রবিন ঘোষের দেহাবসান

স্টাফ রিপোর্টার | ২০১৬-০২-১৪ ৮:৪৯
চলে গেলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুরকার-সংগীত পরিচালক ও খ্যাতিমান নায়িকা শবনমের স্বামী রবিন ঘোষ। গতকাল সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর গুলশানের একটি ক্লিনিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮২। রবিন ঘোষ বেশ কয়েকদিন ধরে নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। প্রায় চার মাস আগে গুরুতর অসুস্থাবস্থায় তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সে সময় বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেন। কিন্তু দু-তিন দিন আগে শরীর খারাপ হওয়ায় তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল সকালে নাস্তা করা শেষে তিনি স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেন। রবিন ঘোষের স্ত্রী শবনম বলেন, আগের দিন রাত ১০টায় আমার সঙ্গে শেষ দেখা। তখন পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে আমি ক্লিনিকে যাওয়ার আগেই তিনি চলে গেলেন। শেষ কথা, শেষ দেখা আর হলো না। শনবনম জানান, রবিন ঘোষের ইচ্ছানুযায়ীই তাকে বিএফডিসিতে নেয়া হয়নি। গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত তার মৃতদেহ গুলশানের বাসায়ই রাখা হয়। এরপর তাকে ওয়ারীস্থ খ্রিস্টান কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। রবিন ঘোষের জন্ম ইরাকে। একজন সংগীত পরিচালক হিসেবে তার গড়ে উঠার পেছনে প্লে-ব্যাক শিল্পী আহমেদ রুশদীর ভূমিকা ছিল অনন্য। এটা রবিন ঘোষ নিজেও স্বীকার করতেন। তিনি সবচেয়ে বেশি গানের সুর করেছেন পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে। যা পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে ইতিহাস হয়ে আছে। তবে সেখানে যাওয়ার আগে ঢাকায়ই তিনি একজন সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। উর্দু এবং বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে গানের সংগীত পরিচালনা করতেন তিনি। বরেণ্য এ ব্যক্তিত্ব প্রসঙ্গে শিল্পী ফেরদৌসী রহমান বলেন,  যখন থেকে এদেশে ছায়াছবির জগত শুরু তখন থেকেই আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। রবিন আমাদের বাসায় আসতো, সঙ্গে গীতিকারও আসতেন। তো আমরা একসঙ্গে গানের কাজ করতাম। খুব ভালো সুর আসতো তার মনের ভেতর থেকে। রবিন ঘোষ চমৎকার মেজাজের অত্যন্ত ভদ্র একজন মানুষ ছিল। পাকিস্তানে তো ইতিহাস সৃষ্টি করে এসেছেন। সেখানে যথেষ্ট সম্মানও পেয়েছেন। কিন্তু এদেশ তাকে কোনই কাজে লাগাতে পারেনি। তার মতো একজন গুণী, দক্ষ সংগীত পরিচালককে এদেশ যথাযথভাবে সম্মানও জানাতে পারেনি, কাজেও লাগাতে পারেনি। এটা সত্যিই আমার খুব দুঃখ থেকে বলা। ফেরদৌসী রহমানের কণ্ঠে ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি’ গানটিই প্রথম ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এ গানের অনবদ্য সুর করেছিলেন রবিন ঘোষ। অন্যদিকে শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠে ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়’ গানটিও আকাশচুম্বী শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এ গানেরও সুর সৃষ্টি করেছেন রবিন ঘোষ। শাহনাজ রহমতুল্লাহ বলেন, রবিন ঘোষ ছিলেন একজন কিংবদন্তি, একজন সুরের জাদুকর। তিনি চলে গেছেন। প্রচণ্ড অভিমান নিয়েই চলে গেলেন। আমরা তাকে সম্মান দিতে পারিনি- এ যে কত কষ্টের, কত লজ্জার তা বলে বুঝাতে পারবো না। দুঃখ হয় এই যে কেউ তার কোন খোঁজখবরও নিত না, কোথাও কোন অনুষ্ঠানে ডাকা হতো না। তাকে সত্যিই আমরা মূল্যায়ন করতে পারিনি। রবিন ঘোষের সুরে পাকিস্তানের অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন রুনা লায়লা। তাকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এ শিল্পী। তিনি বলেন, মাত্র কয়েকদিন আগেও শবনম বউদির সঙ্গে কথা হলো। তখনই শুনেছি দাদা অসুস্থ। ভেবেছিলাম দেখতে যাবো। কারণ তার পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বের, পারিবারিক। কিন্তু শেষ দেখাটা আর হলোই না। এদেশের সংগীত জগত একজন মিউজিক্যাল জিনিয়াসকে হারালো। এ শূন্যতা কোনভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। ১৯৯৮ সালে দেশে আসার আগ পর্যন্ত রবিন ঘোষ পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। এদেশে আসার পর স্ত্রী নায়িকা শবনমকে নিয়ে নীরবে নিভৃতে সময় কাটাতেন তিনি। তাদের একমাত্র সন্তান রনি ঘোষ। প্রয়াত পরিচালক এহতেশামের হাত ধরেই ১৯৬১ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রে প্রথম কাজ করেন রবিন ঘোষ। ১৯৬৩ সালে ‘তালাশ’ চলচ্চিত্রের জন্য পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা নিগার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন তিনি। এরপর ‘চাহাত’, ‘আয়না’, ‘আম্বার’ ও ‘দোরিয়ান’ চলচ্চিত্রের জন্য একই সম্মাননা লাভ করেন। তিন বছর আগে পাকিস্তান টেলিভিশন থেকে রবিন ঘোষ-শবনমকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়।


DMCA.com Protection Status