রিসেট

বাজার পরিস্থিতি অসহনীয়

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর (শনিবার), ২০২৪ Archive 2022Source: স্টাফ রিপোর্টার

সরকার পতনের পর পরিবহন খাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজি কমেছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহও স্বাভাবিক। তবুও কমছে না দাম, উল্টো চাল, পিয়াজ, সবজি, মাছ, ডিম, মুরগিসহ অধিকাংশ পণ্যের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। গতকাল রাজধানীর তালতলা, আগারগাঁও ও কাওরান বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে ৫০ টাকার নিচে মিলছে না বেশির ভাগ সবজি। পিয়াজের দাম বেড়ে ঠেকেছে ১২০ টাকায়। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। গরিবের আমিষ খ্যাত ডিমের হালি ৫৫ টাকা। মাঝারি মানের চালের কেজি ৬০ টাকা আর মোটা চালের কেজি ৫৫ টাকা। এ ছাড়া রপ্তানির খবরে ইলিশের দাম কেজিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। ফলে মানুষের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে বাজার। 

বেঁধে দেয়ার পরও বেড়েছে ডিম-মুরগির দাম: ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। নতুন মূল্য অনুযায়ী প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৭৯ টাকা ৫৯ পয়সা এবং প্রতিটি ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয় ১১ টাকা ৮৭ পয়সা। এতে প্রতি ডজন ডিমের দাম পড়ে ১৪২ টাকা ৪৪ পয়সা। কিন্তু মূল্য নির্ধারণের ১০ দিন পার হলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বরং বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরায় একটি ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ১৪ টাকা, হালি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে ডিম ১৬৫ টাকা ডজনও বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগি এখন ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। অর্থাৎ সপ্তাহ ব্যবধানে কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে।

৫০ টাকার নিচে মিলছে না অধিকাংশ সবজি: স্বস্তি নেই সবজির বাজারেও। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না অধিকাংশ সবজি। কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, গোল বেগুন প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, টমেটো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, চায়না গাজর ১৮০ টাকায়, ঢেঁড়স, পটোল ও চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, ঝিঙা ৮০ টাকা, মুলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর চাল কুমড়া প্রতি পিস ৫০ থেকে ৬০ টাকা, লম্বা লাউ প্রতিটি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। 

মরিচ-পিয়াজ ও আলুর দামে অস্থিরতা: আবারো অস্থিরতা দেখা দিয়েছে মরিচ ও পিয়াজের বাজারে। আগের চেয়ে মরিচের দাম কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি মরিচের দাম ছিল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। গতকাল সেই মরিচের দাম বেড়ে ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে পিয়াজের দামও বেড়েছে। বাজারে দেশি পিয়াজের দাম বেড়ে ১২০ টাকায় ঠেকেছে। আর ভারতীয় পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকায়। অন্যদিকে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে আলুও। গতকাল প্রতি কেজি আলুর দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। যদিও এক মাস আগে আলু ও পিয়াজের দাম কমাতে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আলু আমদানিতে বিদ্যমান ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। আর আলু আমদানিতে থাকা ৩ শতাংশ এবং পিয়াজ আমদানিতে থাকা ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। 

মোটা চালও ৫৫ টাকা কেজি: এদিকে নিয়ন্ত্রণে নেই চালের বাজারও। প্রতি কেজি মোটা চাল (স্বর্ণা ও চায়না ইরি) ৫০ থেকে ৫৫ ও মাঝারি (বিআর-২৮ ও পাইজাম) ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে মানভেদে সরু চাল (মিনিকেট ও নাজিরশাইল) বিক্রি হচ্ছে ৬৪ থেকে ৮০ টাকা কেজি।  

রপ্তানির খবরে বেড়েছে ইলিশের দাম: এদিকে ভারতে রপ্তানির খবরে দেশের বাজারে ইলিশ মাছের দাম বেড়েছে। বাজারে ১ কেজি ওজনের ইলিশের কেজি ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা। এক কেজি ৩০০ গ্রামের ইলিশের কেজি ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। আর দেড় কেজির ইলিশ দুই হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক ছোট ৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। বেড়েছে অন্যান্য মাছের দামও। বাজারে রুই মাছ ৩৪০ থেকে ৫০০ টাকা, চিংড়ি ৯০০ থেকে ১৫০০ টাকা, কাঁচকি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, কৈ মাছ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, পাবদা মাছ ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা, শিং মাছ ৫০০ থেকে ১৪০০ টাকা, বোয়াল মাছ ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। 

বাজারে গিয়ে ফর্দে কাটছাঁট করছে ভোক্তারা: তালতলা বাজারে কথা হয় আতাউর রহমান নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকাল সকাল বাজার করতে এসে হিসাব মেলাতে পারছিলেন না তিনি। প্রতিদিনের রান্নায় প্রয়োজনীয় তেল, পিয়াজ, রসুন, আলু, সবজি ও মসলা কিনতেই পকেটে টান পড়ে তার। কেনা বাকি মাছ, ডিম, কাঁচা মরিচ ও ডাল। শেষমেশ বাজারের ফর্দ থেকে ডিম ও ডাল বাদ দিতে হয় তার। আতাউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে। বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম চাচ্ছে। তিনি বলেন, বাজারের ফর্দ থেকে আমাকে ডিম ও ডাল বাদ দিতে হয়েছে। আগে গরু ও খাসির মাংস কিনতে গিয়ে চিন্তা করতাম। কিন্তু এখন ডিম আর মাছ কিনতে গিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে। ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। আগারগাঁওয়ের বিএনপি বাজারে ডিম কিনতে আসা নিশান ইসলাম বলেন, এই বাজারে প্রতি ডজন ডিম ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সরকার ডিমের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ১৪২ টাকা। অর্থাৎ ১৮ টাকা বেশি দামে আমাদের ডিম কিনতে হচ্ছে। বাজার তদারকি করা হচ্ছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। 

বাজার তদারকি নিয়ে যা বলছে ভোক্তা অধিদপ্তর: বাজার তদারকি নিয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, আমি অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি। আর অল্প কিছুদিন হলো এই দায়িত্ব পেয়েছি। সেক্ষেত্রে আমি এই বিষয়ে তেমন কিছু বলতে পারবো না। আপনি পরিচালক (এডমিন)’র সঙ্গে কথা বলেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অফিস প্রশাসন ও অর্থ বিভাগ) আব্দুল জলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনিও একই কথা বলে জানান, তিনিও দুই মাস আগে এই দায়িত্ব পেয়েছে। তিনি তেমন কিছু বলতে পারবেন না। এরপর নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছি। ব্যবসায়ীরা একেক সময় একেক অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ায়। এবার জিনিসের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে তারা বন্যার অজুহাত দেখিয়েছে। তিনি বলেন, পরিবহন খাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজি এখনো বন্ধ হয়নি। তবে কিছুটা কমেছে। ডিমের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি মধ্যস্বত্বভোগীদের কথা বলেন। মধ্যস্বত্বভোগীরা ডিমের সংকট সৃষ্টি করে বাজারে ডিমের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি।