সব রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রোডম্যাপ দেবে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবশ্যই রোডম্যাপ দেবে। ইতিমধ্যে ৬টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ করছে এবং সেখানেও আলোচনার মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
শনিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ মিলনায়তনে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ-মানবাধিকার প্রসঙ্গ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
রাজনৈতিক দলের জন্য একটি আইন করার কথা জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, আমার কাছে পলিটিক্যাল পার্টি অ্যাক্টের একটা খসড়া আছে সেটা বদিউল আলম মজুমদার (নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিটির প্রধান) আমার কাছে চেয়েছেন, আমি এটা তাকে দিয়ে দিবো। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যারাই ক্ষমতায় যান তারা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চান। এটা দেখে আসছি ১৯৭২-এর পর থেকে এ পর্যন্ত।
রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো জবাবদিহিতা নেই উল্লেখ করে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অনেক রক্ত ঝরার পর আমরা একটা রাজনৈতিক দলের ভেতরটা দেখলাম। এই রাজনৈতিক দলটি যা করেছে জঘন্যতম নাৎসির সঙ্গে তুলনা করলেও হয়রান হয়ে যাবেন। যিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, দেশ ছেড়ে চলে গেছেন তিনি এখনো বলেন, তিনি রক্তপাত বন্ধ করার জন্য চলে গেছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে যারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান আছেন তারা সবাই ভালো মানুষ। কিন্তু তারা মাত্র প্রধান হয়েছেন। এখানে সময় লাগবে। অন্তত এক বছর সময় লাগবে তাদের সব কিছু গুছিয়ে আনতে। নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার প্রতি জোর দিয়ে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নাগরিক সমাজ তৈরি করেন, আমাদের দেশে নাগরিক সমাজ নাই। নাগরিক সমাজ না থাকলে যাদের ভোট দিয়ে বসাবেন তারাও একই রকম আচরণ করবে।
পুলিশ বাহিনীকে পরিবর্তন করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের পুলিশ বাহিনী পরিবর্তন করা হবে, তারা নিজেরাও চাচ্ছে। আমরা যদি পুলিশকে মানবতার পুলিশ করতে চাই তাহলে আমাদের অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।
সিজিএস’র চেয়ার মুনিরা খান বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে মানবাধিকার কমিশন নতুন নিয়ম অনুযায়ী স্বচ্ছতা ধরে রেখে খুব একটা কাজ করেছে বলে আমরা দেখতে পাইনি। কীভাবে কাজ করলে, কী করলে আমরা স্বৈরাচারের হাতে পড়বো না, তা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।’ সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে উল্লেখ করেন তিনি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক)-এর নির্বাহী পরিচালক মো. নূর খান বলেন, ‘আমাদের ঘুরে ফিরে দিন শেষে আমাদের রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ফেরত যেতে হবে। মানবাধিকার কমিশন গঠনে কার্যকারিতায় কোনো স্বচ্ছতা নেই। পনেরো বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ হলো এই জুলাই-আগস্টের আন্দোলন। নিকট অতীত নিয়ে আলোচনা করা হয়, পূর্বের কথা বলি না। সরকারের উচিত যে স্থাপনাগুলোতে মানুষকে গুম করে রাখা হতো যেমন-আয়নাঘর, টর্চার সেল সেগুলোকে সংরক্ষণ করা।’
বিগত ১৫ বছরে ৬ হাজারের বেশি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। সেই সময়ে যারা তদন্তে ছিলেন তাদেরকে আসামি হিসেবে যুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘আইনের সংস্কারে কাজ করতে গেলে অনেকগুলো বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন। পুলিশ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিশন গঠন না হলে নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। দলীয় বিচারক, দলীয় বিচারপতি তথা দলীয়করণ থেকে বের না হয়ে আসলে কোনো লাভ নেই। আইন আছে কিন্তু তার কোনো প্রয়োগ নেই।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দিলরুবা শরমিন বলেন, ‘বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময়ে আমলাদের নিয়ে মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনে আইনজীবী, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কোনো প্রতিনিধি ছিল না। যে প্রতিষ্ঠান অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকবে, সেই প্রতিষ্ঠান তদন্ত করতে পারবে না। স্বাধীন তদন্ত সংস্থা থাকা প্রয়োজন।’
মানবিকতা মানবাধিকারের মূল বিষয় উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার সময় আইনের প্রয়োগ নিয়ে কথা বলি। তবে মানবাধিকারের মূল বিষয় হলো মানবিকতা। মানবাধিকার কমিশন বা অন্যান্য সংস্থাগুলো তৈরি করা হয়েছে সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে। স্বতন্ত্র সংগঠন হিসেবে কাজ করতে না পারলে আজ্ঞাবহ হয়েই থাকতে হবে এই সংস্থাগুলোকে।’
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমাদের দেশের আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে আজকের এই আলোচনার প্রয়োজন হতো না। সংখ্যালঘুদের অধিকার কীভাবে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই? সেই আলোচনা করা প্রয়োজন। আইন, বিচার ব্যবস্থা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সংস্কারের প্রয়োজন। সংস্কারের সময় সাংস্কৃতিক সংস্কারেরও প্রয়োজন। তা না হলে মব জাস্টিস আরও বাড়বে।’
গণফোরামের কার্যনির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদেরও অনেক আশা ছিল। কমিশন আগেও ছিল। কিন্তু সেখানে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। ১৯৯০- এর গণঅভ্যুত্থানের পরও আশা বেঁধেছিলাম আমরা, ফল পাইনি। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে হবে। রাষ্ট্রের সংস্কারে তরুণদের সম্পৃক্ততা নিয়ে কাজ করতে হবে। ছাত্রদের যদি রাষ্ট্র পুনর্গঠনে ব্যবহার না করা যায়, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা ব্যর্থ।’
মানবাধিকার কমিশনের কাছে প্রশ্ন রেখে ‘মায়ের ডাক’-এর আহ্বায়ক সানজিদা ইসলাম বলেন, ‘গত ৫ই আগস্টের পর থেকে আমরা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে পারছি, এই পরিবর্তন শুধু দেখতে পাচ্ছি। বিগত ১২ বছরে জাতীয় আন্তর্জাতিক মাধ্যমে যখন সরকার বার বার বলছিল, বাংলাদেশে গুম বলে কিছু নেই, তখন মানবাধিকার কমিশনের কাজ কী ছিল? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেয়া ছাড়া আর কোনো কাজ তারা করেনি।’
সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আহসান হাবীব ভূঁইয়া, এবি পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, রাজনীতি বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক সালেহ আহমেদ, কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা, নারী অধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান, ট্রান্স নারী অধিকার কর্মী জয়া শিকদার, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নাইমা আক্তার রীতা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি তৌহিদ সিয়াম ও জি নাইনের সাধারণ সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ।
