বাসের ধাক্কায় জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মর্মান্তিক মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার | ২০১৪-১১-৩০ ৩:২৩
বাসের ধাক্কায় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাতে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেল ক্রসিং-এ বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন তিনি। তাৎক্ষণিক পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে পান্থপথের মোহনা ক্লিনিকে নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৬৫বছর। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক জগলুল আহমেদ চৌধুরী বর্তমানে ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছিলেন। সাংবাদিক জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। জগলুল আহমেদ চৌধুরী স্ত্রী, ১ ছেলে ও ১ মেয়ে রেখে গেছেন। রাতে তার লাশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যুতে রাতেই হাসপাতালে ছুঠে যান সিনিয়র সাংবাদিক মরহুমের সহকর্মীরা। তার মৃত্যুতে সাংবাদিক সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল রাত ৮টার দিকে শাহবাগের ঢাকা ক্লাব থেকে বেড়িয়ে বাসযোগে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলার টক শো’ অন্য দৃষ্টিতে অংশ নেয়ার জন্য যাচ্ছিলেন। কাওরান বাজারের সোনারগাঁও মোড়ে বাস থেকে নামার আগেই বাসটি দ্রুত বেগে টান দেয়। এতে জগলুল আহমেদ চৌধুরী পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আহত হন। দুই পথচারী ইমরুল কায়েস ও রবিউল ইসলাম তাকে উদ্ধার করে প্রথমে পান্থপথের মোহনা ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে আধঘণ্টা পর তাকে গ্রীনরোডের কমফোর্ট ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে নেয়া হয়। কমফোর্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইমরান হাসান জানান, কমফোর্টে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়। তার মাথায় ও গালে ইনজুরি ছিল। মুখের ভেতরসহ মাথায় রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়। পরে তার লাশ বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে। নিহতের ভাগ্নে আরিফ জানান, জগলুল আহমেদ চৌধুরী বনানীর সি ব্লকের ৬ নম্বর সড়কের ৫১ নম্বর বাসায় স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে থাকতেন। শনিবার প্রাইভেটকারের চালক না আসায় তিনি গাড়ি ছাড়াই বাসা থেকে বের হন। বাসে চলাচলে অভ্যস্থ না হওয়ায় বাস থেকে নামতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। নিহতের ছেলে নাভিদ আহমেদ চৌধুরী জানান, তার ছোট বোন অন্তরা চৌধুরী আমেরিকায় থাকেন। তাকে বাবার মৃত্যুর সংবাদ জানানো হয়েছে। অন্তরা ঢাকায় আসবে কি না তা জানার পর দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। যদি অন্তরা দ্রুত ঢাকায় না আসতে পারে তবে রোববার বা সোমবারের মধ্যেই তাকে বনানীর কবরস্থানে দাফন করা হবে। এর আগে জাতীয় প্রেসক্লাব ও বনানীতে জানাযা করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিহতের স্বজনেরা জানান, সম্প্রতি জগলুল আহমেদ চৌধুরী স্ত্রী নাজনীন আহমেদ চৌধুরীকে নিয়ে আমেরিকার মেয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। দেড় মাস সেখানে অবস্থান করার পর গত ১৮ নভেম্বর তিনি ঢাকায় ফেরেন।
গতকাল রাতে সরেজমিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে দেখা যায় জৈষ্ঠ্য সাংবাদিকরা সেখানে ভিড় করছেন। সবার চোখেমুখেই শোকের ছায়া। ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত জানান, এটিএন বাংলায় তার অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই জগলুল আহমেদ চৌধুরী আসছিলেন। রাত ৮টার দিকে তার সঙ্গেই শেষ কথা হয়। এসময় তিনি অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এটিএন বাংলায় পৌঁছে যাবেন বলে জানান। কিন্তু রাত সাড়ে ৮টার দিকেও তিনি না পৌঁছালেও কয়েক দফা তিনি জগলুল আহমেদ চৌধুরীকে ফোন করেন। কিন্তু কেউ ফোন ধরছিলেন না। কিছুক্ষণ পর অপরিচিত এক ব্যক্তি মোবাইল রিসিভ করে দুর্ঘটনার কথা জানান। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইমরুল কায়েস ও রবিউল ইসলাম জানান, তারা সোনারগাঁও ক্রসিং পার হওয়ার সময় এক ব্যক্তিকে রাস্তায় পড়ে যেতে দেখেন। তখন তার নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। দ্রুত তাকে পাশের মোহনা ক্লিনিকে নেয়া হয়। কিন্তু মোহনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে তাকে চিকিৎসা না করায় তার মৃত্যু হয়।
এদিকে বিশিষ্ট সাংবাদিক জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে পিজি হাসপাতালে ছুটে যান সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, বৈশাখি টিভির সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, পিআইবির মহাপরিচালক শাহ আলমগীর, সকালের খবর সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু, সময় টিভির সিইও আহমেদ যোবায়ের, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী মাহাবুবুল আলম শাকিলসহ জৈষ্ঠ্য সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা।
এক শোক বার্তায় প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ সাংবাদিক জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি মরহুমের রুহের মাগফেরাত ও আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপর এক শোক বার্তায় বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ হারালো সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল তারকা। আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন সহপাঠী এবং সত্যিকারের শুভাকাক্সক্ষীকে হারালাম। তার মৃত্যুতে দেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের রুহের মাগফেরাত ও আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।



DMCA.com Protection Status