ভাষা শহীদ আবদুস সালাম এবং...

নাজমুল হক শামীম, ফেনী থেকে | ২০১৬-০২-২১ ৮:১৮
নানাবিধ সমস্যার বেড়াজালে আটকে রয়েছে ভাষা শহীদ আবদুস সালাম স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। বছরের বেশির ভাগ সময়ে বন্ধ থাকে জাদুঘর ও গ্রন্থাগারটি। এটি দেখভালের দায়িত্ব যাদের, তারাই দায়িত্ব পালন করছেন না ঠিকভাবে। এতে করে সেখানে বখাটে আর মাদকসেবীদের আনাগোনাই বেড়েছে। অভিযোগ আছে, ফেব্রুয়ারি মাস ছাড়া ফেনীর সালামনগরের খবরই রাখে না কেউ। জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ফেনী শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে দাগনভূঁঞা উপজেলার মাতুভূঁঞা ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর গ্রামে ভাষা শহীদ আবদুস সালামের পৈতৃক বাড়ি। সালামের নাম অনুসারে লক্ষণপুর পরিবর্তন করে গ্রামের নামকরণ হয় সালামনগর। সালামের বাড়ির পাশে জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে এডিপির অর্থায়নে ১২ শতক জমির ওপর প্রায় সাড়ে ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সালাম স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগারটি নির্মাণ করা হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ২৬শে মে সালাম স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। উদ্বোধনের সময় প্রায় ৫ হাজার মূল্যবান বই গ্রন্থাগারের জন্য প্রদান করা হয়। উদ্বোধনের পর তিন বছর কোনো লাইব্রেরিয়ান ও কেয়ারটেকার নিয়োগ না দিলেও ২০১১ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি শহীদ আবদুস সালামের ছোট ভাইয়ের মেয়ে খাদিজা বেগমকে মাসিক ছয় হাজার টাকা বেতনে গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। লাইব্রেরিয়ান বা কেয়ারটেকার কেউ কার্যালয়ে না আসায় দিন দিন সৌন্দর্য হারাচ্ছে জাদুঘরটি। তবে, ২১শে ফেব্রুয়ারি এলেই পুস্পস্তবক অর্পণের জন্য জাদুঘরের পাশে নির্মিত শহীদ মিনারে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদচারণা পড়ে। অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে গ্রন্থাগারের মূল্যবান বই ও আসবাব। গ্রন্থাগারে দীর্ঘ আট বছরেও করা হয়নি বইয়ের কোনো তালিকা। জাদুঘরের ভবনের অনেক স্থানে ফাটল ধরেছে, চুরি হয়ে যাচ্ছে ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি। লাইব্রেরিয়ান সর্বশেষ কবে কার্যালয়ে এসেছে তা স্থানীয়রা কেউ দেখেননি। গ্রন্থাগারে পাশের স্কুলে অধ্যয়নরত জামশেদ আলম নামে এক স্কুলছাত্র বলেন, সালাম গ্রন্থাগারটি ২১শে ফেব্রুয়ারি আসলেই দুই দিন আগে খোলা হয়। তাছাড়া সরকারি কোনো কর্মকর্তা জাদুঘর পরিদর্শনে আসলেই মূলত এটি খোলা হয়। লাইব্রেরিটি না খোলায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সারা বছর বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। গ্রন্থাগারে পড়ার জন্য কোনো ধরনের জাতীয় বা স্থানীয় পত্রিকাও রাখা হয় না। ফেনী জেলা পরিষদ প্রশাসক আজিজ আহম্মদ চৌধুরী যাদুঘর ও গ্রন্থাগারটির বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করে জানান, গ্রন্থাগারটি দেখাশোনার জন্য কেয়ারটেকার ও গ্রন্থাগারিক নিয়োগ দেয়া হলেও গ্রন্থাগারিক হিসেবে ডিগ্রি প্রাপ্ত না হওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। গ্রন্থাগারিক সালামের ভাতিজি হওয়ায় তাকে পরিবর্তন করার জন্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে গ্রন্থাগারিক পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখতে জেলা পরিষদ সহসাই কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। ভাষা শহীদ আবদুস সালামের ছোট ভাই অবসর প্রাপ্ত সুবেদার আবদুল করিম জানান, দীর্ঘ ৬৪ বছরেও শনাক্ত ও সংরক্ষণ হয়নি ঢাকার আজিমপুর কবরাস্থানে শায়িত আবদুস সালামের কবর। কোনো সরকারই কবরটি শনাক্ত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তিনি আশা করছেন, ৬৪ বছর আগে মরহুমের নামাজের জানাজায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন তাদের সহযোগিতার মাধ্যমে সালামের কবরটি শনাক্ত করতে বর্তমান সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
সালামের জন্ম ইতিহাস: ফেনী শহর থেকে প্রায় ১৫ কি.মি. পশ্চিমে দাগনভূঁঞা উপজেলার মাতৃভূঁঞা ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর গ্রামের (বর্তমান সালামনগর) পৈতৃক বাড়িতে ১৯২৫ সালে ২৭শে নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন সালাম। ৪ ভাই ৩ বোনের মধ্যে সালাম ছিলেন সবার বড়। ’৫২-র ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়ার আগে ২০ বছর বয়সে ছোট বোন তরিকুন নেছা মারা যান। ১৯৭৬-এর অক্টোবরে হতদরিদ্র বাবা ফাজিল মিয়া (৮৫), এরপরে ১৯৮২ সালে মা দৌলতের নেছা (৮৫) ও ছোট ভাই সাহাবউদ্দিন (৫৫) ১৯৯৯ সালে, ছোট বোন কুরফুলের নেছা (৭৫) ২০০২ সালে, ভাই আবদুস ছোবহান ও ২০০৭ সালের ৩রা জানুয়ারি বোন বলকিয়তের নেছা মারা যান। সৈয়দ সালাম মাতৃভূঞা করমুল্যা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণী পাস করে দাগনভূঞা কামাল আতাতুর্ক হাইস্কুলে ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ৯ম শ্রেণীতে পড়ালেখা চলাকালে জেঠাতো ভাই হাবীবের সহযোগিতায় ঢাকার ৫৮, দিলকুশা মতিঝিল ডাইরেক্টর অব ইন্ডাস্ট্রিজ কমার্স-এ পিয়নের চাকরিতে যোগদান করেন। ’৫২-র ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সালাম কয়েক দিনের ছুটি কাটিয়ে বাড়ি থেকে ঢাকায় চাকরিস্থলে ফিরে যান। রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে তখন ফেব্রুয়ারি মাস ঢাকা ছিল উত্তাল। আন্দোলন চলছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, রাজপথ সবখানে। সে আন্দোলনে চঞ্চল ২৭ বছরের তরুণ আবদুস সালামের হৃদয়েও আন্দোলনের ডাক ছুঁয়ে যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলনের প্রস্তুতি দিবস। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য তৎকালীন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। সভা, সমিতি, মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু বাংলার ধামাল ছেলেরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সভা সমাবেশ করলো এবং মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেলো। মিছিলটি বর্তমানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গেলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। সে মিছিলে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিকসহ নাম না-জানা আরও অনেকের সঙ্গে সালামও গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে দিন সন্ধ্যায় টেলিগ্রামে সালামের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে সালামের বাবা ফাজিল মিয়া, জেঠাতো ভাই হাবিব উল্যাহ ও প্রতিবেশী মকবুল আহমেদ ২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা ছুটে যান। দীর্ঘ দেড় মাস ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ৭ই এপ্রিল তিনি মারা যান। তার লাশ বাড়িতে আনার চেষ্টা করা হলেও তখন অবরোধ আর হরতালের কারণে সম্ভব হয়নি। ঢাকাস্থ আজিমপুর গোরস্থানে জানাজা শেষে অজুখানার উত্তর পাশে ৫-৬টা কবরের পর সালামের দাফন সম্পন্ন হয় বলে জানাজায় অংশগ্রহণকারী মকবুল আহমেদ জানান।


DMCA.com Protection Status