একজন ভাষাসৈনিক

ইসমাইল হোসেন স্বপন, নড়িয়া (শরীয়তপুর) প্রতিনিধি | ২০১৪-০২-২১ ৮:২৯
ভাষা সৈনিক ডা. গোলাম মাওলা। তিনি বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য উজ্জ্বল তারকা এবং নীতি নৈতিকতার আদর্শের প্রাণ পুরুষ। এমন ব্যক্তিত্বের জীবন সম্পর্কে আমরা খুব একটা জানি এমন দাবি করা কঠিন। ৪৭ বছর আগে তার জীবনাবসন হয়। বর্তমান প্রজন্ম তাকে দেখেনি, শুধু ইতিহাস পড়ে হয়ত জেনেছে। যারা দেখেনি, তাদের কাছে এ মানুষটি আবেদনহীন,আবেগহীন একজন সাধারন মানুষই। এই ক্ষণজন্মা প্রবাদ পুরুষ ১৯২০ সালের ২০শে  অক্টোবর নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের লোকেরা তাকে কালু বলে ডাকতো। তার বাবা আলহাজ আবদুল গফুর ঢালী এবং মা ছুটু বিবি। বাবা তৎকালীন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গ্রামের লোক তাতে বড়কর্তা বলে ডাকতো। বড়কর্তা ছিলেন গরিবের অকৃত্রিম বন্ধু। ডা. গোলাম মাওলা জাজিরা থানার পাচুখার কান্দির প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে  ৫ম শ্রেণী পাস করে নড়িয়া বিহারী লাল উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং এ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪১ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি এবং  ১৯৪৩ সালে বিএসসি শেষ করেন। ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব বিদ্যায় এমএসসি শেষে ১৯৪৬ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পা ঢাকা মেডিকেল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষ এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি এবং ১৯৫৪ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কলকাতায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে রাজনীতিতে অবদান রাখেন। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শৃঙ্খলিত মানুষের আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার বীভৎস চেহারা, দেশ বিভাগের পর স্বদেশত্যাগী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, শাসক শ্রেণীর নিপীড়ন-অত্যাচার তাকে একজন মানবতাবাদী, আপসহীন নির্লোভ রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভে তাড়িত করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকালে ঢাকা মেডিকেল ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন এবং সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা হিসাবে ৫২-এর সংগ্রাম পরিষদের ২০শে ফেব্রুয়ারির সভায় এবং ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে জোরালো সমর্থন দান করেন। ১৯৫২ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি রাতে যে ক’জন ভাষাসৈনিক প্রথম শহীদ মিনারের ভিত্তিস্থাপন করেন, ডা. গোলাম মাওলা তাদের মধ্যে অন্যতম।
তিনি ছাত্রজীবন শেষে সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৫৬ সালে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত এবং ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯৫২ সালে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব পর্যন্ত তার সাংগঠনিক কার্যতৎপরতা, সততা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, সিদ্ধান্তে অটল থাকার অঙ্গীকার ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
এ প্রসঙ্গে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক বলেছেন, ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় ডা. গোলাম মাওলার ভূমিকা এদেশের ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মহান এই মানুষটি ১৯৬৭ সালের ২৯শে মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।



DMCA.com Protection Status