২০ দিনে সহিংসতায় নিহত ৮৮

স্টাফ রিপোর্টার | ২০১৩-১২-১৫ ৯:৩৪
দেশব্যাপী রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। গত ২০ দিনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ১৮ দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৮৮ জন নিহত হয়েছেন। প্রথম দফা তিন দিনের অবরোধে নিহত হন ২২ জন। দ্বিতীয় দফা টানা ৬ দিনের অবরোধে নিহত হন ২৯ জন। তৃতীয় দফা অবরোধে নিহত হন ১৮ জন। জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের পর দিন সারা দেশে নিহত হন ৭ জন। গতকালও সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১১১ জন। পুলিশের গুলি, দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রল বোমা, ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও ট্রেনলাইন উৎপাটনের ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ১০ সহস্রাধিক মানুষ। এছাড়া বিরোধী জোটের কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, রংপুর, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, সিলেট, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম, সীতাকু , কক্সবাজার, ময়মনসিংহসহ অন্তত ৩০টি জেলায় ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব জেলায় ট্রেনলাইন উৎপাটন, পুলিশ ফাঁড়ি, নির্বাচনী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, আওয়ামী লীগের স্থানীয় কার্যালয় ও নেতাদের বাড়িঘরে আগুন ও ভাঙচুর, পাকা রাস্তা কেটে দিয়ে ও রাস্তার পাশের গাছ কেটে ফেলে এবং বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা, ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ১৮ দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন জায়গায় বেইলি ব্রিজের পাটাতন খুলে ফেলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় অবরোধীকারীরা। উপড়ে ফেলে দেয়া হয় বিদ্যুতের খুঁটিও।
গত ২৫শে নভেম্বর রাতে একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে প্রথম দফা টানা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ আহ্বান করে বিরোধী জোট। এরপর দিনই থেকেই দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। ২৬শে নভেম্বর অবরোধের প্রথম দিন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য ও সরকারি দলের কর্মীদের সংঘর্ষ ও সহিংসতায় নিহত হন ৬ জন । কুমিল্লায় এক বিজিবি সদস্যসহ ২ জন, সাতক্ষীরা সরকার দলীয় দুই নেতা, বগুড়ায় যুবদল কর্মী, সিরাজগঞ্জ যুবদল নেতা নিহত হন। ২৭শে নভেম্বর প্রথম দফা অবরোধের দ্বিতীয় দিনে সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে ৯ জন। চট্টগ্রামে এক যুবদল নেতাসহ ৩ জন, সাতক্ষীরায় জামায়াত নেতাসহ ২ জন, সিরাজগঞ্জে জামায়াত ও ছাত্রদলের ২ জন ও গাজীপুরে এক আওয়ামী লীগ নেতা ও যশোরে জামায়াত নেতা নিহত হন। এছাড়া রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণে আহত আনোয়ারা বেগম ও মোজাম্মেল হক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই দিন সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করলে অগ্নিদগ্ধ হন অন্তত ১৯ যাত্রী। ৩০শে নভেম্বর সারা দেশে সহিংসতায় ৫ জন নিহত হয়। ঝিনাইদহে পুলিশের গুলিতে এক শিবির কর্মী, বগুড়ায় অবরোধকারীদের ধাওয়ায় ট্রাক থেকে পড়ে গিয়ে এক যুবক, ঈশ্বরদীতে যুবদল নেতা ছইমুদ্দিন ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় পিকেটারদের ধাওয়ায় পিকআপ উল্টে এক পথচারী নিহত হন। রাজধানীর মালিবাগে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রল বোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে এক বাসযাত্রী মারা যান। ১লা ডিসেম্বর গভীর রাতে সরকার দলের নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুরকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করে বিএনপি। ২রা ডিসেম্বর সরকার দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে নিহত হয় ২ জন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে নাটোরে যুবদল নেতা সাইদুজ্জামান সুজন ও চাঁপাই নবাবগঞ্জের কানসাটে বিএনপি নেতা রুবেল নিহত হন। ৩রা ডিসেম্বর পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে নিহত হয় ১০ জন। সাতক্ষীরায় দেবহাটায় শিবির কর্মী হোসেন আলী, গাজীরহাট এলাকায় আরিজুল ইসলাম, সদরে যুবলীগ কর্মী গিয়াসউদ্দিন, চাঁদপুরে দুই স্কুলছাত্র সিয়াম ও রতন, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে স্বেচ্ছাসেবক দল কর্মী রাসেল ও রাঙ্গুনিয়ার ইছাখালীতে পিকেটারদের ধাওয়া খেয়ে সিএনজি উল্টে ইসমাঈল হোসেন, নিহত হন। এছাড়া চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় অবরোধকারীদের ককটেল নিক্ষেপে একটি লরিবোঝাই ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে খাদে পড়ে গেলে মাহবুব আলম নামে একজন নিহত হন। নোয়াখালীর দত্তেরহাটে পুলিশের ধাওয়ায় পুকুরে ডুবে মারা যান আবদুস সাত্তার নামে এক ব্যবসায়ী। পটুয়াখালী সদরে পেট্রল বোমায় দগ্ধ আবদুস সাত্তার গতকাল ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৪ঠা ডিসেম্বর পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষ ও রেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৯ জন। গাইবান্ধায় বোনারপাড়া স্টেশনে রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে ফেলায় পদ্মরাগ এক্সপ্রেসের তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঘটনাস্থলেই ৫ জন নিহত হন। এছাড়া পুলিশের গুলিতে ফেনীতে যুবদল নেতা হারুণ-অর রশিদ, নওগাঁয় আতাউর রহমান, ঢাকার নবাবগঞ্জে যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর আলম ও কিশোরগঞ্জে অবরোধকারীদের ধাওয়ায় ট্রাক উল্টে ট্রাকমালিক উজ্জ্বল সরকার নিহত হন। ৫ই ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফা অবরোধের শেষ দিনেও দুই জন নিহত হন। ফেনীতে পুলিশের গুলিতে রিকশাচালক মফিজুর রহমান, রাজধানীর সায়েদাবাদে বাসে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রল বোমায় ঘুমন্ত হেলপার হাসান মারাত্মকভাবে দগ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ৮ই ডিসেম্বর তৃতীয় দফা অবরোধের দ্বিতীয় দিন সংঘর্ষ ও দুর্বৃত্তদের হামলায় তিনজন নিহত হয়। কুমিল্লায় পুলিশের গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবু বেপারী, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মহেন্দ্রপুর বাজারে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন জগন্নাথপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মুন্সী রশিদুর রহমান ও সুনামগঞ্জে বিএনপি-আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষে ছাত্রলীগ নেতা মাসুদুল ইসলাম তালুকদার নিহত হন। ৯ই ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জে পুলিশের গুলিতে সুমন নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া যশোহরে জেলা ছাত্রদল সহ-সভাপতিকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১০ই ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে অন্তত ২ জন নিহত হন। নওগাঁর রানীনগরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীদের গুলিতে জামায়াত কর্মী শুকবর আলী (৬০) ও খুলনায় খালিশপুরে অবরোধের মিছিলে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হেলাল নামের এক বিএনপি কর্মী নিহত হন। ১২ই ডিসেম্বর তৃতীয় দফা অবরোধের শেষ দিনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষে নিহত হয় ৭ জন। লক্ষ্মীপুর শহরের তেমুহনীতে সকালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাবউদ্দিন সাবুর বাসভবনে র‌্যাব অভিযান চালালে ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় র‌্যাবের গুলিতে নিহত হয় ১৮দলের ৪ নেতাকর্মী। নিহতরা হলেন- বিএনপি নেতা মাহবুব হোসেন, যুবদল নেতা ইকবাল মাহমুদ জুয়েল, সুমন ও শিবির কর্মী শিহাব হোসেন। গুলিবিদ্ধ ও আহত হয় অন্তত ৫০ জন। ওদিকে ফেনীর মহিপালে পিকেটারের ইটের আঘাতে ট্রাকচালক মাহবুবুল আলম চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শিবির কর্মী আনোয়ার হোসেন। ১৩ই ডিসেম্বর জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্রতিবাদে সারা দেশে তাণ্ডব চালায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। ওই দিন পুলিশের সঙ্গে জামায়াত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে সারা দেশে নিহত হন অন্তত ৭ জন। সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ নেতা আরিজুল ইসলাম আরজু ও যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান জজকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পিরোজপুরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে বিএনপি নেতা শুক্কুর আলী হাওলাদার মারা যান। নোয়াখালীতে পুলিশের গুলিতে জামায়াত কর্মী খোরশেদ আলম নিহত হন। সোনাইমুড়ীতে ছাত্রলীগের গুলিতে যোবায়ের নামের এক শিবির কর্মী নিহত হন। যশোরে অবরোধের চেষ্টাকালে ট্রাকচাপায় এক শিবির কর্মী নিহত হন। খুলনায় পুলিশের সঙ্গে শিবির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নাঈম নামে এক আখের রস বিক্রেতা মারা যান।  ১৪ই ডিসেম্বর সহিংসতায় নিহত হন ১১ জন। লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী এলাকায় জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. ফয়েজ আহমদকে নিজ বাসায় গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের গুলিতে ৬ জামায়াত-শিবির কর্মী নিহত হন। নিহতরা হলেন- শিবির কর্মী আব্দুস সাত্তার, সাইফুল ইসলাম, মতিউল ইসলাম, রায়হান উদ্দিন, ও জামায়াত কর্মী নূর হোসেন রাসেল এবং মিশু। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সবুজ নামে এক পথচারী  নিহত হন। কালিতারা দিঘীরপাড় এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত যুবদলের কর্মী সোহাগ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে মারা যান। নীলফামারীতে সংঘর্ষে টুপামারী ইউনিয়ন কৃষক লীগ সভাপতি খোরশেদ চৌধুরী ও জামায়াত কর্মী সিদ্দিক নিহত হন।
উল্লেখ্য, গত ২৫শে নভেম্বরের পর থেকে তিন দফা ১৫ দিন অবরোধ পালন করে বিরোধী জোট। গত ২৫শে নভেম্বর রাতে একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম দফা মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশব্যাপী টানা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধের ডাক দেন। ২৭শে নভেম্বর দলের যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ বাড়িয়ে ৭১ ঘণ্টার ঘোষণা দেন। দ্বিতীয় দফা ২৯শে নভেম্বর রাতে রিজভী আহমেদ টানা ৭২ ঘণ্টা অবরোধের ঘোষণা দেন। ওই দিন রাতেই তাকে নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর দপ্তরের দায়িত্ব পান বিএনপির আরেক যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ। ২রা ডিসেম্বর সালাহউদ্দিন আহমেদ আরও ৭১ ঘণ্টা অবরোধ বাড়ানো ঘোষণা দেন। ৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দফা ১৩১ ঘণ্টার অবরোধ শেষ হয়। ৬ই ডিসেম্বর শুক্রবার এক ভিডিওবার্তায় তৃতীয় দফা টানা ৭২ ঘণ্টার অবরোধ ঘোষণা করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। ৯ই ডিসেম্বর আবার অবরোধ বাড়িয়ে ১৪৪ ঘণ্টা করা হয়। ১৩ই ডিসেম্বর শুক্রবার সকাল ৬টায় তৃতীয় দফার ১৪৪ ঘণ্টার অবরোধ শেষ হয়।


DMCA.com Protection Status