রিসেট

কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি আসন্ন বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল (সোমবার), ২০২২ Archive 2018Source: অর্থনৈতিক রিপোর্টার
আগামী অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি
নিরসনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ও সিপিডি’র বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আগামী বাজেটে জনমানুষের প্রত্যাশাটা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোভিড উত্তর যে পুনরুজ্জীবনটা ২০২১ সালের শেষের দিকে ছিল, ২০২২ সালের শুরু থেকে এটা ধাক্কা খেয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, সার ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য এবং ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি, ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং এর সঙ্গে পণ্য পরিবহন চলাচলের ব্যবস্থা ভীষণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। তাই আগামী অর্থবছরে যে নতুন চ্যালেঞ্জগুলো আছে সেগুলোকে মাথায় রেখে সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য প্রথাগত বাজেট তৈরি করার যে প্রক্রিয়া, সেটা থেকে কিছুটা ব্যত্যয় ঘটানো প্রয়োজন।
গতকাল এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরম আয়োজিত ‘আসন্ন বাজেট নিয়ে জনমানুষের প্রত্যাশা’ শীর্ষক একটি ভার্চ্যুয়াল সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। সংলাপে পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও নাগরিক প্ল্যাটফরমের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা অংশ নেন। আসন্ন বাজেট থেকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা কী এবং তারা কোন ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন, সেই বিষয়ে আলোচনা হয়।
সংলাপে অংশগ্রহণকারী আলোচকবৃন্দ বলেন, আসন্ন বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে দিক-নির্দেশনা থাকা জরুরি। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতে অতিমারির ফলে কী কী ক্ষতি হয়েছে এবং কীভাবে সেটা পুষিয়ে নেয়া যায়, সেই বিষয়েও আলোচনা হয়। উদ্ভূত সমস্যাগুলো নিরসনে ব্যাপক আকারে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে আলোচকরা মনে করেন। সেইসঙ্গে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আরও সুষ্ঠুভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসা উচিত বলেও তারা দাবি জানান।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নয়, কর্মসংস্থান প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি। চলতি অর্থবছরে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, বহির্বিশ্বের বাণিজ্য পরিস্থিতি ও যুদ্ধ অর্থনীতিকে নতুন চাপে ফেলেছে। তাই প্রথাগত বাজেট তৈরির ব্যত্যয় ঘটিয়ে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে বলে তিনি মত দেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী অর্থবছরের সময়টা অসাধারণ, আর এই অসাধারণ সময়ে সাধারণ বাজেট যেন না হয়। এবার ব্যতিক্রমী বাজেট চাই। এজন্য বাজেট ঘোষণার আগেই আগামী বাজেটের নীতি কাঠামোর একটি খসড়া প্রকাশ করা উচিত। সেই খসড়ার ওপর সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মতামত দেয়ার সুযোগ রাখতে হবে। একইসঙ্গে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে বাজেট কতটা বাস্তবায়িত হলো, তাও জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করে জনগণকে, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে, সরাসরি বিভিন্ন প্রণোদনা, যেমন- অর্থনৈতিক সুরক্ষা, খাদ্য প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আর এজন্য আগের সকল প্রণোদনা কর্মসূচির পরিবীক্ষণ প্রয়োজন।
ওয়ার্ল্ড ভিশনের এডভোকেসি ও যোগাযোগ বিভাগের টেকনিক্যাল প্রোগ্রাম পরিচালক টনি মাইকেল গোমেজ বলেন, অতিমারির জন্য শিশুদের পড়াশোনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরকেন্দ্রিক বিদ্যালয়গুলো চালু থাকলেও গ্রামাঞ্চলে বা দুর্গম জায়গাগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। বিভিন্ন কারণে যারা ঝরে পড়েছে, তাদের স্কুলে ফেরত যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই এই সমস্যাগুলোর নিরসনে শিশু বাজেট নতুন আঙ্গিকে প্রণয়ন করা দরকার বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, বাজেট প্রণয়নে শিশুদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত।
আসন্ন বাজেট থেকে ট্রান্সজেন্ডার গোষ্ঠীর প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ট্রান্সজেন্ডারের সংজ্ঞায়ন সুস্পষ্ট নয়। এমনকি ট্রান্সজেন্ডারদের ওপর অতীতে কখনোই কোনো শুমারি পরিচালনা করা হয়নি। ফলে, তাদের দাবি ও চাওয়া-পাওয়া এক অর্থে হিসাবের বাইরে চলে যায়। এই বিষয়ে তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করেন। যেমন- ট্রান্সজেন্ডারদের স্বল্প সুদে ব্যবসায়িক ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা, তাদেরকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার লক্ষ্যে নিয়োগদাতাদের সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা প্রদান, ট্রান্সজেন্ডারদের স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন নিশ্চিত করতে তাদের পরিবারদের প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
অক্সফাম ইন বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মো. মোস্তফা আলী বলেন, কৃষি নিয়ে সরকারের আরও পরিকল্পিত নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। অঞ্চল ভেদে প্রয়োজনীয় কৃষি কর্মকর্তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই এসব সমাধান করতে কৃষি সংক্রান্ত সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সিএসআইডির প্রধান খন্দকার জহুরুল আলম মনে করেন, প্রতিবন্ধী সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ছে, টাকার পরিমাণ বাড়ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুবাইয়াত ফেরদৌস হিজড়াদের এসএমই ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার শিশুদের জন্য আলাদা বাজেট প্রত্যাশা করে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মুসলেম মনে করেন, করোনার সময় নারী উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের জন্য আলাদা কর্মসূচি নেয়া উচিত।
নারীপক্ষের ব্যবস্থাপক সামিয়া আফরিন মনে করেন, নারীর গৃহস্থালি কাজকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। জাতীয় আয় পরিমাপ পদ্ধতিতে সংস্কার আনা প্রয়োজন।