‘আন্দোলনের চাপে সরকারই সংলাপের প্রস্তাব দেয়’

কাজী সুমন | ২০১৪-০৯-১৪ ১০:৪৬
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম বলেছেন, রাজনৈতিক বিষয়ে সমঝোতার জন্য চাপে পড়ে সরকারই সংলাপের প্রস্তাব দেয়। এখন বিরোধী দল সরকারের প্রতি সংলাপ প্রস্তাব দিচ্ছে। দুই দলের নেতাদের মধ্যে ধৈর্যের অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, তা না হলে তাদের ভাষা প্রয়োগে এমন দৈন্য দেখা যেতো না। মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রধান দুই দলের নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানকে গালি দিলে মানুষ ব্যথিত হয়। দুই দলের নেতারা যে যোগ্য নন এবং ধৈর্যহীন- এটার পরিচয় দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবার খুনি পরিবার- এটা মস্তিষ্ক খারাপ হলে বলা যায়। বর্তমান আওয়ামী লীগের সমালোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে খুনি বলতে হবে- এটা ভাল কথা নয়। বঙ্গবন্ধু না থাকলে আজকে যারা কথা বলছেন তারা কোন মিডিয়ায় আসতে পারতেন না। আমি জিয়াউর রহমানকে খুব সম্মান করি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের জন্য। তার মধ্যে দেশপ্রেম ছিল। বঙ্গবন্ধু যদি দেশকে মুক্তিযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে না যেতেন তাহলে জিয়াউর রহমান একজন লে. কর্নেল অথবা  কর্নেল হিসেবে তার চাকরি জীবন শেষ করতেন। তখন কি এ কথা বলার সুযোগ হতো? তাদের এই কথায় আমি দারুণ ব্যথিত হয়েছি। এখন ‘ইট কা জবাব পাত্থর সে মিলেগা’- এই রকমই হয়। সেই দিন তোফায়েল আহমেদ সাহেব ‘তোর বাবা, তোর বাবা’ (তারেক রহমানকে) বলে সম্বোধন করেছেন। এ সব কথা ছোট মানুষ বললে শোভা পায়, বড় মানুষ বললে শোভা পায় না। তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন- কুলাঙ্গাররাই কুলাঙ্গার বলে। এটা কোন ভাল যুক্তি নয়।
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বলেন, জয়কে যেমন স্নেহ করি ঠিক তারেক রহমানকেও আমি স্নেহ করি। লন্ডনে বসে ইদানীং তিনি যে সব কথা বলছেন তাতে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছেন। বঙ্গবন্ধু প্রথম প্রেসিডেন্ট না তার বাবা (জিয়াউর রহমান) প্রথম প্রেসিডেন্ট, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন- এসব কথা বলছেন। তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু ১০ই জানুয়ারি যখন দেশে আসেন তখন বাংলাদেশের পাসপোর্টই তৈরি হয়নি। এসব বাজে কথায় মানুষ বিরক্ত হয়। এতে তারেক রহমানের সুনাম ও জনপ্রিয়তা কমছে। বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে প্রধান দুই জোটের সংলাপের বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমরা কেমন জানি মেরুদণ্ডহীন হয়ে গেছি। গণতান্ত্রিক পন্থায় যখন কোন আন্দোলন হয় তখন গণতান্ত্রিক শক্তিই ভাল অবস্থানে থাকে। কিন্তু তা না থাকায় সরকার তো একটা ফাঁক পেয়েই গেছে। তাহলে সরকারের এত চিন্তা কিসের? তিনি বলেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় আতাউর রহমান খান বিরোধী দলের সঙ্গে ছিলেন। পরে এরশাদের সঙ্গে আঁতাত করে মন্ত্রী হয়েছিলেন। ’৮৯ সালের দিকে বিরোধী দলের আন্দোলনের চাপে বঙ্গভবনে আলোচনার আহ্বান জানালেন এরশাদ। বঙ্গভবনের ওই বৈঠকে আতাউর রহমান খানকে টেবিলের এক পাশে দেখে বিএনপি নেত্রী উঠে চলে এসেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘ওটা তো দালাল, এর সঙ্গে কিসের সংলাপ।’ কিন্তু আওয়ামী লীগ নেত্রী আসেননি। সেদিন খালেদা জিয়া বিরোধী দলে থেকে সরকারের প্রস্তাব নাকচ করেছিলেন। কিন্তু আজ তিনি নিজেই সরকারকে প্রস্তাব দিচ্ছেন। মজার ব্যাপার হলো- সরকারের দলের নেতারাই এখন বিরোধী দলের কাজ করছেন। তারা নিজেরাই সরকারের সমালোচনা করছেন। সরকারের মন্ত্রীদের সমালোচনা করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, সরকার ২১ আর ৪১ সালের কথা বলছে। এটা কি ভাবা যায়, এই সরকার ৪১ সাল পর্যন্ত থাকবে। তারা যদি মধ্যবর্তী নির্বাচন না দেয় তাহলে যে দিন নির্বাচন দেবে সেদিন আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মানুষের আস্থা অর্জন করে টিকে থাকতে হবে।
বিকল্পধারা, জেএসডি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে নিয়ে গড়া তৃতীয় রাজনৈতিক জোট সম্পর্কে কাদের সিদ্দিকী বলেন, তৃতীয় নয়, আমরা আলাদা রাজনৈতিক জোট গড়েছি। আমাদের জোট এখনও আছে। তবে তেমন সক্রিয় নয়। সময়ের একটা ব্যাপার আছে। তিনি বলেন, সত্যিই আমরা প্রধান দল নই। রাজনীতি দুই নেত্রীর হাতে এখনও বন্দি। আমরা মর্যাদার রাজনীতি করার চেষ্টা করছি।  টাঙ্গাইলের উপ-নির্বাচনে অংশ নেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমি জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছি। কিন্তু উপ-নির্বাচন বর্জন করিনি। এছাড়া, উপ-নির্বাচনটা ছিল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের জন্মস্থানে। অন্য কোথাও হলে এই চিন্তা করতাম না। তবে এখনও আমরা মনে করি, আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার সমালোচনা করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, সরকারের এই নীতিমালা করা ঠিক হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে মারার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল বামপন্থি রাজনীতিকরা, জাসদের গণবাহিনীর প্রধান ও জাসদের রাজনীতি।
তিনি বলেন, বর্তমান কোন বুদ্ধিমান লোক গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে যাবে না। সরকারের অনেক কিছুর মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ নেই। এখন নিয়ন্ত্রণের যুগ নয়, মুক্ত আবহাওয়ার যুগ। এই সময় আমার ভগ্নিকে (শেখ হাসিনা) ডোবানোর জন্যই এই পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে এত সমস্যা থাকতে এই নীতিমালা করতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার এটা করতে পারবে না। কারণ মানুষ এই নীতিমালা মানবে না। বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের সমালোচনা করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত সংসদের হাতে এই ক্ষমতা থাকলে আমাদের বিন্দুমাত্র সমস্যা ছিল না। কিন্তু এই ধরনের লাগামহীন ও ভারসাম্যহীন সংসদের হাতে এটা রাখা ভাল নয়। আমাদের স্বাধীনতার ৪৩ বছরে সবচেয়ে বেশি অবক্ষয় হয়েছে রাজনীতিতে। আর এটার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে পবিত্র সংসদ। অপবিত্রতার শেষ প্রান্তে চলে গেছে। এই জন্য আমার আপত্তি। ৭ই নভেম্বর কর্নেল তাহেরের ভূমিকা সম্পর্কে কাদের সিদ্দিকী বলেন, কর্নেল তাহেরের ফাঁসির ঘোর বিরোধী ছিলাম আমি। তবে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে তিনি যে কর্মকাণ্ড করেছেন এর জন্য অনেক আগেই তার ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা করেননি। কারণ বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানকে মূল্যায়ন করেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন মারা গিয়েছিলেন কর্নেল তাহের তখন সম্ভবত নৌ করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লাশটা সাগরে ফেলে দেয়ার কথা কেন- এর চেয়ে আরও জঘন্য কথা তারা অহরহ বলতেন। ভারতের নতুন বিজেপি সরকারের ভূমিকা নিয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ভারত আমাদের মতো দেশ নয়। তারা আজ যা করবে তা এক বছর আগে চিন্তা করে। যে সরকারই থাকুক তাদের সুবিধাটা আগে দেখবে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব সবসময় থাকবে। নতুন সরকারকে বোঝার জন্য আরও সময় দেয়া দরকার। তিনি বলেন, এক সময় কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মাখামাখি ছিল। কিন্তু গত নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছে। স্বাভাবিকভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতিমধ্যে হয়েছেও। আগে তো দরজা খোলা থাকতো। এখন দরজা টোকা দিয়ে খুলতে হবে।


DMCA.com Protection Status