প্রেগন্যান্সি মানে কি অসুস্থতা? সন্তান ডেলিভারি মানেই কি সিজারিয়ানের মতো একটি মেজর অপারেশন? কিংবা নরমাল ডেলিভারির পেইন কি আসলেই ম্যানেজ করার মতো না? উপরের প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে ‘না’। প্রস্তুতির মাধ্যমে একজন গর্ভবতী নারী সুন্দর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। কোনোরকম ঝুঁকিপূর্ণ কন্ডিশন না থাকলে, পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ ও উপযুক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমে নরমাল ডেলিভারিকে সহজ করতে ও লেবার পেইনও ম্যানেজ করতে পারেন একজন গর্ভবতী নারী। তবে এই সবকিছুর জন্য প্রয়োজন সঠিক উৎস থেকে জ্ঞান অর্জন। আর এই বিশেষ সময়ের চাহিদার জন্য চালু হয়েছে ‘প্রিনেটাল এডুকেশন’, যা একজন নারীকে গর্ভকালীন সময় থেকে শুরু করে সন্তান প্রসব, পেইন ম্যানেজমেন্ট, প্রসবোত্তর পরিচর্যা ও নবজাতকের যত্ন সংক্রান্ত সব ধরনের জ্ঞান দ্বারা আলোকিত ও আত্মবিশ্বসী করে তোলে। উন্নত দেশে প্রিনেটাল বা বাচ্চার জন্মপূর্ব শিক্ষা ক্লাস করা অনেক জায়গাতেই বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে এই বিশেষ কোর্সটি অনলাইনে সর্বপ্রথম শুরু হয় ‘রৌদ্রময়ী স্কুলে’, যা সম্পূর্ণ নারীদের দ্বারা পরিচালিত। স্কুলটি গত কয়েক বছর ধরে অনলাইনে নারীদের জন্য আয়োজন করে আসছে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় কোর্স। প্রায় ২ বছর আগে করোনার মহামারির সময়ে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে ৩৮ জন মা’কে নিয়ে শুরু হয়েছিল রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্সের ১ম ব্যাচ। এর পেছনে শুরু থেকে আছেন এমন কয়েকজন মা, যারা নিজেদের মাতৃত্বের সময়টায় প্রবাসে ছিলেন। সেখানকার ম্যাটারনিটি সার্ভিস, মায়েদের প্রেগন্যান্সি ও মাতৃত্বকালীন সময় নিয়ে সচেতনতা দেখে নিজেদের জীবনে অনেক কিছু শিখেছেন ও দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। এ কারণে এসব নিয়ে নিজ দেশ বাংলাদেশেও কাজ করার জন্য আগ্রহী হয়েছেন তারা। পরবর্তীতে এই বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ট্রেনিং নিয়ে এখন প্রিনেটাল ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছেন তারা। এই টিমে আছেন দেশের প্রথম চাইল্ড বার্থ এডুকেটর। আরও আছেন অনেক ডাক্তার। যারা সেবা দিতে গিয়ে শিক্ষিত পেশেন্টের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন ও পেশেন্টদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা লালন করতেন। এখানে প্রশিক্ষণ নেয়া হলে প্রেগন্যান্সি, লেবার-ডেলিভারি, প্রসবোত্তর সময় নিয়ে জ্ঞান রাখা ও নিজেকে প্রস্তুত করা একজন মা মাতৃত্বের এই পথচলাকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পাড়ি দিতে পারেন। একইসঙ্গে তিনি তার ডাক্তারকেও সহযোগিতা করতে পারেন তার পেশাগত কাজ সঠিকভাবে করে যাওয়ার জন্য। এসব বিষয় মাথায় রেখে, রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যেন প্রেগন্যান্সির শুরু থেকে সন্তান প্রতিপালনের সূচনা পর্যন্ত একজন মা নিজেকে আগে থেকে প্রস্তুত করে নিতে পারেন। কোর্সের কারিকুলামের মাঝে রয়েছে: প্রেগন্যান্সির: Couple থেকে Parents!, গর্ভাবস্থায় সুষম ডায়েট, চেকআপ, বিপদচিহ্ন, স্বাভাবিক প্রসবের প্রস্তুতি ও ব্যায়াম, নরমাল ডেলিভারি ও পেইন ম্যানেজমেন্ট, সিজারিয়ানের পর নরমাল ডেলিভারি, সিজারিয়ান ডেলিভারি কখন হয় ও পরবর্তী পরিচর্যা, নতুন শিশুকে স্বাগতম, নবজাতকের যত্ন, খাওয়া, ঘুম ও কান্না রহস্য! ব্রেস্টফিডিং এবং মিক্সড ফিডিং, পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনের অদ্যোপান্ত, ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। আল্হামদুলিল্লাহ্, গত ২ বছরে একে একে সম্পন্ন হয়েছে ১১টি ব্যাচ। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপ, নর্থ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ফার ইস্টসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মায়েরা যুক্ত হয়েছেন। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন জেলার মায়েরাও যুক্ত হয়েছেন। পার্টিসিপ্যান্টদের সংখ্যা ৩৮ থেকে শুরু করে এখন হাজার ছাড়িয়ে গেছে! প্রতিটি কোর্স চলে দুই মাসব্যাপী। টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে কোর্স ইন্সট্রাকটরদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। রয়েছেন একজন এমবিবিএস ডাক্তার, যিনি মায়েদের কমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গ্রুপে উপস্থিত থাকেন। এই সময়ের মাঝে রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল টিম আরও বড় হয়েছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কেপিজে, ইউনাইটেড হাসপাতাল এবং ঙএঝই হাসপাতালের মতো স্বনামধন্য হাসপাতালের স্পেশালিস্ট ও কনসাল্ট্যান্ট ডাক্তার, পেডিয়াট্রিশিয়ান, মেন্টাল হেল্থ কাউন্সিলর। রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্সের রয়েছে নিজস্ব ফেসবুক গ্রুপ (mother and childcare bd) যেখানে কোর্স শেষ হবার পরেও মায়েরা সবসময় ইন্সট্রাক্টর, ডাক্তার ও অভিজ্ঞ মায়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। রয়েছে নিজস্ব ভলান্টিয়ার টিম যারা তাদের থেকেই কোর্স করে তাদের জন্য পেছন থেকে কাজ করে যাচ্ছে। কোর্সের বাইরেও এই প্ল্যাটফর্ম থেকে দৌলা সার্ভিস দেয়া হয়। দৌলা হচ্ছেন একজন পেশাদার লেবার-ডেলিভারি, পোস্ট পার্টাম সাপোর্ট পারসন যিনি প্রেগন্যান্সির শেষ সময় থেকে সন্তান প্রসব ও সন্তানের নবজাতক অবস্থার সময়ে মাকে তথ্য, মানসিক ও শারীরিক সাপোর্ট দিয়ে থাকেন। তার এই সহযোগিতা নন-মেডিকেল পর্যায়ের হলেও পরিসংখ্যান বলে, সার্বক্ষণিক দৌলার উপস্থিতি সিজার হওয়ার সম্ভাবনা ৩৯% কমায়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে নরমাল ডেলিভারি হওয়ার সম্ভাবনা ১৫% বাড়ায়। রৌদ্রময়ী প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব দৌলা টিম রয়েছে যারা মায়েদের ওয়ান-টু-ওয়ান এই সাপোর্ট দিয়ে থাকেন। এই প্ল্যাটফর্ম স্বপ্ন দেখে, সমাজে এমন একটি শিক্ষিত মা তৈরি হবে, যারা নিজেদের মা হওয়ার পথে আলোকিত ও আত্মবিশ্বাসী হবেন। যারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়ার ব্যাপারে সক্ষম হবেন। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি মেডিকেল সমাজের সঙ্গেও কাজ করতে চান, যেন মায়েরা সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সেরাটা পেতে পারে, ডাক্তার-রোগীর পারস্পরিক বোঝাপড়া উন্নত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় রৌদ্রময়ী ঙএঝই হাসপাতালের সঙ্গে একদিনের একটি ওয়ার্কশপ করেছে ইতিমধ্যে যেখানে কনসাল্ট্যান্ট ডাক্তার, নার্স, মিডওয়াইফারি শিক্ষার্থীরা প্রাকৃতিক প্রসবের উপর ট্রেনিং নিয়েছেন। স্বস্তির বিষয় হলো- রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স করে বহু মা নরমাল ডেলিভারিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন, নরমাল ডেলিভারির জন্য সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারছেন এবং সক্ষম হচ্ছেন। যাদের কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে সিজারের প্রয়োজন হচ্ছে তারাও জেনে-বুঝে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। সেই সঙ্গে অনেক মা এই কোর্সে যুক্ত হচ্ছেন। সিজারের পর নরমাল ডেলিভারি নিয়ে জানতে এবং কোর্স শেষে অনেকেই ঠইঅঈ (Vaginal birth after cesarean) লাভ করছেন। প্রিনেটাল কোর্স মাতৃ স্বাস্থ্য উন্নয়নে একটি অপরিহার্য বিষয়। এই কোর্স ও এর উপকারিতা সম্পর্কে মানুষের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা প্রয়োজন।
লেখক: কো-ফাউন্ডার, রৌদ্রময়ী স্কুল ও মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার বিডি।
