রিসেট

নেপালের হোকসি যেভাবে কিডনি ভ্যালি

প্রকাশিত: ১ এপ্রিল (সোমবার), ২০২৪ Archive 2022Source: মোহাম্মদ আবুল হোসেন

হিমালয়ের পাদদেশে নৈসর্গিক সৌন্দয্যের দেশ নেপাল। শিল্পীর তুলিতে আঁকা যেন পাহাড়, গ্রাম আর গ্রামীণ জনপদ। পাহাড়ের ভাজে ভাজে, কোলঘেঁষে এঁকেবেঁকে বয়ে গেলে নদীর মতো সড়ক। তার এখানে ওখানে, পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে উঠেছে জনবসতি। এই যে সৌন্দর্য্য এর ভিতরে আছে এক চরম বিষাদের কাহিনী। গা শিউরে উঠার মতো সে কাহিনী। সেখানকার একটি গ্রামের নাম হোকসি। কিন্তু এই গ্রামের আছে একটি ব্যতিক্রমী হতাশাগ্রস্ত ইতিহাস। এই গ্রামটি এখন পরিচিত ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে। এর কারণ, এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির কেউ না কেউ কিডনি বিক্রি করেছেন। এমনি দু’জন ব্যক্তি কাঁচা ও রাম। তাদের দু’জনেই ৪০-এর দশকে পা দিয়েছেন। কিডনি বিক্রি করেছেন, এ কথা স্বেচ্ছায় স্বীকার করেন তারা। বিব্রতবোধ করলেও অবলীলায় বলে যান সেই কাহিনী। আর্থিক চরম টানাপড়েনের কারণে তারা কিডনি বিক্রি করেছেন। কাঁচা’র এখনও সার্জারি স্থানে ব্যথা হয়। ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। পাশ্বপ্রতিক্রিয়া তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। বলেন, কত মানুষ এভাবে কিডনি বিক্রি করেছেন তা গণনা করা অসম্ভব। এই গ্রাম, ওই গ্রাম সব জায়গার মানুষ কিডনি বিক্রি করেছেন। তাদের সংখ্যা অগণিত।  
এ জন্য দালালরা নিয়মিত বছরে পর বছর ধরে ওই এলাকা সফর করেন। বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও তারা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে একটি কিডনি বিক্রি করে দিতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানকার জনগণ বিষয়টি বুঝতে পারছে। তারা বুঝতে পারছেন বড় রকমের ক্ষতি হয়েছে তাদের। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ কেউ বলেছেন, তাদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়েছেন। আবার কাউকে বলা হয়েছে, কিডনি বিক্রি করলে তা আবার নতুন করে জন্ম হয়। কেউ কেউ কিডনি দিতে গিয়ে মারা গেছেন অথবা পরে জটিলতায় মারা গেছেন। এখন নতুন করে দারিদ্র্য গ্রাস করছে নেপালকে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেঠে কিডনি। 
দেশে অবস্থানরত পরিবারের সদস্যদের জন্য উপসাগরীয় দেশ এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত নেপালির সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু তাতে নিজেদের বিপর্যয়কর ফাঁদে নিজেরাই আটকে যাচ্ছে। এক সময়ের স্বাস্থ্যবান, সুষ্ঠু যুবক যখন নেপালে ফিরে আসছেন তখন তার কিডনি প্রতিস্থাপন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওইসব দেশে অস্বাভাবিক গরমে কাজ করা এবং ভয়াবহভাবে পানিশূন্যতার কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। 
কয়েক বছর আগে ৩১ বছর বয়সী সুমন আর্থিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। আত্মহত্যার চিন্তা করেছিলেন। এমন সময় তার মনে হলো ভারতে গিয়ে একটি কিডনি বিক্রি করে দেবে একজন নারীকে। ওই নারীকে তার বোন সাজানো হয়। তাকে কিডনি দিয়ে টাকা নেয়া ছাড়া সুমনের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না। তার শরীর থেকে কিডনি নেয়া হয়েছে। বিনিময়ে তাকে দেয়া হয়েছে তিন হাজার পাউন্ড। তিনি বলেন, এখন আমি ভীষণ দুর্বল বোধ করি। মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়ি। যখন জেগে উঠি, তখন খুব ব্যথা করে। এখন কাজ করতে পারি না। তাই যাকেই পাই তাকেই বলার চেষ্টা করি- তারা যেন কিডনি বিক্রি না করেন। 
সুমন যা করেছেন তা ভারতীয় চিকিৎসক জানতেন কিনা সে বিষয়ে তিনি অবহিত নন। কিন্তু ভারতের আইন পরিষ্কার। কিডনিদাতাকে অবশ্যই হতে হবে গ্রহিতার আত্মীয় এবং এ বিষয়ে প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে হয়। ভারতে অঙ্গ পাচার এখনও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ব্যাপক চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে ব্যাপক ফারাক থাকার কারণে এমন হয়েছে। কিডনিদাতার সংকটের কারণে বেড়ে উঠেছে কালোবাজার। অর্থের বিনিময়ে কিডনি এমন চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন কিছু ডাক্তার ও হাসপাতাল। এটা যে শুধু ভারতে হয়, তা নয়। বৈশ্বিক হিসাবে দেখা গেছে প্রতি ১০টি কিডনি প্রতিস্থাপনের মধ্যে একটি পাচার করা কিডনি। 
কাঁচা বলেন, তিনি কিডনি বিক্রি করেছেন ভারতে গিয়ে। তার ভাষায়, কাঠমান্ডুর এজেন্টরা এ জন্য কাঠমান্ডুতে ভারতীয় আইডি কার্ডসহ ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি করেছে। একজন নারীকে ভুয়া বোন সাজিয়ে তাকে আমার কিডনি দেয়া হয়েছে। আমার মনে হয়, ভারতীয় ডাক্তারও জানেন যে আমি কিডনি বিক্রি করছি। 
হোকসি গ্রামের লোকজন বলছেন, তারা আর কিডনি বিক্রি করতে রাজি নন। কিন্তু বহু সংখ্যক মানুষ কঠোর ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। তারা বাঁচার জন্য বিকল্প পথ খুঁজছেন। সৌদি আরবে তিন বছর কাজ করেছেন জিৎ বাহাদুর গুরুং। তার বয়স মাত্র ২৯ বছর। তাকে কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল কিডনি স্টোরে চার ঘন্টার ডায়ালাইসিস নিতে হয় সপ্তাহে তিনবার। তিনি বলেন, আমাকে ভয়াবহ তাপমাত্রায় প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কাজ করতে হয়েছে। দুপুরের খাবার, টয়লেটে যাওয়ার এমনকি পানি পানের সময় পর্যন্ত দেয়া হতো না আমাদের। এমন অবস্থায় হঠাৎ করে লক্ষ্য করি আমার পা ফুলে যাচ্ছে। হাঁটতে পারছি না। তারপর পরীক্ষায় বলা হলো আমার কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। 
কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার লক্ষণ সব সময় সরাসরি দেখা যায় না। এমন অবস্থায় এক সময়ের অভিবাসীরা যখন নেপালে ফিরে আসেন, তখন তাদের চিকিৎসার জন্য খুব বেশি দেরি হয়ে যায়। জিৎ বাহাদুর গুরুং দেশে ফিরে একজন কিডনিদাতার জন্য হন্যে হয়ে ঘোরেন। কিন্তু দাতাকে হতে হবে আত্মীয়। এমন আত্মীয় পাওয়া যাচ্ছিল না। 
আরেকজন নেপালি ঈশ্বর (৩৪)। তিনিও বাঁচার জন্য চেষ্টা করছেন। দুবাইয়ে তিনি সাত বছর দিনে ১৬ ঘন্টা কাজ করেছেন। বলেন, ঘুমহীন উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ কর্মঘন্টা আমাকে কাজ করতে হয়েছে। আমার শরীর ফুলে যেতে শুরু করে। দেখে মনে হয়, আমাকে কেউ প্রহার করেছে। 
নেপালের হিউম্যান অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারের সুপ্রসিদ্ধ সার্জন ডা. পুকার শ্রেষ্ঠা শুধু প্রবীণদের কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি দেখতে পেয়েছেন তরুণ বা যুবকদের মধ্যে কিডনির ভয়াবহ সমস্যা পাওয়া যাচ্ছে। যুব সমাজ যারা উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করেন, কম পানি পান করেন, তাদেরই কিডনি ফেইলুর জয়। তিনি বলেন, বিষয়টি খুবই ভয়াবহ। যত কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়, তার এক তৃতীয়াংশ হলেন এইসব অভিবাসী শ্রমিকরা, যারা টাকার লোভে বিদেশে পাড়ি জমান। এটা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বিশাল এক বোঝা। দেশে যত কিডনি প্রতিস্থাপন হয়, তার মধ্যে এদের সংখ্যা শতকরা কমপক্ষে ৩০ ভাগ। অভিবাসী শ্রমিকরা নেপালের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৪ ভাগ। ফলে কিডনি প্রস্থিাপনের এই হার অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি মনে করেন, এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা। যেসব অভিবাসী বিদেশে যাচ্ছেন কাজ করতে তাদেরকে পর্যাপ্ত পানি, বিশ্রাম এবং ভাল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিতে হবে। সেই সুযোগ দিতে হবে।