বাংলারজমিন

অতিথি পাখিতে মুখর টাঙ্গুয়ার হাওর

জাহাঙ্গীর আলম ভুঁইয়া, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) থেকে

২৮ জানুয়ারি ২০১৭, শনিবার, ৯:০৩ পূর্বাহ্ন

 সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মাদার ফিসারিজ খ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওর অতিথি পাখির গুঞ্জনে মুখরিত। পরবাসী বিহঙ্গকুল আর দেশীয় পাখিদের মিলন-অভিসারে যেন স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে এ হাওরসহ ছোট-বড় ২৩টি হাওরগুলোতে। অতিথি পাখির কলকাকলীতে মুখরিত হাওর পাড়ের গোট এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে এক নয়ানাবিরাম চোখ জুরানো দৃশ্য। এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় অতিথি পাখি অনেক কম দেখা যাচ্ছে বলে জানান স্থানীয় এলাকাবাসী। সুদূর পরবাসী বিহঙ্গকুল তুষারপাত ও শৈত্যপ্রবাহ থেকে নিজেদের রক্ষার তাগিদে প্রতি বছর শীত মৌসুমে শীত প্রধান দেশ সুদূর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া, নেপালসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এরা ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসে বিশাল জলরাশির টাঙ্গুয়ায় হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে শুধু ডানায় ভর করেই। একটানা ডানা মেলে আকাশের ওড়ার ক্লান্তিতে এরা প্রথমে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও প্রচুর খাবার সমৃদ্ধ টাঙ্গুয়ার হাওরে বিচরণ করে তারা যেন সজীবতা ফিরে পায়। জানা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলার প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ভারতের মেঘালয় পাহড়ের পাদদেশে অবস্থিত। এই হাওরে প্রায় ৫১ প্রজাতির পাখি বিচরণ করে। আগত পাখির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল-বিরল প্রজাতির প্যালাসেস ঈগল,  মৌলভীহাঁস, পিয়ারী, কাইম, রামকুড়া, মাথারাঙ্গা, বালি হাঁস, লেঞ্জা, চোখাচোখি প্রভৃতি। আর অতিথি পাখিদের সঙ্গে মিলেমিশে আছে আমাদের দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরাও। পৃথিবীতে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির মধ্যে ১ হাজার ৮৫৫ প্রজাতির পাখিই পরিযায়ী। শীতে রাতের আকাশে অতিথি পাখির ডাকে এক বিভিন্ন রখম অনুভূতির জন্ম দিয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওড় পাড়ে আগত পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদারে মাঝে। ভোরে অতিথি পাখির কিচিরমিচির ডাকে হাওর পাড়ের মানুষের সকালেই ঘুম ভেঙে যায়। অতিথি পাখিরা কুয়াশাছন্ন সকালের সোনালি রোদে সূর্যস্নান সেরে পাখির দল চষে বেড়ায় হাওরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছোট শামুক, ঘাস, শস্যদানা আর পোকা মাকড়ের সন্ধানে। জলরাশি হাওরের বুকজুড়ে দলবদ্ধভাবে বিচরণ করা, জলে ডুব দিয়ে মাছ শিকার করা, শামুক খাওয়া, জলকেলি, খুনটুশি আর কিচিরমিচির কলতানে সৃষ্টি হওয়া আবহ পাখিপ্রেমীদের সহজেই নিয়ে যায় অন্য এক ভুবনে। আরো জানা যায়, ২০১১ সালে পাখিশুমারিতে এই হাওরে চটাইন্নার বিল, তারখাল, রোয়া বিল, লেচুয়ামারা বিল, রুপাবই, হাতিরগাতা বিল, বেরবেরিয়া বিল, বাইল্লার ডুবি, তেকুন্না ও আন্না বিল প্রায় ৪৭ প্রজাতির জলচর পাখি বা ওয়াটারফাউলের মোট ২৮ হাজার ৮৭৬টি পাখি গণনা করা হয়। এছাড়া এই শুমারিতে অন্যান্য পাখির পাশাপাশি চোখে পড়ে- মরিচা ভুতিহাঁস, পিয়াংহাস, নীলশির, পাতিহাঁস ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমানে দিন দিন এই পাখির আগমনের সংখ্যা কমে যাচেছ একশ্রেণির অসাধু পাখিশিকারি ও পাখিব্যবসায়ীদের কারণে। তারা রাতের আঁধারে মাছ ধরার জাল দিয়ে অতিথি পাখিশিকার করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে অতিথি পাখি শিকার করা দণ্ডনীয় হলেও এলাকার স্থানীয় কিছু পাখিশিকারি, ব্যবসায়ী-পুলিশ, এনজিও সংস্থা, আনসার বাহিনীদের সহযোগিতার অতিথি পাখি শিকার করে যার জন্য পাখির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ রয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে আসা তাহিরপুরের সাদেক আলী, রফিকুল ইসলাম, মেহেদী হাসান জন মেজর ভূঁইয়া জানান, বাড়িতে রাতে ঘুমানোর আগে আকাশে পাখিদের উড়ার সোঁ সোঁ শব্দ এখন আর শোনা যায় না। কারণ, এবার পাখি কম এসেছে। সঠিক তদারকি না থাকা ও হাওরে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন কার্যকর করা না হলে বিপন্ন হবে টাংগুয়ার হাওরের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য। আর যোগাযোগ ব্যবস্থা, থাকা-খাওয়ার সু-ব্যবস্থা না থাকার কারণে পর্যটকদের টাংগুয়ার হাওরে বেড়াতে আসা কমে যাচ্ছে। এ হাওরে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন কর্যকর করা না হলে বিপন্ন হবে টাঙ্গুয়ার হাওরের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় হাওর পাড়ের বাসিন্দারা জানান অসাধু পাখিশিকারিরা টাঙ্গুয়ার হাওর দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ, আনসার ও অন্যদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে সারা রাত জেগে ফাঁদ পেতে মাছ ও পাখি শিকার করে। আর সেই পাখি শিকার করে তারা বিক্রি করে উপজেলা সদর, সীমান্তের বিভিন্ন হাট-বাজারে। জেলা শহরে মাছ বিক্রিতার খাঁচায়, বাজারে ব্যাগে করে পাইকারী ও খুচরা বিক্রি করা হয় চড়া দামে। শিকারিরা অপরিচিত কোনো লোকের কাছে পাখি বিক্রি না করে শুধু পরিচিতদের মাঝে চলে পাখি বেচাকেনা। অপরিচিত কেউ পাখি কিনতে চাইলে নিজেদের নিজেরা কতটা নিরাপদ তা দেখে, বুঝে পরে আলোচনা করে পাখি বিক্রি করে। হাওর পাড়ের রঙ্গছি, মন্দিয়াতা,  গোলাবাড়ি, রামসিংহপুর, বাগলী, চারাগাঁও, রতনশ্রী, কলাগাঁও, শ্রীপুর, লামাগাঁও, পন্ডুব, সোলায়মানপুর সহ হাওর পাড়ের বাজারে প্রতিটি গ্রামের শিকারিরা গ্রামের চায়ের দোকানে ২-৩টি পাখি রেখে দেয়। আলাপচারিতার মধ্যে যারা পাখি কিনতে আগ্রহ দেখায় কেবল তাদের কে দেখিয়ে দাম ঠিক করে শিকারা; তাদের বাড়ি থেকে চাহিদা মতো পাইকারী ও খুচড়া ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করে বিক্রয় নিষিদ্ধ অতিথি পাখি।
 উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জানান-ঐতিহ্যবাহী টাংগুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যুগোপযোগী কার্যকর প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা খুবই প্রয়োজন।

 
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com