকাভুক্তি ও সাশ্রয়ীমূল্যে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ১০. উপকারভোগীদের প্রণীত তালিকা ও তালিকা প্রস্তুত প্রক্রিয়া নিয়ে একটি স্বাধীন নিরীক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে ও দ্রুত সময়ের মধ্যে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত সচ্ছল পরিবারগুলোকে বাদ দিতে হবে।

দেশ বিদেশ থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

দেশ বিদেশ থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status