শেষের পাতা

ঢাকার মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবীর আমলনামায় কী লেখা হচ্ছে!

সাজেদুল হক

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:০৪ অপরাহ্ন

ক’ বছর আগের কথা। লিখেছিলামও। মা তখনো বেঁচে ছিলেন। ভোটের পরপরই মামলা হলো খুলনার দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। বাংলা ট্রিবিউনের হেদায়েত হোসেন মোল্লার হাতে হাতকড়া। আসামি মানবজমিনের রাশেদুল ইসলামও। আমার মা ফেসবুকে এ খবর দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। মায়েরা যেমন হন। একের পর এক ফোন দিয়ে যাচ্ছেন। বোঝার চেষ্টা করছেন কী হয়েছে।

ঢাকা থেকে একশ’ চল্লিশ কিলোমিটার দূরের এক গ্রামে থাকতেন আমার মা। তিনি ফেসবুক ব্যবহার করতেন না। তার নাতি ফেসবুকে তাকে এ ঘটনার ছবি ও সংবাদ দেখান। এই ক’বছরে সামাজিক এ মাধ্যমের অবস্থা আরও রমরমা। খবর কিংবা ব্যবসা বহু কিছুরই কেন্দ্র এখন  সামাজিক মাধ্যম। এটির পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত।  এইতো সেদিন। ঢাকার ক’জন সাংবাদিকের সঙ্গে আড্ডা। খ্যাতিমান এক সাংবাদিক বলছিলেন, ‘লোকেতো এখন ফেসবুক, ইউটিউবের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিশেষ করে বাইরের দুনিয়া থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত শোগুলো বেশ জনপ্রিয়।’ এই সত্য অস্বীকারের জো নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এসব শোগুলো কি সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করছে?

কাঠগড়ায় মিডিয়া
১৬-১৭ বছর ধরে এ পেশায় আছি। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময়। আনন্দ বেদনার মহাকাব্য। স্বাধীনতার জন্য সংবাদপত্রকে বরাবরই লড়তে হয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০০৬। সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে গণমাধ্যমের সবচেয়ে স্বাধীন সময়। দুয়ারটা খুলেছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ। তিনি তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। স্বাধীন সাংবাদিকতা বিরোধী কালাকানুন বাতিল করে দেন। ইতিহাস তাকে স্মরণে রেখেছে। ‘খবরের কাগজ’ এর মামলায় হাইকোর্টের রায়ও ছিল ঐতিহাসিক। ফেসবুকের কথা আগেই বলেছি। সেখানে বরাবরই সাংবাদিকতার ময়নাতদন্ত হয়। কাঠগড়ায় তোলা হয় সাংবাদিক ও সাংবাদিকতাকে। সাংবাদিকরা ব্যস্ত তেলবাজিতে। এ কথাটি সম্ভবত লেখা হয় সবচেয়ে বেশি। শুক্রবার ডয়চে ভেলে’র খালেদ মুহিউদ্দীনের ইউটিউব শো দেখছিলাম। সেখানেও এক দর্শক ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলেছিলেন। আলোচনায় ছিলেন দুই সাংবাদিক। সাংবাদিক সাগর-রুনি খুনের ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে ওই খুনের তদন্ত ও বিচার নিয়ে আলোচনা করেন তারা। এ হত্যা মামলার তদন্ত আজও শেষ হয়নি।  সাংবাদিকরাও অনুসন্ধান করে এ খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পারেননি। সাংবাদিক নেতারা বিশেষ সুবিধা নিয়ে আন্দোলন থেকে সরে গেছেন এমন আলোচনাও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ফৌজদারি অপরাধের বিচারের জন্য আন্দোলন করতে হবে কেন?

একথা সত্য কয়েক বছর ধরেই ঢাকার মিডিয়া নতজানু। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সাংবাদিকরা বহু অনুসন্ধান থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন। সাংবাদিকতা তো কেবল খবর প্রকাশই নয়। সাংবাদিকদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে প্রশ্ন করা। মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ডনাল্ড ট্রাম্পকে কীভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে তা আমরা দেখেছি। সেদিন দেখলাম বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম বরিস জনসনকে রীতিমতো শূলে চড়াচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে, আমেরিকা বা বৃটেনের গণতন্ত্রের চেয়ে আমাদের গণতন্ত্র কতোটা পিছিয়ে সেটাও তো বিচারে নিতে হবে। সংবাদপত্র তো গণতন্ত্রেরই একটা অনুষঙ্গ। আমার এক শিক্ষক বলতেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করে সরকারকে সে সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। এখন আমরা কী সেখানে দাঁড়িয়ে আছি? ক’বছর আগে লিখেছিলাম, আমরা মূলত চলি বুশ ডকট্রিনে। হয় তুমি আমার পক্ষে, না হয় বিপক্ষে। মাঝামাঝি  কোনো অবস্থা নেই। ভারতের লোকসভা সদস্য মহুয়া মৈত্রের ভাইরাল বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন, ভারতে তৈরি হওয়া নতুন ডকট্রিনের কথা। হয় তুমি সরকারের পক্ষে, না হয় বিপক্ষে। অথচ এর বাইরে বাস করে লাখ লাখ জনগোষ্ঠী। এটাও স্বীকার করে নেয়া ভালো, ভারতের গণতন্ত্র কিংবা মিডিয়া আমাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

ঢাকার সাংবাদিকতা যেমন প্রশ্ন করার শক্তি হারিয়েছে, তেমনি সেলফ সেন্সরশিপেও অনেকটা কাবু। দেশে সাংবাদিক সংখ্যা কতো হলফ করে বলা কঠিন। সাংবাদিকদের সংগঠনও অসংখ্য। তবে বার্ষিক পিকনিক ছাড়া এসব সংগঠনের তেমন কোনো কাজ চোখে পড়ে না। সাংবাদিকতা মানুষের কথা বলে, জীবনের কথা বলে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা কতোটা তা বলতে পারছে তা বিরাট প্রশ্ন বটে।

এমনিতে দেশে মিডিয়ার সংখ্যা বাড়-বাড়ন্ত। চল্লিশের বেশি টিভি চ্যানেল। অসংখ্য অনলাইন। পত্রিকাও রেকর্ড সংখ্যক। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার এক কলামে লিখেছেন, গত ৩০শে সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে ৫০২টি দৈনিক এবং ৩৪৮টি সাপ্তাহিক পত্রিকা। যা সম্ভবত বিশ্বের যেকোনো শহরের চেয়ে বেশি। অসংখ্য পত্রিকার অস্তিত্ব মানে অনেক পাঠক, সংবাদের জন্য অনেক সূত্র এবং নিজ নিজ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শ্রেণির প্রেক্ষাপটে অনেক মানুষের তথ্যের অবাধ প্রবাহে অংশগ্রহণ। এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের ভাষায়, আসলেই কী ‘হাজার ফুল’ ফুটেছিল, নাকি বিষয়টা এরকম, অনেকগুলো গাছ থেকে একই অথবা একই ধরনের ‘ফুল’ ফুটেছে, সেটা অনুধাবন করতে হবে। আমাদের মতে, এই রূপকের মাঝেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আজকের গণমাধ্যমের প্রকৃত অবস্থা। (সূত্র: ডেইলি স্টার)

তবে ঢাকার মিডিয়া যে জনগণের কথা একেবারেই বলছে না তা সম্ভবত সত্য নয়। হ্যা, কণ্ঠটি ক্ষীণ। তবুও কখনো কখনো কিছু সংবাদমাধ্যম হলেও জনগণের কথা বলছে। তাদের সেই প্রচেষ্টাও ইতিহাস বিচার করবে। এবং সেটা বিচার করবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বাস্তবতার আলোকে।

বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাদের অনেকে জীবনও উৎসর্গ করেছেন। আবার কেউ কেউ ছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে। স্বাধীন বাংলাদেশে বরাবরই বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন আলোচনায়। কখনো তারা চুপ থেকেছেন, কখনোবা ছিলেন সরব। জনগণের পক্ষে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে কখনো হয়েছেন প্রশংসিত। আবার কখনো ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগিদার হয়ে হয়েছেন ধিকৃত। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অনেকদিন ধরেই নীরব। নানা কারণে। কেউ চাপে, কেউ স্বেচ্ছায়। অনেকদিন পর তাদের অনেকের মুখ দেখা গেল। নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য গঠিত সার্চ কমিটির সংলাপে অংশ নিয়েছেন অনেকে। তবে তাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা কোথায় দাঁড়িয়ে সে ব্যাপারে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ ছিলেন কৌশলী। উল্লেখযোগ্য অংশের কথা শুনে মনে হয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে তারা তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। বিষয়টি যেন বলার মতোও কিছু নয়। অথচ আমাদের স্বাধীনতার পেছনে ব্যালটের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। গণতন্ত্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান চেতনা।

শেষ কথা: আমরা বলছি। ভয়ে, নির্ভয়ে। আবার কখনো বলছি না। তবে গণতন্ত্রে সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ঐতিহাসিক। সমকাল এবং মহাকাল নিশ্চিতভাবেই তাদের বিচার করবে।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status